অনুবাদ সাহিত্যে সোমনাথ রায়

0
4
Spread the love

মানুষমায়ের ভালুকছানা

এস্কিমো লোককথা

অনেক অনেক দিন আগে গ্রীনল্যান্ডের সমুদ্রের ধারে অনেক এস্কিমোদের সঙ্গে একজন এস্কিমো বুড়ি বাস করত। তার প্রতিবেশীরা শিকার করে ফেরার সময় তাকে মাংস আর চর্বি,   দু’রকমই দিয়ে যেত।
এই রকমই তারা একবার শিকারে বেরিয়েছে – এখন ঘটনা হল কি তারা মাঝেমধ্যেই ভালুক শিকার করত আর তার ফলে প্রায়ই তাদের ভালুকের মাংস জুটে যেত – এবার তারা পুরো একটা ভালুক নিয়ে এল। তার পাঁজরার একটা অংশ বুড়িমা তার ভাগে পেল। ভালুক শিকারীর বৌ বুড়িমার জানলায় এসে বলল – “আমার ছোট্ট সোনা বুড়িমা গো, তুমি কি একটা ভালুকছানা পুষতে চাও?”
সত্যি সত্যি বুড়িমা তাদের বাড়ি গিয়ে বাচ্ছাটাকে নিয়ে এল, সীলমাছের তেলের কুপীটাকে সরিয়ে জানলার ওপর ছানাটাকে বসিয়ে রাখল কারণ বাচ্চাটা বরফে জমে গিয়েছিল। হঠাত সে লক্ষ করল যে ছানাটা অল্প একটু নড়ল। সঙ্গে সঙ্গে বুড়িমা ওকে নামালো গরম করবার জন্য। তারপর সে খানিকটা চর্বি গরম করল কারণ সে শুনেছিল যে ভালুকরা চর্বি খেয়েই বেঁচে থাকে। এইভাবে সে তাকে মাঝে মাঝে খাওয়াতে লাগল – চর্বি লাগানো মাংস খাওয়ার জন্য আর গলানো চর্বি পান করবার জন্য। রাত্তিরে বাচ্চাটা তার কাছে শুতে লাগল।
আর রাত্তিরে বাচ্চাটা তার কাছে শুতে শুরু করার পর থেকেই সে দ্রুত বেড়ে উঠতে থাকল আর বুড়িমা তার সঙ্গে মানুষের ভাষায় কথা বলতে লাগল, সেজন্য ভালুক ছানাটার মানুষের মত চিন্তা করার ক্ষমতা হ’ল, আর যখন তার খিদে পেত সে তার পালিকা মায়ের গা শুঁকতে শুরু করত।
বুড়িমার আর কোন অভাব রইল না কারণ প্রতিবেশীরা বাচ্চাটার জন্যও তাকে খাবার দিয়ে যেত। প্রতিবেশীদের বাচ্চারা প্রায়ই তার সঙ্গে খেলতে আসত আর বুড়িমা তাকে সাবধান করে বলত – “ভালু, ওদের সঙ্গে খেলার সময় তোমার নখগুলো ঢুকিয়ে রাখার কথা সব সময় মনে রাখবে”।
সকাল হলেই বাচ্চারা জানলাতে এসে ভালুকে ডাকত – “বাচ্চা ভালু, বাইরে এসে আমাদের সঙ্গে খেলবে চল, কারণ আমরা এখন খেলতে যাব”।
আর তারা সবাই মিলে যখন খেলতে শুরু করত, ভালু বাচ্চাদের খেলনা হারপুনগুলো ভেঙ্গে দিত, কিন্তু যখনই সে কোন বাচ্চাকে ঠেলা দিতে চাইত, সে তার নখগুলোকে লুকিয়ে ফেলত। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই সে এত শক্তিশালী হয়ে উঠল যে তার বন্ধু খেলুড়েদের কাঁদিয়ে ছাড়ত। আর কিছুদিন পরে তার ক্ষমতা এত বেড়ে গেল যে বড় মানুষরা তার সঙ্গে খেলতে শুরু করল আর এইভাবেই তারা ভালুকে আরও শক্তিমান করে তুলে বুড়িমার উপকার করত। কিন্তু অল্প কিছুদিন পর ভালুর গায়ের জোরের সঙ্গে যখন বড়রাও পেরে উঠল না তারা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করল – “চল, একে আমাদের সঙ্গে শিকারে নিয়ে যাওয়া যাক। সীলমাছ খুঁজতে ও আমাদের কাজে লাগতে পারে”।/কাজে আসতে পারে/ সাহায্য করতে পারে
এইভাবেই একদিন ভোরবেলায় তারা বুড়িমার জানলায় এসে চীৎকার করে ডাকল – “ছোট ভালু, আমাদের শিকারের ভাগ নেবে চল। ভালু, বেরিয়ে এসে আমাদের সঙ্গে শিকারে চল”।
বেরুবার আগে ছোট্ট ভালু বুড়িমার গা শুঁকল। তারপরে সে বড় মানুষদের সঙ্গে চলল শিকারে।
রাস্তাতে যেতে যেতে একজন শিকারী তাকে বলল – “বাচ্চা ভালু, সব সময় হাওয়ার উলটো দিকে থাকবে, তা না হলে শিকার তোমার গন্ধ পেয়ে যাবে আর ভয় পেয়ে পালিয়ে যাবে”।
আর একদিন তারা শিকারে গিয়েছিল আর শিকার থেকে ফিরে এসে তারা বুড়িমার কাছে এসে বলল – “উত্তর দিক থেকে যে সব শিকারীরা এসেছিল তাদের হাতে ভালু প্রায় মারাই পড়েছিল – আমরা কোন রকম করে ওকে বাঁচাতে পেরেছি। এরজন্য ওর গায়ে কিছু দাগ দিয়ে দিন বা ওর গলায় নাড়ি দিয়ে বিনুনি করে একটা চওড়া বকলস পরিয়ে দিন যাতে দূর থেকেও ওকে চেনা যায়”।
তখন বুড়িমা তার গলায় হারপুন দড়ির মত মোটা একটা বিনুনি করা নাড়ির বকলস পরিয়ে দিল।
তারপর থেকে ভালু সীলমাছ ধরতে কখনও ব্যর্থ হয়নি আর সবচেয়ে শক্তিমান মানুষ শিকারীর থেকেও শক্তিশালী হয়ে উঠল আর সবচাইতে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়াতেও শিকারে ফাঁকি দিয়ে ঘরে বসে থাকত না, যদিও ও অন্য ভালুকের থেকে চেহারায় বড় ছিল না। অন্য গ্রামের বাসিন্দারাও ব্যাপারটা জেনে গেল আর তার বকলস দেখলেই তাকে ছেড়ে দিত।
কিন্তু আউঙমাগসালিক থেকেও দূরের দূরের লোকেরা শুনল যে এমন একটা ভালুক আছে যাকে কিছুতেই ধরা যায় না আর তখন একজন বলল – “যদি কখনও ওটাকে দেখতে পাই আমি ওটাকে মেরে দেব”।
কিন্তু অন্যরা বলল – “কখনও ও কাজ কোর না, ভালুকটার পালিকা মা ওর ওপরে সম্পূর্ণ নির্ভরশীল – ওর সাহায্য ছাড়া বাঁচতে পারবে না। যদি তুমি ওকে দেখতেও পাও, ওর কোন ক্ষতি কোর না, ওর গলায় দাগ দেখলেই ওকে ছেড়ে দেবে”।
শিকার থেকে ভালু একদিন বাড়ি ফিরে এলে তার মা তাকে বলল – “যখনই তুমি মানুষের দেখা পাবে, তুমিও তাদের একজন এইভাবে আচরণ করবে। যতক্ষণ না ওরা তোমাকে প্রথম আক্রমণ করছে তুমি ওদের কোন ক্ষতি করবে না”।
ছোট্ট ভালু চুপ করে তার মায়ের কথা শুনল আর তার কথা অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলতে লাগল।
আর এইভাবেই বুড়িমা আর ছোট্ট ভালু একসঙ্গে জীবন কাটাতে লাগল। গরমে ভালু সমুদ্রে শিকার করতে যেত আর শীতে বরফের মধ্যে আর অন্যান্য শিকারীরা তার শিকারের ধরন জেনে গেল আর তার শিকারের ভাগ সবাই পেত।
একবার এক ঝড়ের সময় ভালু তার অভ্যাস মত শিকারে বেরিয়ে গেল আর সন্ধ্যে পর্যন্ত ফিরল না। তারপর বাড়ি ফিরে তার পালিকা মা-কে শুঁকল আর ঘরের দক্ষিণে রাখা বেঞ্চের ওপর লাফ দিয়ে উঠল। তারপর বুড়িমা ঘরের বাইরে গেল আর সেখানে একট লোকের মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখল যেটা ভালু টেনে নিয়ে এসেছে। ঘরে ফিরে না গিয়ে বুড়িমা সবথেকে কাছের বাড়ির জানলায় গিয়ে চীৎকার করে বলল – “তোমরা কি বাড়িতে আছ?”
“কেন?”
“ছোট্ট ভালু একটা মরা লোককে নিয়ে এসেছে যাকে আমি চিনিনা’।
ভোরের আলো ফুটলে তারা বাইরে বেরিয়ে এল আর দেখল যে লোকটা উত্তরের আর তারা বুঝতে পারল যে লোকটা খুব জোরে দৌড়েছে কারণ তার গায়ের ফারের কোটটা ছিল না আর শুধু অন্তর্বাস পরে আছে। পরে তারা শুনল যে লোকটার সঙ্গীরাই ভালুকে আত্মরক্ষা করতে বলেছিল কারণ লোকটা ভালুকে নাগাড়ে উত্যক্ত করছিল।
এই ঘটনার অনেক দিন পরে বুড়িমা ভালুকে বলল – “ আমার সঙ্গে সবসময় না থাকাই ভাল; যদি থাক তাহলে ওরা তোমাকে মেরে ফেলবে। আর সেটা খুব খাঁরাপ হবে। তোমার ভালোর জন্যই আমাকে ছেড়ে তোমার চলে যাওয়া উচিৎ” – এই কথা বলতে বলতেই বুড়িমা কাঁদতে লাগল। আর তাকে ছেড়ে যাওয়ার দুঃখে ভালু মুখটা মেঝেতে ঠেকিয়ে কাঁদতে লাগল।
এরপর থেকে প্রতিদিন ভোর হলেই বুড়িমা বাড়ির বাইরে এসে আকাশের দিকে নজর করে আবহাওয়ার গতিক বোঝার চেষ্টা করত আর একফোঁটা মেঘও যদি দেখতে পেত, কিচ্ছুটি না বলে ঘরে ঢুকে পড়ত।
কিন্তু একদিন সকালে বাইরে বেরিয়ে মেঘের চিহ্নমাত্র না দেখতে পেয়ে বাড়ির ভেতরে গিয়ে বলল – “ছোট্ট ভালু, এইবার তুমি বেরিয়ে পড়। অনেক দূরে তোমার আত্মীয়রা রয়েছে”।
কিন্তু ভালু যখন রওনা দেবার জন্য তৈরি হল এস্কিমো বুড়ি ভীষণ কাঁদতে কাঁদতে তেলের মধ্যে তার হাত চুবিয়ে ঝুল মাখিয়ে ভালুর বিদায় নেবার সময় তার গায়ের পাশে এমন ভাবে মাখিয়ে দিল যাতে সে কিচ্ছু বুঝতে না পারে। ভালু শেষবারের মত তার গা শুঁকে চলে গেল। কিন্তু বুড়িমা সারাদিন অঝোর ধারায় কাঁদতে লাগল আর তার প্রতিবেশীরাও ভালুকে হারিয়ে আকুল হয়ে শোক করতে লাগল।
কিন্তু শিকারীদের কাছে শোনা যায় যে উত্তরে বহু দূরে যখন অনেক ভালুক সচরমান, কখনও কখনও হিমশৈলের মত বড় একটি ভালুককে দেখা যায় যার দু’পাশে কালো দাগ।
নটে গাছটি মুড়োল।

Spread the love