উৎসব সংখ্যায় ছোটগল্প – সঞ্জীব সেন

    0
    13
    Spread the love

    শূন্যরূপ

    সকালে ঘুম ভাঙতেই  রমেনবাবুর    মনে পড়ে গেল কলিগ অতনুর কথাটা, সুলেখা মিত্র “আমি সুলেখা”  বলে একটা ইউ টিউবে একাউন্ট  খুলেছে, সেখানে নাকি ইউজারদের কাছে শর্ত রেখেছে  কমেন্ট বক্সে লিখেছে ন্যুড কনটেন্ট থাকবে তো তোমার? তাহলে সাবসক্রাইব করব। সুলেখা নিজের প্রশ্নের জবাবে এমন সপাটে চড় বসিয়েছে, যা সেই সব পুরুষজাতির গালে এসে পড়েছে, যারা সবেতেই ন্যুড কনটেন্ট চায়, বলছে ন্যুড কনটেন্ট চাই, চলুন , জামার বোতাম খোলার আগে ভিউয়ারদের নিয়ে যাই কুমারটুলি, মায়ের গায়ে কাপড় ওঠেনি, নিরাভরণ ,   উন্মুক্ত রিপুদলনীর শরীর । তারপর প্রশ্ন রেখেছে নিন দেখুন তো,  অনেক ন্যুড কনটেন্ট পেলেন,  দাঁড়িয়েছে তো! মোক্ষম জবাব! রিনা এসে গেছিল তাই অতনু চেপে গেছিল, রিনার ভেতরে একটা জিনিস আছে, যেন  কাঁপিয়ে দেয় ! কি চোখ, কি ঠোঁট!
    অপলা ঘরের কাজ করছিল, ওর দুবছরের মেয়েটা নিজের মনে খেলে যাচ্ছে মেঝেতে পুতুল নিয়ে, অপলাকে দীপা দিয়ে গেছে ।দীপার ছমাস চলছে দেখে অপলাকে বহাল করে গেছে । অপলা মেটালের মুর্তিগুলো পরিষ্কার করে সিলিংএর ঝুল ঝাড়ছিল, খাটিয়া শরীর , যাকে বলে টাইটফিট, তেইশের মেয়ে , যৌবন তো কাউকে রেয়াত করে না, গরীব  কিম্বা ধনী , ঢিলেধালা নাইটির হাতা দিয়ে ওর সুগোল স্তনদুটো দেখা যাচ্ছে, নিপুণ ভাবে ধরে রেখেছে  শরীরে ।
    মোবাইল দেখার ফাকে মাঝেমধ্যে রমেনবাবু দেখেছে, বৌ বাড়ি নেই, রাজস্থান গেছে পিঙ্ক সিটি দেখতে, পাড়ার কয়েকজন মিলে সোনার কেল্লা দেখবে , রমেনবাবু  অফিসে দু দিন ছুটি নিয়েছে, আর বৃষ্টিও  হচ্ছে টানা তিনদিন ধরে আরও আটচল্লিশ ঘন্টা, মানে  দুইদিন নাকি এমনই থাকবে ! চোখ সরিয়ে  রমেনবাবু  অপলাকে বলল কিরে তোর বর এখন মন দিয়ে কাজটা করছে তো! টাকা পাঠায় ঠিকমত!জুয়া খেলে টাকা উড়িয়ে দিচ্ছে না তো! অপলা বলল এইতো একমাস হয়েছে, টাকা পাঠিয়েছে, ফোনও করে , মেয়ের খোঁজ নেয় ।রমেনবাবু  বলল তবে তো ভাল!
    হ্যারে, অপলা, তোদের ঘর থেকে নকি জল পড়ে! মেয়েকে নিয়ে শুস কোথায়, কদিন আগে জ্বর থেকে উঠল, যদি চাস  বৃষ্টি যতদিন না কমে নীচের ঘরটায় থাকতে পারিস, অপলা নীচু হয়ে ঝাড়ু দিচ্ছিল, রমেনবাবু  দেখছিল, রমেনবাবুর
    মনে হল অপলা কি ইচ্ছা করেই দেখাচ্ছে?দেখুক ন্যুড কনটেন্ট চাই তো আপনার! অপলা বলল, দাদাবাবু পা তুলুন  নীচটা ঝাড়ু দেবো, তখনই যেন শুনতে পেল ,  অপলাই যেন  বলছে, পেয়েছেন, দাঁড়িয়েছে তো?, রমেনবাবুর  ভিতর একটা হিম-স্রোত বয়ে গেছিল,  একটা   থাপ্পড় যেন  গালে এসে পড়ল ।অপলা বলল তবে কি বিকেলে মেয়েকে নিয়ে আসব, যতদিন বৃষ্টি না কমে থাকি এখানে, কদিন তো মেয়েকে শুকনো জায়গাটা শুয়ে আমি ভিজেতেই শুয়ে থাকতাম, আপনি অনেক উপকার করলেন ।

