গুচ্ছকবিতায় প্রভাত মণ্ডল

    0
    24
    Spread the love
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  

    ১. অভিশপ্ত মুর্শিদাবাদ

    মুর্শিদাবাদ আজ অভিশপ্ত ,
    নবাবের দরবার আজ অনুতপ্ত ।
    সূর্য তো আজও উঠেছিলো ,
    ফুল তো আজও ফুটেছিলো ,
    গাঙচিল ভেসে ছিলো ওখানে ,
    ও কি ভেবেছিলো ,
    বাজবে বিষাদের সুর !
    ওকে যেতে হবে বহুদূর ,
    আজ সানাই এর সুর হবে মলিন !
    তবু তো বদলে গেলো সুর !
    ও আজ অন‍্য বাসার খোঁজে
    নীরবে মুখটি বুজে ,
    চলে গেলো দূর বহু দূর ,
    ওর পায়ের চিহ্ন হল বিলীন ।
    আজ তাই তো কেঁদে উঠলো জলাধার
    সূর্য তো হয়েছে আজও উদিত ,
    তবু চারিদিকে রয়ে গেল আঁধার ।
    এ কর্ম মুখর জীবন ,
    কে জানতো ওরা ফিরবেনা আর !
    তাই তো পথে বের হতেই
    কারো মা বলেছিলো ,
    খোকা ? সাবধানে যাস ,
    দুপুরের খাবারটা সময় মতো খাস ।
    ও বলেছিলো ,
    মা তুমিও খেয়ে নিও ।
    সব রং ফিকে হয়ে গেলো ।
    কারো বা ছোট্ট খুকি বলেছিলো
    বাবা , বাবা ,
    আমাল জন‍্য ছোত্ত এত্তা পুতুল চাই ।
    বাবা বলেছিলো ,
    আনবো রে মা আনবো ,
    তার জন‍্য আমার একটা হামি চাই ,
    হামি দিয়ে সোনা বললো
    পাপা , টা টা বাই বাই ।
    সব রং ফিকে হয়ে গেলো ।
    কেউ বা হাতে হাত রেখে
    শীতের সকালের রোদ্দুর আর
    ভালোবাসার মানুষটার আদর মেখে
    বলেছিলো ,
    এই ফাল্গুনেই বাড়িতে জানাবো ,
    আমাদের কথা শোনাবো ,
    মা বাবাকে বলবো
    আর কত দিন ,
    এই ভাবে দূরে দূরে রইবো ।
    সব রং ফিকে হয়ে গেলো ।
    জানি গো একটা দিন
    ফিকে হয়ে যাবে ,
    লাল নীল গেরুয়ার পদচিহ্ন
    নিহত স্বজনের আঙিনা হতে ।
    সাদা ভাত ছাড়া কিছু
    রইবে না ওদের পাতে ,
    শুধু ঠাঁই পাবে প্রতিশ্রুতি ।
    নিহত ভাইয়ের মা-বাবার
    চশমার কাঁচ হবে পুরু ,
    মেয়েটা যত বড় হবে
    ওর জীবনে চলার
    পথটাও হয়ে যাবে সরু ,
    আর ফাগুন থাকবে অপেক্ষায় ।
    আজ নবাবের সভা হল অপমানিত
    আবারও ইতিহাসে ঠাঁই পেলো মুর্শিদাবাদ ,
    কিন্তু স্বজন হারা মানুষের চোখের জল
    চোখেই রয়ে যাবে ।
    জলাধারের জল তো বয়েই যাবে ,
    ফুটবে কি তাতে শতদল ।

     

    ২. বন্ধুস্মৃতি

    হারিয়ে গেছিস অনেক দূরে
    তবুও ডাকি আপন সুরে
    উত্তর তবু দিস না বন্ধু
    কেবল দিস দেখা ,
    আগেও ছিলিস আজও আছিস
    তুই যে প্রাণের সখা ।
    হারিয়ে গেছে বন্ধু আমার
    হারিয়ে গেছে সব ,
    হারিয়ে গেছে প্রাণের মাঝের
    নিত‍্য কলরব ।
    নদীর স্রোতের কলধ্বনি
    আজও তো নিত‍্য শুনি ,
    প্রাণ মাঝারের হর্ষধ্বনি
    আজ যে কেবল চোখের পানি ,
    নিত‍্য নিত‍্য দিন যে গুনি
    বন্ধুরে ! তুই ফিরবি কবে !
    আজি আঁখি জলে ডাকি তোরে
    বন্ধু তুই কোথায় ?
    হাজার তারার ভীড়ের মাঝে
    তোর হয়েছে ঠাঁঁই ,
    আজ এত ডাকি তবুও বন্ধু
    দিস না সাড়া তাই ।

