বাংলা গল্পে ঋদ্ধিমা দে

    0
    14
    Spread the love
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  

    ভালোবাসা বেঁচে আছে

    পর্ব ১

    করোনা ভাইরাসের জেরে জারি হল যুদ্ধকালীন তৎপরতা। দুজন মানুষ। দুটো ভিন্ন দেশ। কাজকর্মের টানাপোড়েন। এর সঙ্গেই রয়েছে একরাশ দুশ্চিন্তা।
    আজ প্রায় বেলা বারোটা বেজে গেলো। ভ্রমর বারবার তাকাচ্ছে মোবাইল স্ক্রিনের দিকে। এখনও হোয়াটসঅ্যাপে কৃষাণুর একটাও মেসেজ নেই।
    কৃষাণু থাকে ইতালিতে। পেইন্টার। আজ প্রায় বছরখানেক হল, তারা একে অপরকে দেখেনি। প্রথম এবং শেষ বার দেখা হয়েছিল ভ্রোমরের দাদার বিয়েতে। তারপরেই সোশ্যাল মিডিয়ায় টুকটাক কথা। এভাবেই গড়ে উঠলো একটা নাম হীন সম্পর্ক। এক অদ্ভুত নির্ভরতা।
    এদিকে ভ্রোমর কোলকাতায়। RJ । অতএব ছুটি ঘোষণা হলেও তার ছুটি নেই। প্রতিদিন ভিড় বাসে যুদ্ধ করতে করতে এক ঘন্টার রাস্তা পেরিয়ে ভ্রমরকে পৌঁছতে হয় তার রেডিও স্টেশন। যদিও কদিন করোনার কারনে বাসে ভীড় একটু কম। তার প্রতিদিনের সহযাত্রী এখন হাতে গোনা কয়েকজন দুর্ভাগা কর্পোরেট কর্মী।
    বাড়ির যাবতীয় দায়িত্ব এখনও বাবাই দেখে। ভ্রমরকে সেসব নিয়ে মাথা ঘামাতে হয়নি কখনও। কিন্তু এখন চারিদিকে যা শুনছে তাতে খুব প্রয়োজন ছাড়া বাবাইকে বাইরে বেরুতে দিতে মন চায় নি। তাই আজ বাজারটা ভ্রমর নিজেই করে এবং আগামী এক সপ্তাহের বাজার করে ফেলে সে। আর তা করতে গিয়েই আজ বড্ড দেরি হয়ে গেল। বাস থেকে নেমে এক নিঃশ্বাসে দৌড়ে ঢুকে পড়ে অফিসের লিফ্টে। সোজা উঠে যায় পাঁচতলায়। লিফ্টের দরজা খোলা মাত্রই সে একটা লঙ্ জাম্প দিয়ে ঢুকে পড়লো স্টুডিওতে।
    এখন প্রতিদিনের রুটিন মাফিক করোনা ভাইরাস সম্পর্কে সচেতনতার স্ক্রিপ্টটা পড়ে 90s এর একটা গান চালিয়ে দিয়ে সে ধপ করে বসে পড়লো পেছনে রাখা রিভলভিং চেয়ারটায়। বড্ড হাঁপিয়ে গেছে সে। এক ঢোক জল খেয়েই চোখটা চলে গেল পাশে রাখা মোবাইলের দিকে। স্ক্রিনের আলোটা জ্বালিয়ে দেখলো– না! এখনও কোনো মেসেজ নেই কৃষাণুর! আজ সে হঠাৎ কেন এতটা ব্যস্ত? কী করছে সে? একটা Good Morning মেসেজও পাঠালো না আজ! সঙ্গে সঙ্গে মনের মধ্যে ভিড় করলো একরাশ ভয়। ওর শরীর ঠিক আছে তো? কোনোভাবে জ্বর বা করোনা…!
