প্রবন্ধে দুর্গাদাস মিদ্যা

    0
    14
    Spread the love

    অবিস্মরণীয় স্মৃতিপথ ধরে হাঁটা

    জীবনের শেষ ধাপে এসে নতুন করে ‘পথের পাঁচালি’ পড়ছিলাম তাতে যে অনুভবে সিক্ত হল মনের অঙ্গন সেই নিয়ে দু-চার কথা ব্লার প্রয়াসমাত্র। একথা মানতেই হবে যে কোনো মানুষের মনে শৈশব চিরকাল বিরাজমান তা সে যতই তাঁর জৈবিক বয়স বৃদ্ধি পাক। জীবনের শৈশবে যে Impression পড়ে তাঁকে কিছুতেই তোলা যায় না। কাঁচা মাটির তালে সে ছাপ অঙ্কিত হয় যা যত পোড়ানো যায় তত তার উপস্থিতি আরো গাঢ় হয়। পরিস্ফুট হয় যদি না সে বদ্ধ পাগল হয়ে থাকে। এই বোধ থেকেই ফিরে দেখা বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়ের পথের পাঁচালিকে।
    ‘পথের পাঁচালি’র রচনাকাল সেখে নেওয়া দরকার। কারণ কালের দাগ থাকবেই রচনায় তাকে অতিক্রম করা একেবারেই সহজ নয়। তাই কালোত্তীর্ণ লেখা পাওয়া খুব দুষ্কর। তবুও আমরা ‘পথের পাঁচালি’ নিয়ে আলোচনায় আছি এই কারণে সময় থেমে নেই ধরেই এগিয়ে যাওয়া। সময়কে বুঝতে চেষ্টা করা। বুঝতে চেষ্টা করা কোন গুণে এখনও ‘পথের পাঁচালি’ আমাদের কাছে সুখপাঠ্য! ‘আমাদের’ শব্দটি এখানে খুব গুরুতবপূর্ণ।
    রচনাকাল ৩এপ্রিল ১৯২৫, শুরু শেষ হয় ২৬ এপ্রিল ১৯২৮। আমাদের একটা ঈর্ষণীয় অতীত আছে। যে অতীতে আমরা হেঁটেছি শিশির ভেজা পথে, গায়ে মেখেছি সোনালী রোদ, ঝড়ে আম কুড়িয়েছি বারবার। আবার ঝুপ করে ব্যাঙের মতো লাফ দিয়ে স্নান সেরেছি পুকুরে অথবা জলাশয়ে ‘পথের পাঁচালি’ পড়তে সেই স্মৃতি উঠে আসে অপু অ দুর্গার জীবনযাপনে। এই ছোট ছোট ঘটনাগুলো শিরশিরিয়ে দেয় আমাদের এই শিরদাঁড়া। এটাই বোধহয় বিশেষ প্রাপ্তি ‘পথের পাঁচালি’ পড়ার। আর এখানেই লেখকের সৃষ্টির সার্থকতা। একটু বিস্তারে বলি।
    ‘পথের পাঁচালি’র বয়স ৯১ বছর। সহজেই অনুমেয় সেখানে যে জীবনচিত্র উঠে এসেছে তা এখন প্রায় সর্বাংশেই অনুপস্থিত। এখন সে গ্রামও নেই, গ্রামীণ সেই সভ্যতাও প্রায় অন্তর্হিত। সর্বত্রই শহর সভ্যতার বিপুল দাপাদাপি। এর কারণ দূরদর্শন। তখন দূরদর্শন ছিল না। গ্রামে আর শহরের বিস্তর দূরত্ব। দৈনন্দিন জীবনের গতিপ্রকৃতি ছিল একেবারে ঢিলেঢালা।
    গতির এমন তীব্রতা ছিল না। দুপুরের নিস্তব্ধ নিস্তরঙ্গ পুকুরের মতো জীবন ছিল। বর্তমানে সেসব এতই অতীত যে এখন আমরা আমাদের জন্মভিটা গ্রামে গেলে সেই গ্রামকে খুঁজে পাই না। ‘পথের পাঁচালি’ পড়তে পড়তে সেই গ্রামীণ জীবনের স্মৃতি ঝোড়ো হাওয়ার মতো চারপাশ থেকে উঠে আসে। বিচলিত করে, আন্দোলিত করে, আলোড়িত করে। আর সেই চঞ্চল দুরন্ত শৈশব। অপু তখন এক ছোট যে তার মধ্যে আমি আমাকে খুঁজে পাই না ততটা যতটা পাই দুর্গার চাপল্যে। এই দৌড়ে আম কুড়োতে যাওয়া, কুল পেড়ে খাওয়া এইসব। কিছু উদ্ধৃতি না দিলে ব্যাপারটা তেমন খোলসা হবে না। ইন্দিরঠাকরুন যখন দুর্গার হাতে আধখানা নোনা ফল তুলে দিচ্ছে তখন কি ভীষণ মনে হচ্ছে ওই দুর্গা সত্যিই আমি আর ইন্দিরঠাকরুণ আমার সেই বুড়ি দিদিমা যিনি অকালবৈধব্যের শিকার হয়ে ভাইদের বাড়িতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। আমরা অর্থাৎ আমি যেহেতু গ্রামে থাকতাম না কিন্তু গরমের বা পুজোর ছুটিতে গেলেই দেখতাম আমার জন্য সদ্য বিয়ানো গাইয়ের সরযুক্ত ফুটন্ত দুধ এক গ্লাস করে দিতেন। তাছাড়া মৌচাক ভাঙা মধু, গাছের মরশুমি ফল যেমন আতা, পেয়ারা, কুল, আম যথন যা পাওয়া যেত আমার জন্য রাখতেন এমনই স্নেহময়ী ছিলেন তিনি। ‘পথের পাঁচালি’ পড়তে পড়তে বারবার ফিরে যেতে হয় শৈশবে আর স্মৃতিকাতর হয়ে পড়তে হয়। এতটাই বাস্তব চিত্র অঙ্কন করেছেন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়।
    সন্তানবৎসল সর্বজয়া যেন আমার মা। অভাব অনটন ছিল তা নয় তবে প্রাচুর্য ছিল না বলে মাকে একা হাতে সব সাম্লাতে হত। ঠিক সর্বজয়া যেভাবে দশাহাতে সংসারকে আগলে রেখেছিলেন। এই প্রাত্যহিক জীবনের দলিল বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য সম্পদ। যে গ্রামীণ চিত্র তিনি এঁকেছেন তা হয়ত তেমনভাবে এখন আর নেই তবু এক অপূর্ব আবেদন রয়ে গেছে পাতায় পাতায়।
    আয়নার সামনে দাঁড়ালে যেমন নিজের ছবি নিখুঁত ভাবে চোখের সামনে উঠে আসে ঠিক তেমনি নিজেকে, নিজের অতীতকে ফিরে দেখার এক মস্ত দলিল এই ‘পথের পাঁচালি’। বিশেষ করে আমাদের শৈশব যেভাবে কেটেছে গ্রামে, গঞ্জে। যেমন ধরুন সপ্তম পরিচ্ছেদে – ‘নদীর ধারের বাবলা অ জীওল গাছের আড়ালে একটা বড় ইটের পাঁজার মত জিনিস নজরে পড়ে ওটা পুরানো কালের নীলকুঠীর জ্বালাঘরের ভগ্নাবশেষ’। আমি তড়িৎ গতিতে ফিরে গেলাম শৈশবের মামাবাড়ি। ওখানেও নীলকুঠী বলে একটা কুঠী ছিল। এইরকম ছড়িয়ে ছিটিয়ে স্মৃতি পড়ে আছে ‘পথের পাঁচালি’ তে।
    কৈশোরে বা শৈশবে চুরি করে কাঁচা আমের ‘চাকলা’ খায়নি বিশেষ করে গ্রামেগঞ্জে, এমন শৈশব বা কৈশোর কার আছে? এই আম খাওয়ার দৃশ্য পড়ছিলাম অষ্টম পরিচ্ছেদে! কী অসাধারণ treatment ভাবতে গা শিউরে ওঠে। যেন মনে হয় কৈশোর ঠায় দাঁড়িয়ে আছে মহাকালের রথের গতিপথ রোধ করে। উপন্যাস রচনা তখনই সার্থকতা পায়। যখন তা সময়কে অতিক্রম করে। জাতপাতের ভাবনা সেওতো বহমান ধারা আমদের এই দেশে। কৌলিন্য প্রথার প্রবর্তনের ফলে যে জাতিপ্রথার এক মারাত্মক বিষময়ফলের জন্ম দিল তাঁর রেশ এখনো বেশ বর্তমান। এর ফলে কত মানুষের কত কষ্ট, কত দুঃখ তা আমরা সকলেই দেখছি এবং বুঝছি যেমন বুঝেছিলেন হরিহর যায়। যিনি ভয়ে ওর থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন নি। পারলে হয়ত তাঁর আর্থিক কষ্টের বেশ কিছুটা উপশম হতে পারত। সামাজিকতার ভয় এমন তীব্র ছিল যে সর্বজয়াকে সাবধান করে দিয়েছিলেন যাতে সদগোপদের বাড়িতে গুরুগিরির কথা আগেভাগে কেউ জানতে না পারে। সমাজের এই পচনশীল দিকটির প্রতি লেখকের সচেতনতা লক্ষ্য করার মতো।
    অচেনার আনন্দে উদ্বেল হয় না এমন শিশু নেই বা এমন শৈশব নেই। অপুও তার ব্যতিক্রম নয়। বিশেষ করে সেই সময় যখন এত যানবাহনের উপস্থিতি ছিল না, তখন যোগাযোগের একমাত্র ব্যবস্থা ছিল পায়ে হাঁটা অথবা গরুর গাড়ি ন্তুবা পাল্কি, তাও সবার জন্য পাল্কি ছিল না।এইরকম এক অবস্থার মধ্যে দিয়ে অপু চলেছে বাবার সাথে, চলল মহাজনের বাড়ি। যেতে যেতে পথে রেললাইন পড়ল। তা দেখে বালকমনে যে বিস্ময়ের অঞ্জন দুচোখে লেগেছিল তাঁর অপূর্ব বিবরণ তুলে ধরেছেন কথাশিল্পী বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় উদ্ধৃতি অপু এক দৌড়ে ফটক পার হইয়া রাস্তার উপর আসিয়া উঠিল। পরে সে রেলপথের দুইদিকে বিস্ময়ের চোখে চাহিয়া চাহিয়া দেখিতে লাগিল। দুইটা লোহা বরাবর পাতা কেন? উহার উপর দিয়া রেলগাড়ি যায়? কেন? মাটির উপর দিয়া না গিয়া লোহার উপর দিয়া যায় কেন? পিছলাইয়া পড়িয়া যায় না ? কেন? এইরকম হাজারো প্রশ্ন মনের মধ্যে উঠে আসে। শৈশব বা কৌশোরে এই প্রশ্ন কার মনে ওঠেনি? আজও এই প্রশ্ন ঘুরপাক খায় কেন ‘পিছলাইয়া’ যায় না। এই অচেনার আনন্দ কাকে বলে তা অপুর চোখ দিয়ে আমাদের সকলকে দেখিয়ে দিয়েছেন অত্যন্ত সুন্দ্রভাবে। এই ব্যাপারে বিভূতিভূষ্ণ-এর বক্তব্য এত যুক্তিযুক্ত যার উল্লেখ একান্ত প্রয়োজন এই প্রেক্ষিতে।
    তিনি বলেছেন – অচেনার আনন্দকে পাইতে হইলে পৃথিবী ঘুরিয়া বেড়াইতে হইবে, তাহার মানে নাই। আমি যেখানে আর কখনো যাই নাই, আজ নতুন পা দিলাম, যে নদীর জলে নতুন স্নান করিলাম, যে গ্রামের হাওয়ায় শরীর জুড়াইল, আমার আগে কেহ আসিয়াছিল কিনা, তাহাতে আমার কি আসে যায়? এটাই অচেনার আনন্দের মূল কথা। এর থেকে বড় সত্য আর কি আছে?
    অপু আস্তে আস্তে পরিচিত হচ্ছে বাস্তব জগতের সাথে, বাইরের জগতের সাথে। মা, দিদি ব্যতীত আরো অনেকের সাথে পরিচয় বাড়ছে। এই প্রথম চাক্ষুষ করছে অবস্থাপন্ন মানুষজনকে তাঁদের ধনসম্পত্তিকে। তাহাতে বিস্ময়আশ্রিত এক খুশির আস্তরণ লেগে আছে। লেগে আছে তৃপ্তির ভাব। তাই তো হওয়া উচিৎ একটি শিশুর মনে। বিশেষ করে যাদের বাড়ির দৈনন্দিন অবস্থা একেবারেই সুখকর নয়। এমন সুচতুর ভাবে অপুর চরিত্র চিত্রণ করেছেন এইখানে যাতে কোনো হ্যাংলামির আতিশয্য নেই। আছে এক সংঘাত, মার্জিত চরিত্রের অপু। তাই যখন লক্ষণ মহাজনের ছোট ভাইয়ের স্ত্রী অপুকে মোহনভোগ তৈরি করে খেতে দিল তখন অপু ঘি চপচপে ও কিসমিস মিশ্রিত মোহনভোগ খেতে থাকল আর বাড়িতে মার হাতে তৈরি করা মোহনভোগের কথা তার মনে পড়ল। এবং মনে মনে আবছায়া ভাবে বুঝিল, তাহার মা গরিব, তাহারা গরিব – তাই তাহাদের বাড়ি ভাল খাওয়া – দাওয়া হয় না। এরকম বোধ কার হয়নি? কোন শিশুর হয়নি যাদের বাড়িতে অভাব প্রতিদিন দরজায় কড়া নাড়িত!
    পড়তে পড়তে এক জায়গায় এসে থমকে দাঁড়ালাম খাইতে বসিয়া দুর্গা বলিল – পাতালফোঁড়ের তরকারিটা কি সুন্দর খেতে হয়েছে মা। সঙ্গে সঙ্গে অপুও বলিল – বাঃ। খেতে ঠিক মাংসের মত, না দিদি? পাতালফোঁড় আর কিছুই নয় এক ধরনের ছত্রাক জাতীয় বনজ উৎপন্ন এক জিনিষ। আমরা যাকে গ্রাম্য ভাষায় বলি ছাতু আর বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে পরিভাষায় বলতে হয় মাশরুম। তবে এই ছাতু ঠিক সচরাচর দেখা মাশরুম নয় একে বলা হয় – শিক ছাতু। যা খেতে অতীব সুস্বাদু এবং উপাদেয়। মনে পড়ে যাচ্ছে বর্ষার আগমনে বনের মাটি যখন সরস হয়ে উঠে – তখন এই সমস্ত ছাতু বহুল পরিমাণে পাওয়া যেত সেই সমস্ত জঙ্গলে যেখানে বেলেমাটির স্তর থাকে এসব আমাদে চোখে দেখা।সেই দেখাটাই আজ মনের কোণে উঁকি দিচ্ছে বিভূতিবাবুর ‘পথের পাঁচালি’ পড়তে পড়তে। বর্তমানে এইসব কথা ভেবে হতাশায় হৃদয় ভারাক্রান্ত হয়। এখন সেই সমস্ত জঙ্গল প্রায় ফাঁকা। তারপর মানুষের পায়ের চাপে এদের বিকাশ ব্যাহত হচ্ছে ফলে এই বনজ সম্পদ যা খেয়ে অনেক মানুষই প্রোটিনের ঘাটতি পূরণ করতে পারতেন, তারা এখন সেই থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
    ‘পথের পাঁচালি’ আসলে কার জীবনের ‘পথের পাঁচালি’ তা বুঝতে বেশ কষ্ট হয়। ইন্দিরঠাকরুণ একসময় কেন্দ্রবিন্দুতে তাঁর মৃত্যুতে মনে হল ‘পথের পাঁচালি’ শেষ। পরবর্তী সময়ে পড়তে পড়তে মনে হল এ এমন জীবনের চলচ্চিত্র যাতে যে কোনো ব্যসের মানুষের জীবনতরঙ্গ মিশে যায় অনায়াসে। লেখকের লেখনির কুশলতায় সিনেমার পর্দায় উঠে আসে চলমান চরিত্রের মতো এক এক সময় এক এক জন মনকে আচ্ছন্ন করে তোলে। পথ সে তো কারো একার জন্য নির্দিষ্ট নয়। যে সময়ে যে পথ চলে তারই অধিগত। লেখকের মুন্সিয়ানা সেখানেই প্রকটিত যখন দেখি প্রত্যেকটি চরিত্র তাঁদের উপস্থিতির অধিকারকে সুনিশ্চিত করে তোলে। মনে হয় না কেউ এখানে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে।
    বিভূতিভূষণের দেখার চোখ কত স্বচ্ছ একথা বুঝতে কষ্ট হয় না যখন দেখি – ‘মধুসংক্রান্তির ব্রতের পূর্বদিন সর্বজয়া ছেলেকে বলিল – কাল তোদের মাস্টার মশায়কে নেমন্তন করে আসিস-বলিস দুপুরবেলা এখানে থেতে’। চকিতে ফিরে যাই সেই কথায় যেখানে দুর্গা জিজ্ঞাসা করছে – খুড়িমা তোমাদের বাড়ি কে এসেছে, আমি একদিনও দেখিনি কিন্তু। ঠাকুরপোকে দেখিসনি? এখন নেই কোথায় বেরিয়েছে, বিকেলবেলা আসিস, দেখা হবে এখন। তারপর গোকুলের বউ হাসিয়া বলিল-তোর সঙ্গে ঠাকুরপোর বইয়ে হলে কিন্তু দিব্যি মানায়। সেই খবর সর্বজয়ার কানে যায়নি তা তো নয়। অথবা গোকুলের বউ বলেনি তাও নিশ্চয়ই নয়। আগেকার দিনে গাঁয়েগঞ্জে বইয়ে দেওয়ার রেওয়াজ এই রকমই ছিল। এই ঘটনাক্রমে আমাদের ফেলে আসার দিনের কথা মনে করিয়ে দেয়।
    এতগুলো জীবনের পথচলা সে তো আর কম কথা নয়। আশা, নিরাশা, হতাশা, প্রাপ্তি, অপ্রাপ্তি সবই তো জীবনের পরিকাঠামো। সেই পরিকাঠামোয় সর্বজয়ার আন্তরিক ইচ্ছে যদি ফলপ্রসু হয় তবে সেও তো পথের পাঁচালির এক প্রাপ্তি।
    লেখকের প্রকাশের মুন্সীয়ানা কাকে বলে। অর্থনৈতিক স্বাধীনতা না থাকলে যে মেয়েরা কত অসহায় তা সে বিবাহিত হোক বা না হোক তার স্পষ্ট নিদর্শন রাখলেন বিভূতিভূষণ নীরেন ও গোকুলের বউ অর্থাৎ তার স্বল্প পরিচিতা বৌদির কথপোকথনের মধ্য দিয়ে এবং কত অনায়াসে এমন একটি জলন্ত সমস্যার কথা সবার অলক্ষ্যে পরিবেশন করলেন। কথা প্রসঙ্গে পাঁচটা টাকা চাইল নীরেনের কাছে বৌদির হতভাগা ভাইয়ের কাছে গোপনে টাকা পাঠাবে বলে। এই সূত্রে বৌদির কথা একটু শুনেনি-‘চুপ চুপ এ বাড়ির কাউকে বোলো না যেন? পাঁচটা টাকা চেয়ে পাঠিয়েছে, কোথায় পাবো ঠাকুরপো, কিরকম পরাধীন জানো তো? তাই ভাবলাম এই মাকড়ী দুটো…!’ এর মধ্যে যেমন পরাধীনতার জ্বালা আছে তেমনি আছে অকল্পনীয় – ভ্রাতৃপ্রেম যা সত্যিই আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের পথের পাঁচালির এক অনির্বচনীয় অঙ্গ। যা চিরকালীন এবং সমকালীন।
    কুশলী লেখক না হলে কীভাবে তিনি রোমান্টিক মনের সাথে প্রকৃতিকে একাকার করে ফেলেন। দুর্গার মনের অন্তক্ষরণের বিচিত্র গতিপথের সন্ধান লেখক পেলেন কেমন করে। কত সুকৌশলে রানুর বিবাহ সংবাদের মাধ্যমে দুর্গার মনের প্রেমের গুঞ্জনকে তিনি ব্যক্ত করলেন। মনের মধ্যে কতটা স্থান দখল করেছে নীরেন তা বোঝানোর জন্য আশ্চর্য এক পূর্বাবার্তা দেন তিনি সুদর্শন পোকার মাধ্যমে। ‘সুদর্শন পোকা-ঠিক পোকা ন্য-ঠাকুর। দেখিতে পাওয়া অত্যন্ত ভাগ্যের কাজ – তাহার মার মুখে, আরও অনেকের মুখে শুনিয়াছে’। আর দুর্গা সেই ঠাকুরের অথবা সুদর্শন পোকার সাথে পরিবারের সকলের ভালো থাকার জন্য প্রার্থনা করার সাথে নীরনবাবুকে, ও পাড়ার খুড়িমাকে ভালো রাখার প্রার্থনা করছে। এবং মনে মনে বলছে – আমার বিয়ে যেন ওখানেই হয় সুদর্শন। সংস্কার না কুসংস্কার তা জানি না কিন্তু দুর্গার নরম মনের মাটিতে যে আশার সঞ্চার হয়েছে তা কত সুন্দরভাবে উপস্থাপন করলেন। এই কুশলতাকে যদি বাহবা না দিই তবে অন্যায় হবে।
    আজও সেই একই ধারা কিছুটা বহমান। কন্যা সন্তান আর পুত্রসন্তানের মধ্যে স্নেহ ভালোবাসার ব্যবধান। একটি ভাঙা আরশি নিয়ে বিবাদের সূত্রপাত দিদি ও ভাইয়ের মধ্যে। আরশিখানার মালিক ছিল অপু। দিদি কোন ফাঁকে সেটি বের করে নিয়েছে অপুর বাক্স থেকে। এই নিয়ে দুজনের মধ্যে ঝগড়ার সূত্রপাত। দিদির বাক্স থেকে বের করে নেওয়ার চেষ্টা করে অপু। তাতে দিদি রেগে গিয়ে ভড় চাপড় মারার ফকে এইরকম অবস্থার সৃষ্টি হল। দুজনের চিৎকার ও মারামারি শুনে মা সর্বজয়া অকুস্থলে উপস্থিত। মা দেখছে দুর্গা অপুর কান ধরে মাটিতে প্রায় শুইয়ে দিয়েছে। অপুর বেশ লাগে তাতে। সে কাঁদতে কাঁদতে মাকে নালিশ করল – দ্যাখো না মা, আমার আর্শিখানা বাক্স থেকে বের করে নিজের বাক্সে রেখে দিয়েছে-দিচ্ছে না – এমন চড় মেরেছে গালে – দুর্গা এর প্রতিবাদ করলেও মার কানে সে কথা গেল না।
    দুর্গার কথায় কান দেওয়ার প্রয়োজনটুকুও বোধ করল না সর্বজয়া। বরং সর্বজয়া বলল-ধাড়ি মেয়ে-কেন তুই ওর গায়ে হাত দিবি যখন তখন? ওতে আর তোতে অনেক তফাৎ জানিস? পুত্রসন্তান আর কন্যাসন্তানের এই বিভাজন তখন কিরূপ প্রকট ছিল তা সহজেই অনুমেয়। সব দিক দিয়ে বিচার করলে ‘পথের পাঁচালি’ তৎকালীন সমাজ জীবনের এক অনন্য দলিল।
    অপুর বেড়ে ওঠার সাথে কেমন যেন আমাদের, হ্যাঁ আমাদের সেই সময়ের একটা মিল পাওয়া যায়। কেননা তখন কোনো কিছু চাইলেই সহজেই পাওয়া যেত না। তাছাড়া দেওয়ারও সামর্থ ছিল না হরিহর রায়ের। ফলে না পাওয়ার বেদনাতাড়িত হৃদয়ে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা বড় বেশি করে অনুভূত হত যেমন হত অপুর মনে। তাই ‘পথের পাঁচালি’ কখন যেন আমারও অর্থাৎ ওই সময়ে আমাদের বয়সের সকলের ‘পথের পাঁচালি’ হয়ে উঠে।
    কি অপূর্ব মুন্সীয়ানার অপুর মনোবিতানকে গড়ে তুলেছেন লেখক বিভূতিভূষণ। নিয়ে এলেন নরোত্তম দাসের কাছে। যিনি সাতে পাঁচে থাকেন না। কিন্তু একটি পরিশীলিত জীবনযাপন করেন, যিনি বিশেষ গোলমাল ভালোবাসেন না, একটু অন্তমুর্খী। তার সঙ্গে অপুর এই মেলামেশা অপুর চরিত্রবর্ণনের একটি দিক। অনুসন্ধিৎসু এক মনের অধিকারী হয়ে উঠেছে অপু তা বেশ বোঝা যায় ওদের মধ্যে – কথোপকথনে। বোধহয় একথার সত্যতা যাচাইয়ের জন্য এই উদ্ধতিটুকু দেওয়ার প্রয়োজন – সহজ, সামান্য অনাড়ম্বর জীবনের গতিপথ বাহিয়া এখানে কেমন যেন একটা অন্তঃসলিলা মুক্তির ধারা ভিতে থাকে, অপুর মন সেটুকু কেমন করিয়া ধরিয়া ফেলে। তাই দাদু তাকে এত আকর্ষন করেন এখানে আসতে।
    উদ্ভিন্ন যৌবনা কিশোরীর মনে বিবাহ চিন্তায় কি বিচলিত ভাব তাহা খুব স্পষ্ট করে এঁকেছেন বিভূতিভূষণ। দেখা যাক পিছন ফিরে। অপু দুর্গা বনভোজন করবে। সেই প্রেক্ষাপটে দুর্গার মনের কোণে যে আনন্দধারা হঠাৎ তাতে একটা বিষাদের ভাব খেলা করে। কেমন। দুর্গা আজকাল যেন এই গাছপালা, পথঘাট, এই অতিপরিচিত গ্রামের প্রতি অন্ধিসন্ধিকে অত্যন্ত বেশি করিয়া আঁকড়াইয়া ধরিতেছে। আসন্ন বিরহের কোন বিষাদ এই কত প্রিয় গাবতলার পথটি, ওই তাহাদের বাড়ির পিছনের বাঁশবন…। তাছাড়া তার ভাই অপু যাহাকে একবেলা না দেখিয়া সে থাকিতে পারে না। মন হু-হু করে- তাহাকে ফেলিয়া সে কতদূর যাইবে!
    নীরেনের সাথে দুর্গার বিবাহ স্থির হয়ে গেছে ভেবে দুর্গার মনের এই অবস্থা অঙ্কনে লেখক কত কুশলী তা বেশ বোঝা যায়। মানুষের মনের অন্তরে যে আলোড়ন তা যত যিনি পড়তে সক্ষম তিনি তত বড় সাহ্যিতসাধক। এ ব্যাপারে বিভূতিভূষণের জুড়ি ক’জন আছে কে জানে?
    সাগর সিঞ্চন করলে যেমন মণিমুক্তোর সন্ধান পাওয়া যায় তেমনি ‘পথের পাঁচালি’ পড়তে পড়তে আমার মনে হয়েছে এখানে এমন চরিত্রের মানুষজনের ছবি আঁকা হয়েছে যা সমগ্র সমাজ জীবনকে বদলে দিতে পারে যদি সঠিকভাবে অধ্যায়ন করা যায়। ছোট একটা চরিত্র যাত্রাদলের অজয়।
    সে গান গেয়ে মানুষের মনোরঞ্জন করে। দিনকয়েকের আলাপে অনুসন্ধানী অপুর বন্ধু হয়ে ওঠে। সর্বজায়াও ভালো লেগে যায়। অপুর মতোই তাকে আদর আপ্যায়ন করে। বাড়িতে এলে খাওয়ানোর ব্যবস্থা করেছে। সেই অজয় যাইবার সময় সে হঠাৎ পুঁটলি খুলিয়া কষ্টে পাঁচটি টাকা বাহির করিয়া সর্বজয়ার হাতে দিতে গেল।
    একটু লজ্জার সব রে বলিল- এই পাঁচ টাকা দিয়ে দিদির বিয়ের সময় একখানা ভাল কাপড় – এই যে ছোট ছোট ঘটনা অথচ এত অনুভূতি প্রবন উপন্যাসটির সৃষ্টিতে মনিমুক্তোর মতো কাজ করেছে। এই যে মানবিক মুখ উভয় পক্ষের তা কি সমাজ জীবনের মালিন্যকে মুহুর্তের মধ্যে ধুয়ে পরিস্কার করে দেয় না। এই বোধ এখন প্রায় উধাও।  তাই এত পনকিল জীবনযাপন।
    ‘পথের পাঁচালি’ বড় দুঃখের বড় কষ্টের। স্বপ্ন আছে, আশা আছে, আকাঙ্ক্ষা আছে, আছে আশা আকাঙ্ক্ষার অপমৃত্যুও। দুর্গার মৃত্যু সত্যিই একটি সম্ভাবনাময় জীবনের অপমৃত্যু। এ যেন সদ্য প্রস্ফুটিত এক ফুলের অকালে ঝরে পড়া। সাফল্যের তীর্থক্ষেত্রে পৌঁছোবার আগেই শেষ হয়ে যাওয়া বড় বেদনার হয়ত বা অনভিপ্রেত।
    হরিহরের জীবনযাপন একঘেয়ে মনে হয়। যেন তার কোনো চেষ্টা নেই যা থেকে পথের গতিপথ বদলে যেতে পারে জানিনা বিভূতিভূষণবাবু কেন এমন এক চরিত্র চিত্রায়ন করলেন সে শুধু পড়ে পড়ে মার খাবে। তবে অপুকে বেশ কিছুটা বাস্তব করে তোলার প্রয়াস নিয়েছেন লেখক। আমার বিচারে যা মেন হয়েছে তা হল কালের খেয়াঘাটে – বিভূতিভূষণ দাঁড়িয়ে আছেন এমন এক স্বপ্নপ্রবণ এবং সবুজমন নিয়ে যার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে ‘পথের পাঁচালি’ র পাতায় পাতায়।
    বর্তমান সময়ের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে এটা ভাবা বোধহয় ভুল হবে না যে এই ধরনের উপন্যাস রচনার অবকাশ এখন আর প্রায় নেই কারণ বাস্তব পরিবেশ এখন আর সেরকম গ্রামীণ নয় যে গ্রামের পটভূমিকায় এই উপন্যাস। তবু বলি ফিরে পড়তে গিয়ে আমি বেশ রোমাঞ্চিত এবং পুলকিত হয়েছি এই কারণে যে আমি আমার শৈশব এবং কৈশোরকে ফিরে পেয়েছিলাম এই বয়সে এসে আর তার সম্পূর্ণ কৃতিত্ব দিতে হয় ‘পথের পাঁচালি’ অমরস্রষ্টা বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে।
    আরো অনেক ব্লা যায়, লেখা যায়। তবু কোথাও শেষ করতে হয়। শেষ কবি প্রমথনাথ বিশী-র কথা দিয়ে -‘পথের পাঁচালি’ র জগৎ অপুর চোখে দেখা জগৎ, তার সৌন্দর্য অপর চোখে দেখা সৌন্দর্য, বিভূতিভূষণের চোখে নয়। বিভূতিভূষণ অপু ও দুর্গার চোখের ভিতর দিয়ে সৌন্দর্য আবিস্কার করেছেন’। আর সেই দেখাই আমাদের দেখা হয়ে উঠেছে তাঁর সংবেদনশীল লেখনির গুণে। তবে দেখার তো আর শেষ নেই। সেদিনের দেখাটা অপুর হৃদয়কে খুব বিচলিত করেছে যখন দেখেছে হাড়ির ভেতর সোনার কৌটাটা। একেবারে হতবাক অপু। মনে মনে ব্লিল-‘দিদি হতভাগী চুরি করে এনে ওই কলসিটার মধ্যে লুকিয়ে রেখে দিইছিল’! বিশ্বাসভঙ্গতার এই ব্যথা যে কত বড় এবং কত কঠিন তা বাঁশের বনের মধ্যে ছুঁড়ে দেওয়াতেই বোঝা যায়। এইরকম অজস্র দেখা দেখতে দেখতে অপুর ‘অপূর্ব’ হয়ে ওঠা। জীবনের পথ সে তো সোজা নয় নানা বাঁকে দাঁড়িয়ে থাকে নানা ঘটনা বা উপাদান যা জীবনকে পূর্ণতা দেয়। সেই পূর্ণতার পথে এগিয়ে চলেছে জীবন।

    Spread the love