     

    ৩. কবিতার ছন্দ

    ছন্দ এক সৃষ্টি রহস‍্য
    হোক না তাতে ভুল ,
    ভুলে ভরা জীবন খাতা
    খাতাতে সবই ছেড়া পাতা ,
    পাতা উল্টে দেখতে গেলেই
    মিলবে  না আর ছন্দ ,
    হিসাব যদি কষো তবে
    সবই আঁধার অন্ধ ।
    জীবন খাতার ছোট্ট পাতা
    অহং বোধে ভরা ,
    তোমার অহং আমার অহং
    সবই যে মন গড়া ।
    মনের মাঝেই সব ছন্দ
    তবু যেন দ্বার বন্ধ ,
    খুলে দেখো মনের দুয়ার
    পাবে দেখা মন ভ্রমরার ,
    হিন্দু সে কি মুসলিম আর
    হোক না খ্রীষ্টান ।
    মেলালে মিলবে ছন্দ
    না মেলালে বাঁধবে দ্বন্দ্ব ,
    খুঁঁজে দেখো প্রাণের ছন্দ
    আপন অন্তরে ,
    না মিললে বিকিয়ে দিও
    আপন প্রাণটারে ।

     

    ৪. তোমার সকাল

    ফুটেছে আলো , চারিদিকে শিশির ভেজা ঘাস ।
    আমরা উঠেছি তুলোর কম্বল আর
    গরম বিছানাকে পিছে ফেলে ,
    কেউ বা তখন বিছানাতেই জাগছে নয়ণ মেলে ।
                  তুমি তখন পথের ধারের
    চায়ের দোকান গিয়ে ,
    হাত বাড়িয়ে চাইছো যে চা
    করুণ সুরটি নিয়ে ।
                  তুমি তখন ফুটপাতেতে
    রেল স্টেশনের ধারে ,
    শুয়ে আছো তবু ঘুম চোখে নেই
    ময়লা , ছেড়া কাঁথা গায়ে দিয়ে ।
                  তুমি তখন পথের মাঝে
    তুমি বনের ধারে ,
    আপন মনে বকেই চলো
    আকাশ পানে চেয়ে ।
                  তোমায় সবাই পাগল বলে
    মনের হাজার দ্বিধা ভুলে ,
    আসল পাগল কে বা চেনে
    এই হিংসার দুনিয়ায় !
    জাতির বিভেদ সমাজ দ্বন্দ্ব , সকলেরই মনের দুয়ার বন্ধ
    এরা কি নয় প্রকৃত অন্ধ
    এই সমাজ দুনিয়ায় ?
    তোমায় যারা পাগল বলে , আসলে পাগল তারাই হয় ।

     

    ৫. তোমায় দেখবে বলে

    ভেঙে গেল রাতের বাঁধা ।
    সকালের শিশির ভেজা ঘাস
    আকণ্ঠ পান করেছে সুধা
    শুধু তোমায় দেখবে বলে ।
    আজ প্রভাত বেলায় পাখির ডাকে
    শাল মহুয়ার ফাঁকে ফাঁকে
    কোনো এক পথের বাঁকে
    ক্লান্ত ভোরে ,
    আমার মন যে কেমন করে
    শুধু তোমায় দেখবে বলে ।
    আজ রক্ত গাঁদা
    প্রাণের বাঁধা
    সরিয়ে দিল দূরে ,
    আজ অভিমানি বনটিয়াও
    গাইছে আপন সুরে ,
    শুধু তোমায় দেখবে বলে ।
    আজ কাঠবেড়ালি আপন মনে
    করছে খুনসুটি ,
    আজ বন পলাশ আর বকুল ফুলও
    মাটিতে খাচ্ছে লুটোপুটি ,
    শুধু তোমায় দেখবে বলে ।
    আজ ছোট্ট শিশু থামিয়ে দিল
    অঝোর ধারায় কান্না ,
    আজ দুষ্টু শিশু মায়ের কাছে
    ধরছে না কোনো বাইনা ,
    শুধু তোমায় দেখবে বলে ।
    আজ স্তব্ধ সকালে কালো ছোরা
    বাজায় মোহন বাঁশি ,
    সেই বাঁশির সুরে আঁতুর ঘরেও
    ঝরছে শিশুর হাসি ,
    শুধু তোমায় দেখবে বলে ।

    Spread the love
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •