প্রবন্ধে টুসি চক্রবর্তী

    0
    12
    Spread the love

    পুজো-নামচা

    প্রকৃতি নিজের নিয়ম মেনে কাশ ফুল দিয়ে সাজিয়ে ফেলেছে চারিদিক। সেই দেখে খুব খুশি হয়ে ছেলেকে বললাম একটা ছবি তুলে দিতে।এই সময়ের ছেলে,পড়ার চাপে অনুভূতিগুলো তেমন বাড়তে পারেনি। আমার খুশি টা ও বোধহয় ফেসবুকীয় লাইক আর কমেন্ট দিয়ে মেপে একটু বিরক্তই হলো। ওকেই বা দোষ দি কি করে,যা সব শুরু হয়েছে, পারা যাচ্ছে না।
    বর্ষার সবুজের মাঝে দু-চারটে কাশ সবে মাথা তুলেছে কি তোলেনি, ব্যাস শুরু আগমনী ফটো শুট,এত মেয়ে মা দুর্গা রূপে বেরিয়ে আসছে দেখে মা দুর্গা শশুরবাড়ীতে বসে ভাবছেন, মর্তে আসবেন কি আসবেন না।
    এবার পালা পুজোর বাজারের। এর বাড়ি তার বাড়ি গিয়ে জামা দেখা, নতুন জুতো বালিশের পাশে নিয়ে ঘুমোনো, টেপ ইজেরগুলোও গুনে মোট কটা হলো বলা, এসব এখন পুরোটাই অতীত। এখন তো আগে চেক ইন দিতে হবে, বড়ো বড়ো মল-এর। তারপর শুরু হবে বাজার।চেক ইন দেবার পর আর চাপ নেই। এরপর ফুটপাতে দাঁড়িয়ে পোনেরস টা তিনশ তে নামানোর আর্ট এ লেগে গেলেও দোষ নেই। হ্যাঁ, এটা একটা আর্ট ই, যত ভালো আর্টিস্ট ততো কম ঠকা। শুধু চেক ইন এ ক্ষান্ত হলে হবে না, Whatsapp এর গ্রুপ গুলো কি বানের জলে ভেসে এসেছে? ওখানে দেখাতে হবে তো কোন ব্র্যান্ড আর কত দাম এর শপিং করলে তুমি। নইলে পুরনো , নতুন বন্ধুরা মাপবে কি করে তোমার সাকসেস এর কিলোমিটার, সেন্টিমিটার টা। এই পর্যন্ত হলেও হতো। কিন্তু না, এরপর শুরু হবে আমার বউ, আর আমার বরের কম্পিটিশন।প্রেমের মাপ টা এখানে আনুপাতিক। মেয়েদের ক্ষেত্রে সমানুপাতিক, সোজা কথা ভাই..যত দামী শাড়ি, বর তত বেশি ভালোবাসে। ছেলেরা বরাবর উল্টো, তাই ব্যস্তানুপাতিক। “আমার বউ ভীষণ লক্ষ্মী, মা দুর্গার পাশে এ বছর তাই লক্ষ্মী গড়া হয়নি, ওকেই বসানো হবে। গর্মেন্ট হাত খুলছে না , বাজার ও পড়ছে রোজ, তাই এ বছর তেমন বাজার করেই নি। বরেরটা ভীষন বোঝে। মাত্র আট টা। রোজকার দুটি শাড়ি , ব্যাস”।
    এর মধ্যে বিশ্বকর্মা মাইকি এসে চলেও গেছেন।নদীর ঘাটে তর্পণ এর ফটো আপলোড হয়ে গেছে।মহালয়া তো হলিডে, তাই আগের রাত্রে একটু বাইরে খাওয়া, অল্প নেশা করে বেশ রাত হয়ে ছিল ঘুমোতে, ভোর বেলার অ্যালার্ম টা শুনেই মনে পড়লো বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র কে। কি শুনলো কি বুঝলো মা গঙ্গাই জানেন, কিন্তু ফরওয়ার্ড করা মেসেজে অন্যের গ্যালারি ভরাতেই হবে। নইলে এই সমাজ তোমাকে বাঙালী বলে স্বীকার ই করবে না।

    এরপর পার্লার পর্ব। সারা বছরের রোদে পোড়া, গোড়ালি ফাটা, প্রায় টাক হয়ে যাওয়া চুল, বেশি পানীয়-র সাইড এফেক্ট এ ফোলা চোখ..সব রিপেয়ারিং এর দায়িত্ব তখন পার্লারের। কে বলে মা দুর্গা সপ্তমী তে আসেন, পার্লার কর্মীদের দেখুন গিয়ে , সব এক এক মা দুর্গা, দু হাতে দশ হাতের কাজ করছে।”এবার প্যান্ডেল তুমি ই কাঁপাবে”-এই বিশ্বাস টুকু নিতেই তো পার্লারে গিয়ে এত পয়সা খরচ করা।

    সপ্তমী থেকে দশমী মা দুর্গার থেকেও হাইলাইটেড স্ট্যাটাস আপডেট, ফটো আপলোড, রেস্টুরেন্ট চেক ইন। এত জন ট্যাগ করে রাখে যে ফোন অন করতে আতঙ্ক হয়, এই বুঝি নোটিফিকেশন এর সুনামি তে ভেসে যাবো।
    মা এলেন, মা চলেও যাবেন। সিঁদুর খেলার সিনেমাটিক ভার্সন এখন ইন ফ্যাশন। নাকে নথ, টায়রা, টিকলি আর মেপে লাগানো সিঁদুর দেখে মা মাচার ওপর থেকে ভাবেন হয়ত, “নাহ পরের বছর বাপের বাড়ী আসার আগে ভাবতে হবে”।
    এরপর বিসর্জন। পুরুষের পাঞ্জাবি আর ক-পাত্তর খেয়ে উদ্দাম নৃত্যে ফেমিনিস্টরা এখনো তেমন দাঁত ফোটাতে পারে নি। আগামী দিনে এটাও হবে।মা আবার ভাববেন, “এদের পাল্লায় পড়ে আমার ছেলে মেয়ে গুলো না বখে যায়।”
    তবুও মা আসেন, প্রতিবার আসেন। অবোধ সন্তানদের সর্ব দোষ ক্ষমা করে , আশীর্বাদ দিতে তিনি আসেন।


    Spread the love