    ঘড়ির কাটা তখন সাড়েনটা, দোতলা থেকে রমেনবাবু  নীচে নেমে এল, দরজা খোলাই ছিল, অপলা মেয়েকে ঘুম পাড়াচ্ছিল, অপলা বলল আসুন দাদাবাবু, কিছু বলবেন!  দেখতে এলাম মেয়ে ঘুমিয়েছে কিনা, কোন অসুবিধা হচ্ছে কিনা।
    অপলা বলল মেয়ে তো ঘুমিয়ে কাদা, আমি শুয়েছিলাম, বসুন না,রমেনবাবু চেয়ার টেনে সামনে বসেছিল, অপলার গায়ে রাতের পোশাক, গাউনটা পাশে রাখা ছিল,। পোশাকটা দামিই হবে. নতুন ধরনের, রমনবাবুর চোখ স্তনমন্ডলের দিকে, তেইশের যুবতীর বেড়ে ওঠা যৌবন-চিহ্ন গুলো দেখছিল, উন্মুক্ত বক্ষের বিভাজিকা  উঁকি মারছিল, রমেনবাবু  চোখ সরিয়ে অপলাকে বলল, কী রে, হারু তাহলে মন দিয়ে কাজটা করছে তো? ভ্যান চালিয়ে আর কটাকা হত? রান্নার কাজটা শিখে গেলে রোজগারের একটা পথ  খুলে যাবে। যোগানির কাজ থেকে পাকা রাধুনি হয়ে যায় যদি…
    তোদের তো প্রেম করে বিয়ে, আলাপ হল কীভাবে?
    অপলা বলল, আমার বাবা একটা ম্যাটাডোর থেকে দুটো করেছিল , ও ছিল খালাসি, বাবার সঙ্গে দেখা করতে আসতাম,আর তখন থেকেই আরকি!বাবার কাছে যখন ছিল ভালোই ছিল, হঠাৎ বাবাটা চলে গেল, আর মা তো বাবাকে ছেড়ে চলে গেছিল, আমি তখন কোলের বাচ্চা আমাকে রেখে চলে গেছিল ,সেই মা এসে উদয় হয় সঙ্গে ভাইরা।গাড়িবিক্রির সব টাকা নিয়ে চলে গেছিল, হারুর সাথে সবে বিয়ে হয়েছে তখন, সঙ্কটে পড়ে গেলাম, হারু ভাড়ায় ভ্যান টানত, নেশা করতে শুরু করল, জুয়া খেলত, দুবার পেয়েেওছিল।কিন্তু  বেশিরভাগ খুয়েছে, আর যেদিন পেত যেন রাজা বাদশা । এই নাইটিটা দামি দোকান থেকে কিনে দিয়েছিল, মেয়ের জন্য দুটো জামা, হোটেলে খেয়েছিলাম। অপলার ঠোঁটে হাসির ঝলক, অপলা বুঝতে পারছিল, দাদাবাবুর চোখ যেন ওর  শরীরে কর্ষণ করছে, স্তনমন্ডলের থেকে বাহুমূল হয়ে নিচের দিকে নেমে এসেছে।অপলা বলল, অনেক রাত হয়েছে, শুয়ে পড়ুন। আমিও শুয়ে পড়ি। রমেনবাবুও নিজের ঘরে চলে এসেছিল ।

    ৩.

    ঘরে এসে কালীমাতার ছবির দিকে তাকিয়ে নমস্কার কবার সময় অন্যরকম অনুভুতি হল। পঞ্চাশ বছরে কোন রোগ বাসা বাধেনি।আজ মনে হল শরীরের ভিতর একটা ঠাণ্ডা স্রোত বয়ে গেল, নিরাভরণ
    মা-ই যেন বলল, ন্যুড কনটেন্ট খুঁজছিস! পেলি? তখনই ভয়টা  চেপে বসল। শুয়ে উসখুস করছিল, তারপর একটা সময় ঘুমিয়েও  পড়ল ।
    স্বপ্নে মানুষ যা দেখে সবই  কী অলীক  ! লৌকিক কী কিছুই নেই! রমেনবাবু দেখল সেই ছোট বেলায় সুখেন পালের কুটিরে ছুটে যেত, ঠাকুর বানাচ্ছে সুখেন দাদু, চোখে মোটা চশমা যেন হরলিক্সের কাচ দিয়ে বানানো।  ও  মন দিয়ে দেখত মায়ের গায়ে মাটির প্রলেপ, মাটি ছেনে বক্ষদেশে  লেপন করছে। কী সুন্দর! আজ সুখেন দাদু বলল, এসেছিস, নে মাটি ছেনা আছে, মায়ের বক্ষদেশে মাটি দে গে!
    -ও  বলল,  আমি পারব? সুখেন দাদু বলল, কেন পারবি না,  অপলারটা দেখলি তো, আলাদা কিছু !  চারদিকে প্রতিমা বানোনো হয়ে আছে, কাপড়  ওঠেনি  রিপুদলনীর শরীর ,শুনতে পেল কিছু
    নারীকন্ঠ, অপলা, বৌ অনিতা, কলিগ রিনা, পোশাকহীন, সবাই  বলছে, আলাদা কিছু! সুখেন দাদু বলল,এত এত ন্যুড কনটেন্ট,পারবি না?
    ঘুম ভেঙে গেল রমেনবাবুর, দূর থেকে একতারার সুর  ভেসে আসছে। নগেন দাদু গাইত, বাবার কাছ থেকে আটআনা নিয়ে  ছুটে যেত, কী গানটা গাইত মনে করার চেষ্টা করল, মনে পড়ল না। কী মানে গানটার না জেনেই  এত ভাললাগত! পরে জেনেছিল লালনফকিরের দেহতত্বের গান।দেহতত্ব মানে সেদিনও বুঝতে পারিনি, আজও কি বুঝিনি ?
    দূর থেকে ঢাকের আওয়াজ আসছে  তখন । অপলা চা নিয়ে এসেছে, রমেনবাবু খুঁজে চলেছে ছেলেবেলায় শোনা নগেন বাউলের গানটা, সেখানে একজায়গায় শূন্যরূপের কথা বলেছে মনে পড়েছে ,”অস্থি-চর্ম শূন্যরূপ, আছে মহারসের কূপ,বেগে ঢেউ খেলে” জগতে সবকিছুই  শূন্যরূপ, বুদবুদসদৃশ , তবে শূন্যের ভিতর এমন কী খুঁজি,যা নিরন্তর খুঁজে চলে মন ।

    Spread the love