প্রবন্ধ – শোভন ঘোষাল

    0
    9
    পি এইচ. ডি গবেষক,ইতিহাস বিভাগ, বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক, বামুনতোড় উচ্চবিদ্যালয়, বাঁকুড়া। প্রাক্তন অতিথি অধ্যাপক বাঁকুড়া বিশ্ববিদ্যালয় ও গোবিন্দপ্রসাদ মহাবিদ্যালয়(অমরকানন, বাঁকুড়া)
    Spread the love

    বিদ্যাসাগর২০০/বিশেষ সংখ্যা

    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও বাংলার জনশিক্ষা

    ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, মানবতাব্রতী, প্রখর ব্যাক্তিত্ত্ববোধে উজ্জ্বল এই মুক্তপুরুষ ছিলেন এক নতুন সমাজ গঠনের কারিগর। মধ্যযুগীয় কূপমন্ডুকতা ও স্থবিরতা থেকে মুক্ত করে বাঙ্গালীকে আধুনিক জীবনে দ্বারপ্রান্তে পৌছে দিতে রামমোহনের পরেই একই কৃতিত্বের দাবীদার বিদ্যাসাগর।
    ১.

    তিনি ছিলেন জ্ঞানদীপ্ত সমাজ স্থাপনের স্বপ্ন ও কর্ম বিলাসী ‘পুরুষসিংহ’। প্রথাগত সমাজসংস্কারের দিয়ে নয়, যিনি সমাজের মূল কাঠামোগত পরিবর্তনের মাধ্যমে সামাজিক কুপ্রথাগুলির সমূলে নাশ করার মহান কর্মে ব্রতী হয়েছিলেন। তিনি ছিলেন এক নিরপেক্ষ, প্রগতিশীল, সঙ্কীর্নতামুক্ত সমাজের স্বপ্নের দিশারী। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্যই শিশুশিক্ষা তথা জনগনের মধ্যে ব্যাপক শিক্ষার বিষয়টি হয়ে উঠেছিল বিদ্যাসাগরের কাছে  গুরুত্ত্বপূর্ণ।

    জনশিক্ষার সমর্থক বিদ্যাসাগর বুঝেছিলেন ‘এনলাইটেনমেন্ট’ এর প্রাথমিক শর্তই হল স্বাক্ষরতার প্রসার। সংস্কৃত কলেজের পরিষদ কে একটি চিঠিতে লিখেছিলেন, “আজ জনসাধারণের মধ্যে শিক্ষা বিস্তারের প্রয়োজন। আমাদের উচিত কতকগুলি মাতৃভাষাভিত্তিক বিদ্যালয় স্থাপন করা এবং মাতৃভাষায় শিক্ষামূলক বিষয়ে প্রয়োজনীয় পাঠ্যপুস্তক রচনা করা। আমাদের উচিত এমন একদল লোককে শিক্ষিত করে তোলা যারা শিক্ষকতার দায়িত্ব গ্রহন করবেন। এইভাবে যদি আমরা কাজ করতে পারি, তবে আমাদের  উদ্দেশ্য সিদ্ধ হবে।”

    ২.

    সংস্কৃত কলেজে ১৮৪৬ খ্রিষ্টাব্দ পঠন প্রণালী সংক্রান্ত পরিকল্পনা রচনার সময় থেকেই বিদ্যাসাগরের শিক্ষাচিন্তার প্রথম পরিচয় পাওয়া যায়। সেখানে তিনি উল্লেখ করেছিলেন, “এরুপ শিক্ষা এমন সব ব্যাক্তি সৃষ্টি করিতে সমর্থ হবে যারা আমাদের মাতৃভাষাকে পাশ্চাত্য জগতের বিজ্ঞান ও সভ্যতা দ্বারা সমৃদ্ধ করার পক্ষে যথেষ্ট উপযুক্ত হবে।”

    ৩.
    ভারতীয় সমাজে চিরাচরিতভাবে টোল, চতুষ্পাঠী, মক্তব, মাদ্রাসার মাধ্যমে শিশুশিক্ষা প্রদান করা হত। বাংলাদেশের শিক্ষাক্ষেত্রেও এই একই ব্যবস্থা লক্ষ্য করা যায়। উনবিংশ শতকে বাংলায় ব্রিটিশ রাজপুরুষ ও উচ্চবর্গীয় বালকদের শিক্ষার জন্য মূলত ব্যক্তিগত উদ্যোগে বেশ কিছু ইংরেজী মাধ্যম বিদ্যালয় স্থাপন করা হয়েছিল। কিন্তু সেইধরনের শিক্ষাব্যবস্থা ছিল অবৈজ্ঞানিক ও অশিশুসুলভ। সেই বিদ্যালয়গুলির শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে সমকালীন লেখক শিবনাথ শাস্ত্রী লিখেছিলেন,
    “ সেসময়ে যে ইংরাজী শিক্ষা দেওয়া হইত, তাহার বিষয়ে কিছু বলা আবশ্যক। ষে সময়ে বাক্যরচনা প্রণালী বা ব্যকরণ প্রভৃতি শিক্ষা দিবার দিকে দৃষ্টি ছিল না। কেবল ইংরেজী শব্দ ও তাহার অর্থ শিখাইবার দিকে প্রধানত মনযোগ দেওয়া হইত। যে যত অধিক সংখ্যক ইংরেজী শব্দ ও তাহার অর্থ কন্ঠস্থ করিত, ইংরেজী ভাষায় সুশিক্ষিত বলিয়া তাহার তত খ্যাতি প্রতিপত্তি হইত।”
    ৪.

    বাংলায় জনশিক্ষা প্রসারের যে উদ্যোগ বিদ্যাসাগর গ্রহন করেছিলেন তা সমকালীন সমাজ ব্যবস্থায় মোটেও সহজকাজ ছিল না। ব্যাপক শিক্ষাপ্রসারের জন্য তিনটি প্রাথমিক উপাদানের প্রয়োজন ছিল, প্রথমতঃ আধুনিক বিদ্যালয় ব্যবস্থা, দ্বিতীয়তঃ জনশিক্ষার মাধ্যম হিসেবে ভাষাকে উপযোগী করে তোলা এবং তৃতীয়তঃ উপযুক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত শিক্ষক। উনবিংশ শতকের বাংলায় এগুলির কোনটিই পর্যাপ্ত ছিল না। স্বাভাবিকভাবেই শিশুশিক্ষা তথা সাক্ষরতার প্রসারের পরিকল্পনা ছিল  জটিল ও চ্যালেঞ্জিং।
    বাংলায় জনশিক্ষাবিস্তারের জন্য প্রাথমিকভাবে বিদ্যালয়ের প্রয়োজন ছিল। এব্যাপারে ব্যাক্তিগত উদ্যেগ কিছু চোখে পড়লেও সরকারী উদাসীনতা ছিল প্রকট। ব্যাক্তিগত উদ্যেগ গুলিও মূলত শহরকেন্দ্রিক ও ইংরেজী মাধ্যমের মধ্যোই সীমাবদ্ধ। গ্রামাঞ্চলে বালক-বালিকাদের শিক্ষাপ্রদানের জন্য বিদ্যাসাগরের এই প্রচেষ্টা ছিল একক ও কষ্টসাধ্য। ১৮৫৫ সালে বিদ্যাসাগর নদিয়া জেলায় পাঁচটি, বর্ধমান জেলায় পাঁচটি, হুগলী জেলায় পাঁচটি এবং মেদনীপুর জেলায় পাঁচটি মডেল স্কুল স্থাপন করেছিলেন। ১৮৫৭-৫৮ সালে বিদ্যাসাগর হুগলী জেলায় কুড়িটি, বর্ধমান জেলায় এগারটি, মেদনীপুর জেলায় তিনটি এবং নদিয়া জেলায় একটি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেছিলেন। এই বিদ্যলয়গুলিতে মোট ১৩৭০ জন ছাত্রী পড়তেন।

    ৫.

    বিদ্যাসাগর স্থাপিত ৪০ টি বালিকা বিদ্যালয়ের মধ্যে ৩৫টি বিদ্যালয় কোন সরকারী গ্রান্টস ইন- এড পায়নি। তবুও বিদ্যাসাগর নিজ অর্থব্যায়ে ও কিছু শিক্ষানুরাগীদের দানে এগুলি পরিচালনা করতেন।

    বিদ্যাসাগরের অনুপ্রেরনায় ছোটলাট হ্যালিডের ‘মিনিট’এ যে পরিকল্পনা প্রকাশিত হয়েছিল তার মুখ্য বক্তব্য ছিল বাংলাভাষায় শিক্ষার বন্দোবস্ত করা। মাতৃভাষা ছাড়া জনসাধারনের মধ্যে শিক্ষার প্রসার সম্ভব ছিল না। এমনকি ভূগোল, ইতিহাস, জীবনচরিত, পাটীগনিত, জ্যমিতি, পদার্থবিদ্যা, নীতিবিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, প্রতিটি বিষয়ের পঠন পাঠন বাংলাভাষায় করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছিল। বিদ্যাসাগর জানতেন একমাত্র মাতৃভাষাই হতে পারে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে শিক্ষার আলো পৌছে দেওয়ার বাহন। উনবিংশ শতকে বাংলায় নারীশিক্ষার উন্নতির হারও ছিল অত্যন্ত মন্থর। বিদ্যালয়ের জন্য ছাত্রী পাওয়া ছিল খুবই কঠিন। সমকালীন রক্ষনশীল সমাজ মেয়েদের শিক্ষাকে ভালো চোখে দেখেনি। এক্ষেত্রেও বিদ্যাসাগরকে বিপ্লবীর ভূমিকা পালন করতে হয়েছিল। হ্যালিডের সহায়তায় ১৮৫৭ সালের নভেম্বর থেকে ১৮৫৮ সালের মে মাসের মধ্যে বিদ্যাসাগর হুগলী, বর্ধমান, মেদনীপুর ও নদীয়া জেলায় ৩৫ টি বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
    ৬.

    শুধুমাত্র বিদ্যালয় স্থাপনের মাধ্যমেই জনশিক্ষার প্রসার সম্ভব নয়, তার জন্য শিশু উপযোগী পাঠ্যপুস্তক ও ভালো শিক্ষক প্রয়োজনের দিকেও বিদ্যাসাগরের দৃষ্টি ছিল। প্রতিটি বিদ্যালয়ে অন্তত দুজন শিক্ষকের প্রয়োজনীয়তার কথা তিনি তুলে ধরেন। ছোটলাট হ্যালিডের মিনিট এ (১৮৫৪) এই অভিমত পাওয়া যায় যে, “বাংলাদেশে অসংখ্য দেশী পাঠশালা আছে। এদেশের ও বিদেশের দুইশ্রেনীর লোকের কাছেই অনুসন্ধান করে আমি জেনেছি, পাঠশালাগুলির অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়, কারন সেখানে যারা সেখানে শিক্ষা দেন তাঁরা অধিকাংশই অত্যন্ত অযোগ্য ব্যাক্তি।”

    ৭.

    এজন্য শিক্ষকদের প্রশিক্ষন দিতে প্রতিষ্ঠিত হয় নর্মাল স্কুল বা ট্রেনিং স্কুল। ১৮৫০ সালেই ১৭ই জুলাই বিদ্যাসাগরের প্রস্তাব অনুসারে ও তাঁর তত্ত্বাবধানে একটি নর্মাল স্কুল স্থাপন করা হয়।

    ৮.

    আধুনিক শিক্ষা সংস্কৃতির প্রধান কেন্দ্র ছিল মূলত শহর-নগর গুলি। গ্রামগুলি তখনো উপেক্ষিত হয়ে অশিক্ষার অন্ধকারেই নিমজ্জিত ছিল। উনবিংশ শতকে নবজাগরনের মুখ্য কেন্দ্রস্থলও হয়ে উঠেছিল কলকাতার মত সমৃদ্ধ নগরগুলি। ব্যক্তিগত সংস্কারকদের কার্যাবলিও প্রাথমিকভাবে ছিল শহরকেন্দ্রিক। স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষা ও সংস্কারের ঢেউ বৃহত্তর গ্রামীন জীবনকে প্রভাবিত করেনি। শিক্ষা সংস্কৃতির এই আলোকবর্তিকা গ্রামাঞ্চলে বিস্তারের অন্যতম কারিগর ছিলেন বিদ্যাসাগর। বৃহত্তর গ্রামসমাজ অজ্ঞানতার অন্ধকারে নিমজ্জিত থাকলে সমাজের সার্বিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করবে। এই অনুভূতিই বিদ্যাসাগরকে গ্রামকেন্দ্রিক জনশিক্ষা প্রসারে উদ্বুদ্ধ করেছিল। কেবল আধুনিক শিক্ষার আলোক নয়, মাতৃভাষা বাংলাকে সেই শিক্ষার যোগ্য বাহন রূপে প্রতিষ্ঠিত করার বার্তা তিনি গ্রামবাসীদের শুনিয়েছিলেন।

    বিদ্যালয় স্থাপন ও উপযুক্ত শিক্ষকের সংস্থানের পাশাপাশি বিদ্যাসাগর গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন শিশুদের উপযোগী পাঠ্যপুস্তক রচনার উপর। ফোর্ট উইলিয়ম কলেজে ইংরেজ ছাত্রদের পড়াতে গিয়ে বিদ্যাসাগর সরল বাংলায় রচিত পাঠ্যপুস্তকের অভাব বোধ করেছিলেন।  বিদ্যাসাগরের অধিকাংশ পুস্তকেই রচিত হয়েছিল পাঠ্যপুস্তক হিসেবে। বাংলার শিশু কিশোর শিক্ষার্থীদের জন্য বাংলাভাষায় প্রাঞ্জল, সহজবোধ্য ও জ্ঞ্যনগর্ভ পাঠ্যগ্রন্থ রচনা করেছিলেন।  এই পাঠ্যপুস্তকগুলিই ছিল বাংলাভাষার প্রথম যথার্থ পাঠ্যপুস্তক। ‘বেতালপঞ্চবিংশতি’ রচিত হয়েছিল ফোর্ট উইলিয়ম কলেজে পাঠ্যপুস্তক হিসেবে পড়ানোর জন্য। ১৮৪৭ সালে এটি প্রকাশ পেয়েছিল। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে চালু হবার পর এই পুস্তকটিকে বাংলার বিভিন্ন স্কুলে পাঠ্যপুস্তক হিসেবে মনোনীত করা হয়েছিল। জেমস লং এই বইটিকে ‘Very Popular’ বলে উল্লেখ করেছিলেন। দীনবন্ধু মিত্রের নীলদর্পন নাটকে সৈরিন্ধ্রীকে বলতে শুনি, “ছোট বউ বসিস, আমি আসছি, বিদ্যাসাগরের বেতাল শুনবো।” অর্থাৎ বিদ্যাসাগরের বেতালের জনপ্রিয়তা সাধারন ঘরের মধ্যেও পৌঁছে গিয়েছিল।

    ৯.

    ১৮৪৮ সালে প্রকাশ পায় বিদ্যাসাগরের ‘বাঙ্গালার ইতিহাস’ (দ্বিতীয় ভাগ)। ১৮৩৫ সাল থেকে বিদ্যালয়ের নিম্নশ্রেনীতে বাংলার ইতিহাস পাঠ্য আবশ্যিক করা হয়েছিল। ফলে সেইসময় স্কুলপাঠ্য ইতিহাস রচনার জন্য লেখকদের মধ্যে উৎসাহ লক্ষ্য করা যায়। বিদ্যাসাগর রচিত ‘বাঙ্গালার ইতিহাস’ ছিল জন ক্লার্ক  মার্শম্যানের লেখা ‘Outlines of the History of Bengal for the use of youth in India” গ্রন্থের শেষ নয়টি অধ্যায়ের অবলম্বনে রচিত পাঠ্যপুস্তক। তবে পুরোপুরি অনুবাদ নয়, অন্যান্য লেখকদের বই থেকেও তিনি সাহায্য  নিয়েছিলেন । ১৮৪৯ সালে বিদ্যাসাগর রচনা করেন “জীবনচরিত”। একটি ছাত্রপাঠ্য উপযোগী গ্রন্থ হিসেবে রবার্ট ও চেম্বার্সের ‘Exemplary Biography’ অবলম্বনে এটি প্রকাশিত হয়। বিদ্যাসাগরের অন্যান্য পাঠ্যপুস্তকের মতই ‘জীবনচরিত’ পাঠ্যপুস্তক হিসেবে ব্যাপক জনপ্রিয় ছিল।

    ১৮৫১ সালে সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ পদে দায়িত্বভার গ্রহন করার অল্পদিনের মধ্যেই অল্পবয়স্ক বালক-বালিকাদের জন্য ‘বোধোদয়’ রচনা করেন। বিদ্যাসাগরের জীবিতকালেই এই বইটির একশর বেশী সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছিল। ১৮৮৮ সালে বোধোদয়ের ১০৩ তম ও ১৮৮৯ এ ১০৪ তম সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছিল। দুটি সংস্করণেই মুদ্রণ সংখ্যা ছিল তিরিশ হাজার। ‘বোধোদয়’ প্রকাশের কয়েকমাস পরেই প্রকাশিত হয়েছিল সংস্কৃত ব্যাকরণের ‘উপক্রমণিকা’।  ১৮৫৩ সালে ‘ঋজুপাঠ’ এর তিনটি ভাগ ও ‘ব্যাকরণ কৌমুদী’র দুটি ভাগ প্রকাশিত হয়েছিল। এর ফলে পুরাতন ‘মুগ্ধবোধ’ ব্যাকরণের পরিবর্তে এই ব্যাকরণ গুলি পাঠ্য হয়ে উঠেছিল।
    বাংলায় শিশুশিক্ষায় বিদ্যাসাগরের সবথেকে বড় অবদান হল ‘বর্ণপরিচয়’ প্রথম ও দ্বিতীয়ভাগ। বিদ্যাসাগর রচিত বাংলা ব্যাকরণ ‘বর্ণপরিচয়’ প্রকাশিত হয় ১৮৫৫ খ্রিষ্টাব্দে।  ওই বছরের এপ্রিল মাসে প্রথমভাগ ও জুন মাসে দ্বিতীয়ভাগ প্রকাশিত হয়। ‘বর্ণপরিচয়’ বিদ্যাসাগরের সর্বাধিক জনপ্রিয় পাঠ্যপুস্তক। ১৮৫৫ থেকে ১৮৯০ সালের মধ্যে ‘বর্ণপরিচয়’র প্রথমভাগের ১৫২ টি ও দ্বিতীয়ভাগের ১৪০ টি সংস্করণ হয়েছিল। এই দুই বই সমকালে ত বটেই, একশত বছর পরেও বাংলার প্রাথমিক শিক্ষাক্ষেত্রে প্রথমস্থান অধিকার করে আছে। সমকালীন ‘এডুকেশন গেজেটে’ জনৈক বিদ্যাসাগর ভক্ত লিখেছিলেন, “বিদ্যাসাগর মহাশয় যদি অন্য কোন পুস্তক রচনা না করিতেন, কেবল দুইভাগ বর্ণপরিচয়ই তাঁহাকে বঙ্গসমাজের পূজা ও ভক্তির আধার করিত।”

    ১০.

    ১৮৫৬ সালে প্রকাশিত হয় বিদ্যাসাগরের পরবর্তী শিশুশিক্ষা বিষয়ক পুস্তক ‘কথামালা’। রেভারেণ্ড টমস জেমসের ইংরেজী অনুবাদ অবলম্বন করে বিদ্যাসাগর ঈশপের গল্পগুলিকে বাংলায় রূপান্তরিত করেন ও তার ‘কথামালা’ নামকরন করেন। ৬৮ টি কাহিনী এই সঙ্কলনে স্থান পেয়েছিল, যদিও বিদ্যাসাগরের জীবিতকালে শেষতম সংস্করণে ৮৪ টি কাহিনী স্থান পেয়েছিল। আকর্ষনীয় করে তোলার জন্য এই পুস্তকের প্রথম সংস্করণে ছয়টি ছবি ব্যবহার করা হয়েছিল। ‘কথামালা’ প্রকাশের চারমাস পর কয়েকজন মহান মনীষীদের জীবনবৃন্তান্ত সঙ্কলিত করে তা ‘চরিতাবলী’ নামে প্রকাশিত হয়।  ১৮৬৩ সালে বিদ্যাসাগর রচনা করেন ‘আখ্যানমঞ্জরী’। ১৮৬৪ সালে অর্থাৎ পরের বছরেই বিদ্যাসাগর ‘শব্দমঞ্জরী’ নামে একটি ছোট বাংলা অভিধান প্রকাশ করেছিলেন। বিদ্যাসাগরের সঙ্কলিত শেষ পাঠ্যপুস্তক ‘পদ্য সংগ্রহ’ । ১৮৮৮ সালে প্রকাশিত প্রথমভাগ কৃত্তিবাসের রামায়ণ থেকে, এবং ১৮৯০ সালে প্রকাশিত দ্বিতীয়ভাগ ভারতচন্দ্রের ‘অন্নদামঙ্গল’ থেকে সঙ্কলিত।

    ১১.

    বিদ্যাসাগরেই আধুনিক ভারতে শিক্ষাক্ষেত্রে স্কুল পূর্ব নার্সারি শিক্ষা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ শিক্ষাপ্রবর্তন ও সংস্কারের প্রবর্তক।

    ১২.

    বিদ্যাসাগরের পূর্ববর্তী সময় থেকেই মাতৃভাষায় শিক্ষা দানের কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তাকে হাতে কলমে সার্থক করে তোলার কৃতিত্ব বিদ্যাসাগরেরই প্রাপ্য। তাঁর প্রতিষ্ঠিত মডেল স্কুল, শিক্ষকদের ট্রেনিং দেবার জন্য নর্ম্যাল স্কুল, খেটে খাওয়া মানুষের জন্য নৈশবিদ্যালয় স্থাপন, অবৈতনিক স্কুল প্রতিষ্ঠা, কার্মাটাড়ে সাঁওতালদের জন্য বিদ্যালয়, বালিকা বিদ্যালয় প্রভৃতির মাধ্যমে বাংলার সকল শ্রেণীর মানুষের মধ্যে শিক্ষাকে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন। গণশিক্ষার কথাও ভারতে প্রথম বিদ্যাসাগরেই উত্থাপন করেছিলেন। আর জনগনের শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে মাতৃভাষাকেই স্থান দিয়েছে সর্বাগ্রে। বিদ্যাসাগর শিক্ষাকে শুধু পরশপাথরের মত ছুঁয়ে দিতে চাননি, আত্মিক মানসিক দৈহিক সব ব্যাপারেই যুগের প্রয়োজনে তিনি শিক্ষাকে উপযোগী করে তুলতে চেয়েছিলেন।

    দুর্দশাগ্রস্ত, বিকলাঙ্গ সমাজকে তিনি শিক্ষা ও সংস্কারমুলক কর্মের মাধ্যমে পুনর্গঠিত করতে চেয়েছিলেন বিদ্যাসাগর। বাঙালী শিক্ষার্থীদের জন্য তিনি গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন এক জ্ঞানদীপ্ত শিক্ষা। বিদ্যাসাগর সমাজে কলুষতার গ্লানি দূর করে সত্যম, শিবম ও সুন্দরম প্রতিষ্ঠা করতে ব্রতী হয়েছিলেন। এই উদেশ্য সাধনের লক্ষ্যেই আজীবন জনশিক্ষা বিস্তারের কাজ করে গেছেন। বিনয় ঘোষ লিখেছেন, শিক্ষায়তনকে তিনি মানবধর্মের ‘নার্সারী’ করে তুলতে চেয়েছিলেন, সেকালের চতুষ্পাঠী, আশ্রম বা সাম্প্রতিক কালের ডিগ্রী উৎপাদনের কারখানা করতে চান নি। বিদ্যাসাগরের শিক্ষা সংস্কারের ফলেই বাংলায় জনশিক্ষার ও আধুনিক শিক্ষাপদ্ধতির ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল।

    সূত্র নির্দেশ

    ১. গোলাম মুরশিদ (সম্পা.), বিদ্যাসাগর সার্ধশত-বর্ষ স্মারক গ্রন্থ, প্রথম প্রকাশঃ ১৯৭০, পূনমুদ্রণ ২০১১, শোভা প্রকাশ, ঢাকা, পৃ. ৩৯
    ২. বিনয় ঘোষ, নবভারত স্রষ্টা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, ১৯৫৭, প্রকাশন বিভাগ, ভারত সরকার,পৃ.৪৭
    ৩. অমল ঘোষ, মূর্তি ভাঙ্গার রাজনীতি ও রামমোহন-বিদ্যাসাগর, ১৯৬৩, প্রগেসিভ স্টাডি গ্রুপ, কলকাতা, পৃ.১৭৮
    ৪. ওই, পৃ.১৭৫
    ৫. ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, সাহিত্য সাধক চরিতমালা-১৮, কলিকাতা, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ, ষষ্ঠ সংস্করণ, ১৩৭৫, পৃ-৬-৬৮
    ৬. ওই, পৃ.৬২-৬৩
    ৭. বিনয় ঘোষ, বিদ্যাসাগর ও বাঙালী সমাজ (তৃতীয় খণ্ড), প্রথম প্রকাশঃ ১৩৩৮ বঙ্গাব্দ, বেঙ্গল পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, পৃ. ৯১
    ৮. বিনয় ঘোষ, যুগপুরুষ বিদ্যাসাগর, ১৯৬০, পাঠভবন, কলকাতা, পৃ.৬১
    ৯. ওই, পৃ. ১০৪
    ১০. ওই,পৃ. ১৪৭
    ১১. ওই,পৃ.১১৩
    ১২. চন্ডীচরন বন্দ্যোপাধ্যায়,পূর্বোক্ত, পৃ. ৩৬

    Spread the love