কন্ঠস্বর চয়ন মুখার্জি (পর্ব – ১)

    0
    20
    Spread the love
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  

    ১৯৪৬ সালের ১৬ ই আগস্ট থেকে ১৮ ই আগস্ট, Direct Action Day র নামে কলকাতার রাস্তায় মুসলিম লীগের তিনদিন ধরে হত্যালীলার ঘটনাটি ডক্টর শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় বেঙ্গল লেজিসলেটিভ এসেম্বলিতে উত্থাপন করে অনাস্থা প্রস্তাব আনেন এবং একটি নাতিদীর্ঘ ভাষণে মুসলিম লীগের চেহারা বেআব্রু করে দেন।

    ।। পর্ব এক ।।

    “অধ্যক্ষ মহোদয়,
    গতকাল থেকে আমরা অনাস্থা প্রস্তাবের ওপর আলোচনা করছি এমনই এক পরিস্থিতির কারণে , সভ্য জগতের কোনো সংসদীয় সভায়, আলোচনার মাধ্যমে যার ব্যাখ্যা পাওয়া সম্ভব নয়। কলকাতায় যা হয়েছে, আধুনিক ইতিহাসে তার নজির বিরল। ইতিহাস সাক্ষী, সেন্ট বার্থলোমিউ দিবসে যে নারকীয় হত্যালীলার বিবরণ আমরা পড়ে এসেছি, একমাত্র তার সাথে কলকাতা, ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রধান শহরের রাস্তায় রাস্তায়, বিগত কয়েকদিন ধরে ঘটে চলা ঘটনাসমূহের তুলনা চলতে পারে। কোন পরিস্থিতিতে এই ঘটনা অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠলো?
    গত কয়েক বছরের ঘটনাবলী সম্পর্কে পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করার মতো সময় আমার হাতে নেই। কিন্তু অধ্যক্ষ মহোদয়, একথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে যা হয়েছে তা কোনো ঘটনার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া নয়, বরং একটি আদ্যন্ত দুর্নীতিগ্রস্ত অপদার্থ প্রশাসন চালানোর কলকাঠি যদি একদল দাঙ্গাবাজ গুন্ডার হাতে থাকে, তাহলে যা হয়, তাই হয়েছে। এবং ফলস্বরূপ আজ এই মহান প্রদেশের দৈনন্দিন জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। এই ঘটনার প্রত্যক্ষ কারণ যদি আমরা দেখি, তাহলে আমাকে বলতেই হচ্ছে , সম্প্রতি বোম্বাইতে অনুষ্ঠিত মুসলিম লীগের সর্বভারতীয় সম্মেলনে পাশ হওয়া রিজলিউশনটিই এর জন্য দায়ী। কাকতালীয়ভাবে এর উল্লেখ একটু আগেই মুসলিম লীগের একজন সদস্য এবং বিরোধী পক্ষের কয়েকজন করেছেন। তো কী হয়েছিল সেখানে? মুসলিম লীগের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে যে ক্যাবিনেট মিশন মুসলিম লীগের স্বার্থ অক্ষুন্ন রাখতে ব্যর্থ হয়েছে এবং সেজন্যই আজ ব্রিটিশ এবং মুসলিম লীগের সম্পর্ক তলানিতে এসে ঠেকেছে। ক্যাবিনেট মিশন কী করেছিল? মুসলিম লীগ যা কিনা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের আদরে বিগড়ানো সন্তান হিসেবে গত ত্রিশ বছর ধরে এদেশে যা খুশি তাই করার লাইসেন্স পেয়ে আসছে, প্রথমবারের জন্য তা লেবার সরকার দ্বারা প্রত্যাখাত হয়েছে। (…. সরকার পক্ষ থেকে প্রবল শোরগোল) আমি জানি সদস্যগণ , সত্যি কথা হজম করা মুশকিল, কিন্তু আপনাদের আজ তা ধৈর্য ধরে শুনতেই হবে।
    অধ্যক্ষ মহোদয়, ব্রিটিশ সরকারের সেই পুরনো নীতি , কংগ্রেস মুসলিম লীগ বোঝাপড়া ছাড়া এক পা-ও এগোনো চলবে না, তা ১৯৪৬ এ , প্রথমবারের জন্য সেই নীতি থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দিয়েছে (সরকার পক্ষ থেকে প্রবল শোরগোল) … সদস্যগণ, আমি যা বলছি তা fact, আমি মনের মাধুরী মিশিয়ে কোনো নিজস্ব মতবাদ আওড়ে যাচ্ছি না, এত তাড়াতাড়ি অধৈর্য হয়ে পড়ছেন কেন? তো, এই , মুসলিম লীগকে ছাড়াই অন্তর্বতী সরকার গঠিত হয়েছে। মাননীয় সদস্যগণ, আজ আমি আপনাদের প্রশ্ন করি, ধরুন আজ যদি মিস্টার জিন্নাহকে অন্তর্বর্তী সরকার গড়ার নিমন্ত্রণ দেওয়া হতো কংগ্রেসকে বাদ দিয়েই, তাহলেও কি মুসলিম লীগের বন্ধুরা একইভাবে সরকারকে দোষারোপ করতেন হিন্দু সম্প্রদায়ের স্বার্থ অগ্রাহ্য করার জন্য?!!
    অধ্যক্ষ মহোদয়, বম্বে রিজলিউশন পাশ হওয়ার পরে আমরা কী দেখলাম? আমার ঠিক আগে মুসলিম লীগের পক্ষ থেকে এক সদস্য এ ব্যাপারে বলেছেন। এটা তো স্পষ্ট যে প্রত্যক্ষ সংগ্রাম (Direct Action) এর আহ্বানটি আদতে একই সঙ্গে প্রত্যক্ষ সংগ্রাম শুরু এবং শান্তিপূর্ণ আলোচনা এবং বোঝাপড়ার রাস্তা থেকে সরে আসার আহ্বান হিসেবেই তাৎপর্যপূর্ণ। (… সরকারপক্ষ থেকে প্রবল শোরগোল, “কার বিরুদ্ধে?”) হ্যাঁ মাননীয় সদস্যবৃন্দ, যারা পাকিস্তান প্রস্তাব অগ্রাহ্য করবে, তাদেরই বিরুদ্ধে, এটা এখন দিনের আলোর মতোই স্পষ্ট।
    আমি আমার বন্ধুদের অনুরোধ করবো, আমাকে ভুল বুঝবেন না। আমি বিপক্ষের বক্তব্যগুলি তুলে ধরার চেষ্টা করছি এবং একই সঙ্গে এই আশা রাখি যে আমাদের বক্তব্যও তারা মনোযোগ দিয়ে শুনবেন। বস্তুত আমাদের বর্তমান অবস্থান দুই মেরুতে। আপনারা বলছেন যে আপনারা গায়ের জোরে পাকিস্তান ছিনিয়ে নেবেন। আলোচনা এবং গায়ের জোর দেখানো, দুটি জিনিস একই সাথে চলতে পারে না। আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি যে মুসলিম লীগের সদস্যরা উত্তেজনা প্রশমন করার কোনো চেষ্টাই করেননি । তারা আদতে যা চান, তা হলো “Civil War” এবং সম্প্রতি কলকাতায় আমরা তারই কিছু নমুনা দেখলাম। আদৌ এই সমস্ত গুন্ডামি আপনাদের পাকিস্তান অর্জন করতে সাহায্য করবে? বলা হচ্ছে নাকি ব্রিটিশরা মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে। কেন প্রকাশ্যে মিথ্যাচার করছেন? কারা আপনাদের সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারার ভিত্তিতে একের পর এক আসন উপহার দিয়েছে? কারা আপনাদের সিন্ধু প্রদেশে ক্ষমতায় টিঁকে থাকতে সাহায্য করছে? ব্রিটিশ গভর্নর এবং সিন্ধু প্রদেশের তিনজন ইউরোপিয়ান সদস্য, নয় কি? ভারতীয় সদস্যদের মধ্যে কংগ্রেসের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা সত্বেও তারা সবরকমভাবে চেষ্টা করে চলেছেন যাতে মুসলিম লীগকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখা যায়!
    আসুন, এবার একটু অন্য প্রসঙ্গে যাওয়া যাক। আমি মুসলিম লীগের নেতাদের ভাষণের বিশদ বিবরণে যাবো না, শুধু দুই একটি উদাহরন দেবো। গত ৩১ শে জুলাই যখন জিন্নাহকে বম্বে সম্মেলনে জিজ্ঞাসা করা হয় যে প্রত্যক্ষ সংগ্রাম (Direct action) কোন পথে চলবে, অহিংস নাকি সহিংস, তিনি উত্তর দেন যে , “এই মুহূর্তে আমি ন্যায় নীতি নিয়ে মাথা ঘামাতে রাজী নই”(সরকার পক্ষের বেঞ্চ থেকে মহম্মদ আলীর চিৎকার, “ঠিকই আছে”! )কিন্তু বাংলায় খাজা নাজিমুদ্দিন এতটাও রাখঢাক না করে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন যে, মুসলিমরা অহিংস পন্থায় আদপেই বিশ্বাস রাখে না । মুসলিমরা জানে যে প্রত্যক্ষ সংগ্রামের আহ্বান আদতে কীসের আহ্বান এবং মুসলিম লীগের নেতারা তা আম মুসলিম জনতাকে বুঝিয়ে দিতে চেষ্টার কমতি রাখেননি। একজন বলেছেন যে এসব শুরু হয়েছে পাঞ্জাবে এবং যা চলছে তা আদতে যুদ্ধ। আগুনে ঘি ঢালার কাজ করেছে দুই একটি সংবাদপত্র যেমন দ্য মর্নিং স্টার, দ্য স্টার অফ ইন্ডিয়া এবং দ্য আজাদ।
    আমি আপনাদের সবাইকে, বিশেষ করে আমার বিজ্ঞ বন্ধু মিস্টার ইস্পাহানিকে এই সংবাদপত্রে প্রকাশিত আর্টিকেলগুলি পড়তে অনুরোধ করছি। আমি জানি না মিস্টার ইস্পাহানি এতদিনে বাংলা শিখে উঠতে পেরেছেন কিনা, তবে তার সুবিধার্থে আমি “আজাদ” এ প্রকাশিত একটি আর্টিকেল এর অনুবাদ করে দেওয়া যেতেই পারে যেখানে খোলাখুলি হাতে অস্ত্র তুলে নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে । উত্তেজক ভাষায় হিন্দুদের প্রতি বিদ্বেষ এবং হিন্দুদের বিরুদ্ধে জিহাদের ডাক- এই হচ্ছে মূল বক্তব্য। এই হলো “Background” ।আমি সময়ের অভাবে লাইন বাই লাইন কোট করছি না অধ্যক্ষ মহোদয়। আপনি এগুলি পড়ে নিতে পারেন এবং পড়লেই বুঝবেন, সাধারণ মুসলিম জনতা এগুলো বুঝেছে এবং তাদের যা নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, তারা অক্ষরে অক্ষরে তা পালন করেছে।”
    ” Sir,
    since yesterday we have been discussing the motions of no-confidence under circumstances, which perhaps have no parallel in the deliberations of any Legislature in any part of the civilized world. What happened in Calcutta is without a parallel in modern history. St Bartholomew’s Day of which history records some grim events of murder and butchery pales into insignificance compared to the brutalities that were committed in the streets, lanes and bye-lanes of this first city of British India. We have been discussing, Sir, as to the genesis of these disturbances. Time will not permit me to go through the detailed history and course of events during the last few years.
    But let me say this that what has happened is not the result of a sudden explosion, but it is the culmination of an administration, inefficient, corrupt and communal, which has disfigured the life of this great Province. But so far as the immediate cause is concerned, rightly reference has been made by members belonging to the Muslim League and also to the Opposition that we have to look to the resolution that was passed at Bombay at the all-India session of the Council of the Muslim League. Now what happened there? It is said, on behalf of the Muslim League that the Cabinet Mission proved faithless to Muslim interests and thereby created a situation which had no parallel in the history of Anglo-Muslim relationship in this country. What did actually the Cabinet Mission do? The Muslim League, the spoilt and pampered child of the British imperialists for the last thirty years, was disowned for the first time by the British Labour Bartholomew’s Day of which history records some grim events of murder and butchery pales into insignificance compared to the brutalities that were committed in the streets, lanes and bye-lanes of this first city of British India. We have been discussing, Sir, as to the genesis of these disturbances. Time will not permit me to go through the detailed history and course of events during the last few years.