    না না। নিশ্চই তা নয়! নতুুন কোনো প্রজেক্ট নিয়ে ব্যস্ত বোধহয়। কিন্তু তাও তো হওয়ার কথা নয়। এখন তো সব মিউজিয়াম আর আর্ট গ্যালারী প্রায় বন্ধ। তাই Painting বা Sculpture এর restoration এর প্রশ্নই ওঠে না। ইতালির যা অবস্থা…

    পর্ব ২

    কিছুক্ষণ পরে গানটা শেষ হওয়া মাত্রই শোনা গেল ভ্রমরের গলা।
    ”কেমন আছেন কলকাতা? আজ আমাদের বড়ো দুর্দিন। দেশ জুড়ে বেড়েই চলেছে করোনা আক্রান্তের হার। আজ আমরা বরং করোনা নিয়েই কথা বলি। শুনে নেব আমাদের প্রবাসী বন্ধুদের থেকে তাদের দেশের ঠিক কি অবস্থা। এই সময় আমাদের সচেতনতা খুবই প্রয়োজন। দূরে থেকেই একে অপরের পাশে থাকা বোধহয় ভীষণ ভাবে দরকার। আমাদের কল লাইন খুলে গেছে।আপনারা ফোন করতে পারেন। শেয়ার করতে পারেন আপনাদের ভাবনা,প্রশ্ন, বা এক্সপেরিয়েন্স। ফোনঃ৯৪৮৮৮***।”
    মিনিট দুই পরেই এলো একটা ফোন।
    “হ্যালো,বলুন আপনি কে বলছেন এবং কোথা থেকে?”
    “আমি ফ্রান্স থেকে বলছি, সুরাঙ্গনা মৈত্র। আগের সপ্তাহেও এখানের মানুষ এই করোনা কে একটুও সিরিয়াসলি নেয়নি। আর আজ এই কেয়ারলেসনেস এর জন্য প্রায় ১২৬১২ এর বেশি মানুষ আক্রান্ত আমাদের দেশে। ৪৫০ র ও বেশি মানুষ মৃত। মাত্র ১৫৮৭ জন সেরে উঠেছে।আপনারা প্লিজ একটু রেসপন্সিবল হন। ভালো না লাগলেও সরকারের কথা শুনুন। আমি এখানে Lockdown। আমার বৃদ্ধা মা একা থাকেন কলকাতায়। বালিগঞ্জ এর একটি ফ্ল্যাটে। অসুস্থ। বড় চিন্তায় আছি মাকে নিয়ে। তাই অনুরোধ করছি আপনারা নিজেরা লকডাউন এ থেকে নিজে বাঁচুন আর সোশাইটিকে বাঁচান প্লিজ। স্টে সেফ।”
    “আমরা সবাই আপনার মায়ের দ্রুত সুস্থতা কামনা করি। এবং একজ্যাক্টলি যেমন সুরাঙ্গনা বললেন,আপনারা সুস্থ থাকুন আর বাড়ির বয়োজ্যেষ্ঠদের সুস্থ রাখুন। ” এইভাবেই প্রায় আরো ১০/১২ টি কল এলো ব্যাক টু ব্যাক। শেষ কলটি এলো ইতালির ভো ইউগেনিও থেকে। ফোন করেছিলেন সম্রাট ব্যানার্জী। তিনি বললেন,
    ” আপনারা হয়তো জানেন ইতালিতে প্রথম করোনায় মৃত্যু হয় এই ভো-এ। কিন্তু আজ ভো প্রায় সেফ। আমরা পেরেছি। আপনারাও পারবেন। এতে একদিকে যেমন প্রয়োজন সরকারের কড়া সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশাসনের সাহায্যে মানুষকে বাধ্যতামূলক লকডাউনে রাখা, তেমনই প্রয়োজন সাধারণ মানুষের সচেতনতা ও দায়িত্বশীলতা।”
    ” আমরা শুনে নিলাম সম্রাট ব্যানার্জীর কথা। আমরাই পারি নিজেদের ও প্রিয়জনদের এই মহামারি থেকে বাঁচাতে। প্রয়োজন শুধু একটু সচেতনতা। আমরা আজকের আলোচনা শেষ করবো একটা সুন্দর গান শুনতে শুনতে :
    Hey there, Delilah
    Don’t you worry about the distance
    I’m right there if you get lonely
    Give this song another listen
    Close your eyes
    Listen to my voice, it’s my disguise
    I’m by your side…..”
    তবুও তার মধ্যেও একটাও কল এলো না কৃষাণুর। ভ্রমর ভেবেছিল রোজকার মতো যদি আজও কৃষাণু তার শো শোনে, তাহলে নিশ্চই একটা ফোন করবে। সে তো জানে ভ্রমরের কতটা চিন্তা হচ্ছে। কিন্তু না সেরকম কিছুই হল না। ভ্রমর সিফ্ট শেষ করে বাড়ি ফিরলো। রাতে কিছু না খেয়েই ঘর বন্দী করলো নিজেকে। সে বিছানায় শুয়ে উপরে ঘোরা সিলিংফ্যানের দিকে তাকিয়ে রইলো এক দৃষ্টিতে। মনের মধ্যে উঠেছে ঝড়।দুশ্চিন্তায় তার মাথা এখন দপ দপ করছে। চিন্তা করতে করতে কখন যে সে ঘুমিয়ে পড়েছে নিজেও জানে না। তখন রাত প্রায় ৩.৩০। হঠাৎ ফোন বেজে ওঠার শব্দে ভ্রমরের ঘুম ভেঙে যায়।
    মোবাইল স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখলো কৃষাণু। সে দ্রুত ফোনটা রিসিভ করলো। এক নিঃশ্বাসে ভ্রমর তার উৎকন্ঠার কথা বলে গেলো।
    অন্যদিক থেকে কৃষাণুর ক্ষীণ গলায় শোনা গেল দুটো চারটে কথা–
    “হ্যা,এই দেখলাম তোমার মেসেজ। কাল থেকে আমার প্রবল জ্বর। পারদ কিছুতেই নামছে না। ওষুধ খেয়েছি। তাই আর রাতে বেশিক্ষণ জেগে থাকতে পারিনি। আমি নড়াচড়া করার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেছি। অ্যাম্বুলেন্স ডেকেছি। ১০ মিনিটের মধ্যে চলে আসবে। জানিনা এটাই আমাদের শেষ কল কিনা! যদি ফিরে আসি তাহলে আবার কথা হবে। জানি তোমার খুব কষ্ট হচ্ছে। আমারও খুব কান্না পাচ্ছে। মনে হচ্ছে অ্যাম্বুলেন্স নয় মৃত্যু নিতে আসছে আমায়। আমি R.U.B. Venice Hospital এ যাচ্ছি। ওখানে ফোন করলে হয়তো আমার খবর পাবে। রাখি তাহলে? তুমি কি কিছু বলবে? “
    “আমি জানিনা কি বলবো। ইচ্ছে করছে অনেক কিছু বলতে। কিন্তু জানিনা কেন পারছি না। ভালো থেকো। আমি জানি তুমি ফিরবেই। দেখে নিও।”
    মোবাইলের দুপারে নিস্তব্ধতা। অনেকটা মৃত্যুপুরীর মতো। । ভ্রমর আর কৃশাণুর চোখে জলের ধারা আর একে অপরকে হারিয়ে ফেলার ভয়।
    তারপর হঠাৎ সেই মৃত্যুপুরীতে মুশলধারে বৃষ্টি এলে যেমন হতো, ঠিক তেমনটাই শোনা যাচ্ছে!অনেকটা যেন Anacondaর মতো আষ্টেপৃষ্ঠে ধরে রেখেছে দুজনের জীবন এই করোনা। দমবন্ধ হয়ে আসছে।
    কৃষাণু কলকাতার গভঃ আর্ট কলেজের একজন ব্রাইট স্টুডেন্ট ছিল। সেখানেই তার ভ্রমরের দাদা প্রণয়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব। প্রণয় এখন মুম্বাইতে সেটেল্ড। সেট ডিজাইনার। স্নাতকোত্তরের পর কৃষাণু হায়ার স্টাডিজের জন্য চলে যায় তার স্বপ্নের দেশ ইতালি। সেখানে Accademia Riaci থেকে Restoration of Paintings এর ওপর একটা কোর্স করে। বরাবরই ব্রাইট স্টুডেন্ট হওয়ার জন্যই কোর্স শেষে তাকে ওখানের একটি Restoration Agency হাইয়ার করে।
    সে প্রথম কাজ করে ভেনিসের Gallerie Dell’ Accademia তে। সেই কাজের অভিজ্ঞতা সে শেয়ার করে ভ্রমরের সঙ্গে। কীভাবে পুরোনো ছবি ইন্ট্যাক্ট রাখার জন্য একজ্যাক্ট কালার শেড ম্যাচ করে সেগুলোকে রিভাইভ করতে হয়, কত ধরনের কেমিক্যালস ব্যবহার করতে হয়। এছাড়াও সাদা পাথরের মূর্তির জৌলুস হারিয়ে গেলে তা কীভাবে ফিরিয়ে আনতে হয়, এসব গল্প সে ভ্রমরকে বলতো পুঙ্খানুপুঙ্খ। কৃষাণু নিজের কাজকে খুব ভালোবাসে। জীবনটা যেন ইউটোপিয়া।
    সারাবছর কৃষাণুর ছবি Exhibition এ যায়। ছবি টুকটাক বিক্রিও হয়। মাঝেমধ্যে Street Exhibition ও করে। কৃষাণুর ঘোরার খুব নেশা। ইটালির বহু জায়গা ইতিমধ্যেই সে ঘুরে ফেলেছে। ভ্রমরের সঙ্গে সেই সব জায়গার সম্পর্কে vividly আলোচনা করেছে। আর সেইসব জায়গার আর্ট সম্পর্কে তো বোধহয় সবই জেনে ফেলেছে ভ্রমর কৃষাণুর থেকে। এই এক বছরের মধ্যে কৃষাণুর চোখ দিয়ে ভ্রমর দেখে ফেলেছে তার স্বপ্নের দেশ ইতালি। আহা! সে এক অন্যরকম অনুভূতি।

    পর্ব ৩

    কৃষাণু বলেছিল, তার খুব ইচ্ছে সে একদিন Bargello National Museum, Florence এ কাজ করবে। সে কোর্স করার সময় একবার গেছিল সেখানে। জায়গাটা বেশ ইন্টারেস্টিং। এই মিউজিয়ামটি কোনো mere piece of architecture নয় বা ইতালীয় কোনো বিখ্যাত মানুষের বাড়িও নয়। ওটি ১২২৫ সালে ছিল একটি কয়েদখানা। ওখানে গেলেই বোঝা যাবে পুরোনো কয়েদখানা কতটা ঠান্ডা। তার চেয়েও বেশি আকর্ষণীয় জিনিসটি হলো Donatello র কিছু Sculpture।
    আজ কেটে গেল প্রায় একসপ্তাহ। ভ্রমর প্রায় রোজই ফোন করেছিল ওই হসপিটালে। রিসেপশনিস্ট কৃষাণুর খবর দিতে নারাজ। হসপিটালে পেসেন্ট থিকথিক করছে। তারা নিঃশ্বাস ফেলার সময় পাচ্ছে না। তাই তাদের মোটেই ইচ্ছে নেই কোনো একজন রোগী সম্পর্কে কোনোরকম কথা বলার ভ্রমরের সঙ্গে।
    এদিকে কৃষাণু প্রতিদিন মৃত্যুকে দেখতে পাচ্ছে ওর আরও কাছে। কোনো চিকিৎসা বা ওষুধ আর তার শরীরে কাজ করছে না। প্রতিদিন আরও একটু করে রিল্যাপ্স করছে সে। ডাক্তারদের মতে করোনা ভাইরাস এর চেয়েও তার depression তাকে আরও বেশি করে ঠেলে দিচ্ছে মৃত্যুর কোলে। কৃষাণু বাঁচার আশা ছেড়ে দিয়েছে। ডাক্তাররা অসহায়। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটছে। ডাক্তাররা কাঁদছে। তারা সম্পূর্ণ ব্যর্থ। তাদের মনে হয় একমাত্র তীব্র পজিটিভ উইল পাওয়ারই পারে মানুষকে বাঁচাতে।
    চিকিৎসার পাশাপাশি প্রতিমুহূর্তে চলছে পেশেন্টদের কাউন্সেলিং। কৃষাণুর কাউন্সেলিং করছেন ডঃ এমিলিয়া।
    আজ এমিলিয়ার ফার্স্ট সেশন। বিকেল তখন প্রায় পাঁচটা। হলওয়ে দিয়ে এমিলিয়া এসে পৌঁছলো কৃষাণুর রুমে।
    “আমি এমিলিয়া, সাইকোলোজিস্ট। কেমন আছেন?”
    কৃষাণুর মুখে কোনো শব্দ নেই। তার শরীর এখন স্কাল্পচারের মতোই স্থবির। চোখের কোণে গড়িয়ে পড়ছে জল। সে শুধু চুপ করে তাকিয়ে আছে তার ডানদিকের জানলার বাইরে। বাইরে শহর নিস্তব্ধ। যেন হঠাৎ সব মানুষ একসঙ্গে বধির হয়ে গেছে। আর হাসপাতালে হাজার হাজার মানুষের Cacophony। সে অদ্ভুত সব আওয়াজের ককটেল।
    “আপনি তো পেইন্টার। আপনি পুরনো সব মর্চে ধরা আর্টপিস Restoration এর কাজ করেন। আপনিই পারবেন কৃষাণু! নিজের জীবনটাকে আবার Restore করতে। জীবন সুন্দর। আপনি জানেন।”
    এমিলিয়া প্রাণপন চেষ্টা করছে কৃষাণুকে কথা বলানোর। সে পারলো না আজ। ব্যর্থ।
    “আজ উঠি! কাল আবার আসবো। ভালো থাকবেন।”
    পরদিন যখন এমিলিয়া কৃষাণুর ঘরে এলো তখন কৃষাণু ঘুমোচ্ছে। স্টুল টেনে বসলো এমিলিয়া।
    “ও আপনার ঘুম ভেঙে গেছে! ডক্টরদের কাছে শুনলাম আপনি অনেকটা রিকভার করেছেন। এটা তো বেশ সুখবর! ও! আপনাকে বলা হয়নি। ভ্রমর মিত্র নামের একজন প্রায় এক সপ্তাহ ধরে ফোন করছে আপনার খোঁজখবর নিতে। আপনি কি কথা বলতে চান? না চাইলে কোনো প্রবলেম নেই, ইটস ওকে। “
    “না…আমি….আমি…কথা বলবো। প্লিজ! ওকে অনেক কিছু বলার আছে! শেষ কয়েকটা কথা! “
    “ওকে well! হ্যালো রিসেপশ! ভ্রমর মিত্র এরপর কল করলে প্লিজ কৃষাণু দত্তের টেলিকমে কলটা এক্সটেন্ড করে দেবেন! “
    প্রায় ঘন্টা দুয়েক পরে রোজকার মতো ভ্রমরের কল এলো। কথামতো আজ এক্সটেন্ড করা হলো কৃষাণু দত্তের কাছে।
    “হ্যালো ভ্রমর! কেমন আছো?”
    গলাভরা অস্থিরতা নিয়ে কৃষাণু বলল কথাগুলো।
    অন্যদিকে ভ্রমরের গলা কান্নায় ভরে এলো।
    “আমি ভালো আছি। জানো তো! কলকাতার অবস্থাও এখন খুব খারাপ। গভর্নমেন্ট টোটাল লকডাউন ঘোষণা করেছে। আমি জানি তুমি খুব তাড়াতাড়ি সেরে উঠবে। সারা পৃথিবী সেরে উঠবে। তোমায় অনেক কথা বলার আছে! ফিরে এসো তাড়াতাড়ি!”
    “জানিনা আর কখনও দেখা হবে কি না! আমি মৃত্যুকে দেখতে পাচ্ছি ভ্রমর। তুমি আমার আশা ছেড়ে দাও। আমি মরে গেলে আমার মৃতদেহটাও পাঠাবে না আমার প্রিয়জনদের কাছে। গণ সৎকার হবে আমার। তোমাকে অনেক কিছু বলার ছিল.…..কিছুই বলা হল না!”
    “আমার বিশ্বাস তুমি বেঁচে থাকবে। তুমি ফিরে আসবেই এ দেশে!”
    কলটা ডিসকানেক্টেড হয়ে গেল।
    কেটে গেল আরও বেশ কিছু দিন। কৃষাণু রিকভার করছে বেশ তাড়াতাড়ি। ভ্রমরের একটা কল মিরেকেল করলো।
    এভাবেই কাটলো আরও দু এক মাস। জুন মাসের মাঝামাঝি। অবশেষে সবকিছু শান্ত হল। আবার শোনা যাচ্ছে রোমান ক্যাথোলিক চার্চের ঘন্টার শব্দ। পোপ আবার হাত নাড়াচ্ছে জনসমুদ্রের দিকে। ইতালির রাস্তায় আবার মানুষ হাঁটছে। গন্ডোলা ভাসছে নদীতে। মিষ্টি রোদমাখা একটা দিন। মৃত্যুপুরীতে ফিরেছে প্রাণ। করোনা মানুষের কাছে পরাজিত হয়ে পলাতক। প্রকৃতিও এখন অনেকটা সুস্থ। মানুষ বুঝতে শিখেছে প্রাণের দাম। দুটো মানুষ এখন আরও কাছাকাছি। সম্পর্কের ভিত শক্ত করে দিয়ে গেছে ওই বদরাগী ভাইরাস।
    এদিকে ধর্মতলা, অফিসপাড়ায় আবার আগের মতো ভীড়। চিড়িয়াখানার সামনে শিশুদের কলরব। শাহিনবাগ, পার্ক সার্কাসে দেখা যায়নি আর প্রতিবাদী জমায়েত। বোধহয় এই করোনা রাষ্ট্রের ভাবনাও কিছুটা বদলে দিয়েছে। সবাই আবার তাদের নিজেদের ছন্দে ফিরছে।
    সতেরো ঘন্টা জার্নি শেষে কলকাতা বিমানবন্দরে পৌঁছোলো কৃষাণু। ওকে নিতে এসেছে ভ্রমর। কৃষাণুকে দেখামাত্র ভ্রমর জড়িয়ে ধরলো তাকে। কৃষাণু বলল, “একটা কথা প্রমাণিত
    If love doesn’t set us apart, then nothing in this world can part us.”
    তারা একটা উবের বুক করে রওনা দিল কৃষাণুর বাড়ির উদ্দেশ্য। বাইরে নেমেছে মুষলধারে বৃষ্টি। যেন ভীষণ ক্লান্ত দিনের শেষে স্নান করে শুদ্ধ হচ্ছে গোটা মহানগরী। গাড়িতে চলছে 98.3 Radio Mirchi। চলছে ভ্রমরের প্রিয় গান
    “…..বহুদিন পরে এলে সেই
    নিলে হাতদুটো কাছে
    শহর মেতেছে উচ্ছ্বাসে আর
    আলো ফোটে গাছে গাছে……..”

    Spread the love
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •