গ্রীক সভ্যতাঃ প্রবন্ধ – সোমনাথ রায়

    0
    26
    Spread the love

    গ্রীক সভ্যতা                    


    সম্ভবত পৃথিবীর প্রাচীন সভ্যতাগুলির মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত গ্রীক সভ্যতার শুরু হয়েছিল খ্রিস্টপূর্ব ১৪০০ অব্দের কাছাকাছি সময়ে আর ধ্বংস হয়েছিল খ্রিস্টপূর্ব ৩৩৭ অব্দে রোমান সাম্রাজ্যের উদয়ের সাথে সাথে। গ্রীসের প্রাচীন নাম ছিল ইউনান আর এর রাজধানী ছিল আথেন্স। প্রাচীন গ্রীসের বৈশিষ্ট্য ছিল ‘পোলিস’ বা একটি নগর-রাষ্ট্র। এটিই গ্রীক রাজনৈতিক শাসনকে অনন্য করেছে।
    পোলিসে বাস করবার আগে, “গ্রীক অন্ধকার যুগ”-এ, গ্রীকরা সারা গ্রীস জুড়ে ছোট ছোট কৃষি-গ্রামে বাস করত। এই সব গ্রামের জনসংখ্যা বাড়বার সাথে সাথে একটা শাসনতন্ত্রের উদ্ভব হতে শুরু করল। অধিবাসীরা একটা নগর চত্বর (যেখানে বাজার বসত) আর একটা যৌথ চত্বর গড়ে তুলল যেখান থেকে এক রকমের শাসন ব্যবস্থা আর এক ধরণের সংবিধানের (এক গুচ্ছ আইন) উদ্ভব হ’ল। এই আইনগুলি নগর (‘পোলিস’) গঠনে সাহায্য করল যেখানে নাগরিকদের ভোটদানের আর সরকার নির্বাচন করার অধিকার ছিল যে সরকার কর সংগ্রহ করত আর একটা সৈন্যদল গঠন করে রক্ষণাবেক্ষণ করত। এটা স্পষ্ট যে গ্রীসে সে সময়েই আধুনিক গণতন্ত্রের প্রচলন ছিল এবং ‘পলিটিক্স’, ‘ডেমোক্রেসি’, ‘সিটিজেন’ প্রভৃতি শব্দগুলির উৎপত্তি সেখানেই। গ্রীকদের দেবতাদের দেবতা ছিলেন জিউস আর তারা এটাও বিশ্বাস করত যে প্রত্যেকটি ‘পোলিস’-এর রক্ষাকর্তা বা রক্ষাকর্ত্রী ছিলেন নির্দিষ্ট দেব বা দেবী যাদেরকে তারা প্রভূত শ্রদ্ধাভক্তি করত। ‘পোলিস’-এ জনসংখ্যাবৃদ্ধির ফলে প্রচুর পরিমাণে লোক বাস্তুত্যাগ করতে শুরু করে। নাগরিকবৃন্দ (প্রধানত পুরুষরা) তাদের নিজের ‘পোলিস’ ত্যাগ করে

    নিকটবর্তী দেশ দখল করতে থাকে বসতি স্থাপন বা কৃষি কাজের জন্য। খ্রিস্টপূর্ব ৭৫০ থেকে ৬০০ অব্দের মধ্যে এশিয়া মাইনর, উত্তর আফ্রিকা আর কৃষ্ণ সাগরের উপকূলরেখা বরাবর ছোট ছোট গ্রীক উপনিবেশ গড়ে উঠেছিল।
    আধুনিক যুগের অলিম্পিক গেমস্‌-এর আদি সূচনা হয়েছিল গ্রীসে। খ্রিস্টপূর্ব ৭৭৬ অব্দে প্রথম অলিম্পিক গেমস্‌ অনুষ্ঠিত হয়েছিল। প্রচলিত একটি মিথ অনুযায়ী অলিম্পিক গেমস্‌-এর সূচনা করেন গ্রীক বীর হারকিউলিস যিনি অলিম্পিয়াতে একটি অলিভ ট্রী (জলপাই গাছ) রোপণ করেন, আবার একটি জনশ্রুতি অনুযায়ী রাজা ঈনমওস-কে মহানায়ক পোলিস পরাজিত করার পর অলিম্পিক

    খেলার আয়োজন করেন। কিন্তু অলিম্পিক গেমস্‌ যেভাবেই বা যে কারণেই শুরু হোক না কেন, গ্রীক সভ্যতার মূল কেন্দ্রীয় বন্ধন শক্তি ছিল এই অলিম্পিক গেমস্‌। অলিম্পিকের সময় প্রতিটি পোলিস বা নগর-রাষ্ট্র তাদের সেরা খেলোয়াড়দের অংশগ্রহণ করতে পাঠাত। তারা সবাই নির্দিষ্ট জায়গায় একত্রিত হত আর প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করত। পোলিসগুলির মধ্যে এর ফলে পারস্পরিক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে প্রভূত যোগাযোগ বাড়ত।
    গ্রীসের মাটি চাষযোগ্য ছিল না। ফলে গ্রীক নাগরিকদেরকে দেশের বাইরে চাষাবাদের জন্য জমি ও বসবাসের জন্য জায়গার বন্দোবস্ত করতে যেতে হ’ত। খাদ্যশস্য ফলানোর থেকে অর্থকরী ফসল উৎপাদনের দিকে গ্রীকদের বেশী নজর ছিল – যেমন তেলের জন্য অলিভ, মদিরার জন্য আঙুর ইত্যাদি। খাদ্যশস্য আমদানি করা হত মধ্য প্রাচ্য, সিসিলি আর উত্তর আফ্রিকা থেকে।
    গ্রীসের জনগণের জীবিকা নির্বাহ হ’ত প্রতিদিন নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র  বিক্রি করে বা বিনিময় করে। অন্যান্য সভ্যতার চাইতে গ্রীক সভ্যতা খুব বেশি রকম বাজার-অর্থনীতি নির্ভর ছিল। অধিকাংশ গ্রীসবাসী ছিল যাযাবর জেলে যারা ভূমধ্যসাগরের কাছাকাছি মাছ ধরে বেড়াত আর অন্যরা মাটির বাসনপত্র বানাত আর বাকীরা বাণিজ্যে ব্যস্ত থাকত। ব্যবসায়ী সম্প্রদায়, জেলের দল আর চাষীরা তাদের জিনিসপত্র স্থানীয় বাজারে বিক্রি করত।

    গ্রীক সংস্কৃতি

    গ্রীক সংস্কৃতি বৈচিত্র্যে ভরপুর। গ্রীসদেশে হস্তশিল্প, চিত্রকলা, ভাস্কর্য, মৃৎশিল্প প্রভৃতি শিল্পকলা উৎকর্ষের শিখরে পৌঁছেছিল। এইসব শিল্পের ওপর ধর্মের প্রভাব ছিল অপরিসীম সেজন্যেই আমরা যত অপরূপ মন্দির আর ভাস্কর্য দেখি, সবই দেবদেবীদের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। জ্ঞান ও যুদ্ধবিগ্রহের দেবী এবং অ্যাথেন্স নগরের রক্ষাকর্ত্রী অ্যাথিনার মন্দির পার্থেনন, অ্যাথিনা ও পসিডনের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাচীন মন্দির অ্যারাকথিয়ন এবং অ্যাপোলো, জিউস ও আরও অনেক দেবদেবীর মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ এখনও দেখতে পাওয়া যায়।
    সক্রেটিস, প্লেটো এবং অ্যারিস্টটলের মতামত ছিল সমাজে অগ্রগণ্য। মহাকবি হোমার রচনা করেছিলেন ইলিয়াড ও ওডিসি, যেগুলি পাশ্চাত্য সংস্কৃতিকে বহুল ভাবে প্রভাবিত করেছিল। গণিতবিদ পুথাগোরাস আবিষ্কার করেছিলেন ‘পুথাগোরাস থিয়োরেম’। সক্রেটিস তাঁর “সক্রেটিক মেথড” বইয়ের মাধ্যমে পাশ্চাত্য পদ্ধতির যুক্তিবিজ্ঞান ও দর্শনের প্রবর্তন করেন।

    তিনি তাঁর মতবাদকে তাঁর মৃত্যুর থেকে বেশী গুরুত্ব দিয়ে শাসকের দেওয়া হেমলক বিষ পান করে মৃত্যুবরণ করেন। প্লেটো লিখলেন “রিপাবলিক” যেটা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের রাজনৈতিক এবং নৈতিক নির্দেশনার  সর্বকালের সর্বসেরা আকর গ্রন্থ। অ্যারিস্টটল-কে মোটের ওপর একজন বিজ্ঞানী বলা যায়। তিনি তাঁর গুরু প্লেটোর প্রবর্তিত ‘থিয়োরি অভ ফর্মস্‌’ নাকচ করে দিয়েছিলেন। তিনিই মানব জ্ঞানকে অঙ্ক, জীববিদ্যা, পদার্থবিদ্যা এবং নীতিশাস্ত্র প্রভৃতি শ্রেণিতে বিভক্ত করেছিলেন। আলেকজান্দার দ্য গ্রেট-র তিনি গৃহশিক্ষক ছিলেন।
    গ্রীক সভ্যতার ওপর ভিত্তি করেই আমাদের আজকের আধুনিক সমাজের পত্তন।
    [ছবি সৌজন্যেঃ গুগল ইমেজেস]

    Spread the love