    But let me say this that what has happened is not the result of a sudden explosion, but it is the culmination of an administration, inefficient, corrupt and communal, which has disfigured the life of this great Province. But so far as the immediate cause is concerned, rightly reference has been made by members belonging to the Muslim League and also to the Opposition that we have to look to the resolution that was passed at Bombay at the all-India session of the Council of the Muslim League. Now what happened there? It is said, on behalf of the Muslim League that the Cabinet Mission proved faithless to Muslim interests and thereby created a situation which had no parallel in the history of Anglo-Muslim relationship in this country. What did actually the Cabinet Mission do? The Muslim League, the spoilt and pampered child of the British imperialists for the last thirty years, was disowned for the first time by the British Labour Government…(loud noise from the government benches)…I know it that members when they hear the bitter truth, can hardly repress their feelings. Sir, the fact remains that the old policy of the British Government of no advancement without a Congress-Muslim League agreement was for the first time given up in I946…(loud cries from the government benches)…I have only stated the fact and I do not make any comment on it and still my friends become impatient immediately. Now, the fact remains that the Muslim League was bypassed and the Interim Government has been formed at the Centre. Supposing Mr Jinnah had been asked to form the Interim Government without the Congress, would my friends belonging to the Muslim League have then blamed the government for having betrayed the interests of the Hindu community?
    Sir, what happened after the Bombay resolution? I have before me a summary of the speeches delivered by distinguished spokesmen on behalf of the Muslim League in every part of India and although it was said that the Direct Action Day itself was not the day for commencing direct action, it was at the same time pointed out that the war had begun, the days of peace and compromise were over and now the jehad … (A member from the Government Benches: Against whom?) War against everyone who did not accept Pakistan. That has been made abundantly clear.
    I would ask my friends not to misunderstand me. I am trying to put in brief their point of view as I would ask them also to appreciate our point of view. We are like poles asunder. You say you will plunge the country Pakistan by any means whatsoever. These two points of view are irreconcilable and what I am now telling the House is this that the members speaking on behalf of the Muslim League did not mince matters. Muslim leaders want Civil War. Only a pattern of civil war, according to Mr Jinnah, was witnessed in this very city of Calcutta, but whether civil war will ultimately help Muslims to get Pakistan or not is a matter that remains yet to be seen. It is said that British Imperialists are against the Muslim League. Why talk rot in this way? Who gave you separate electorate and communal award? Who is helping the Sind ministry to remain in power? Is not the Governor a British Governor? Are not the three European members of the Sind Assembly British members of that House? Are they not trying their level best somehow to keep the Muslim League in power and not allow the Congress to go to office although among the Indian members they are in a majority?
    Now, Sir, I shall leave this aside. I shall not refer to the detailed speeches which have been delivered by the Muslim League leaders barring one or two illustrative remarks. When Mr Jinnah was confronted at a pre-conference in Bombay on the 31st July and was asked whether direct action involved violence or non-violence, his cryptic reply was ‘I am not going to discuss ethics’. (The Hon’ble Mr Muhammad Ali: Good.) But Khwajah Nazimuddin was not so good. He came out very bluntly in Bengal and he said that Muslims did not believe in non-violence at all, Muslims knew what direct action meant and there were one hundred and one ways in which this was made clear by responsible League leaders. One said in the Punjab that the zero hour had struck and that the war had begun. All this was followed by a series of articles and statements which appeared in the columns of newspapers—the Morning News, the Star of India, and the Azad. If you read those documents, particularly I would ask my friend Mr Ispahani if he reads those documents, I do not know whether he had learnt Bengali yet, if not, for his benefit a translation can be made of the Bengali article in Azad, he will be able to find out that there was nothing but open and direct incitement to violence. Hatred of Hindus and jehad on the Hindu were declared in highly charged language. That was the background. I am not going to quote the papers, for I have not the time. You have read them and the general Muslim public have acted according to the instructions.”

    ক্রমশ…


    Spread the love
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •