প্রবন্ধ – সুধাংশু চক্রবর্তী

    0
    8
    পূর্ববঙ্গীয় ব্রাহ্মণ পরিবারে ৩০শে জৈষ্ঠ, ১৩৬১-তে আগমন । পিতা স্বর্গীয় ভূপেন্দ্রনাথ, মাতা স্বর্গীয়া বেলাদেবী, থিতু হালিশহর, উত্তর চব্বিশ পরগনা । কর্মজীবন কলকারখানায় কেটে গেলেও সাহিত্যপ্রেমী, ভ্রমণবিলাসী, সঙ্গীত অনুরাগী, কলাপ্রেমী আর সবসময়ে একটা নতুন কিছু করার নেশায় বিভোর এক একনিষ্ঠ কর্মী এই সরল মনের মানুষই হলো সুধাংশু চক্রবর্তী । সাহিত্যে হাতেখড়ি সেই কলেজ জীবন থেকে হলেও তেমন করে লেখালেখি শুরু করেন নি । তবে সাহিত্যের প্রতি প্রগাঢ় অনুরাগের কারণেই কর্মজীবন থেকে স্বেচ্ছায় নির্বাসন নিয়ে ২০০৮ সাল থেকে লেখালেখি নিয়েই মেতে রয়েছেন । মূলত অণুগল্পকার হলেও প্রচুর গল্প এবং গুটিকতক উপন্যাস ও প্রবন্ধ লিখেছেন । শিশু সাহিত্যের প্রতি অনুরাগের কারণে শিশুদের জন্য বেশ কিছু ছড়া, কবিতা, গল্প, রূপকথার গল্প, গোয়েন্দা গল্প, ভূতের গল্প লিখেছেন । তাঁর লেখা কবিতা এবং গল্প ভারত ও বাংলাদেশের বিভিন্ন লিট্‌ল ম্যাগাজিন এবং ই-ম্যাগাজিনে নিয়মিত প্রকাশিত হয়ে থাকে । প্রকাশিত বই – কবিতার বই – ‘দুটি মন’ ; অণুউপন্যাস ‘শিরিন’ এবং অণুগল্পের বই ‘সাঁঝতারা’ । যেসব পুরস্কার এবং সম্মানে ভূষিত হয়েছেন – বুলবুল প্রকাশনী থেকে ‘নজরুল স্মৃতি পুরস্কার’ এবং ‘সম্প্রীতি পুরষ্কার’ ; মহাবঙ্গ সাহিত্য পরিষদ (কলকাতা) থেকে “সর্বভারতীয় শারদসাহিত্য সম্মাননা ২০১৫ (স্বর্ণপদক) ; মহাবঙ্গ সাহিত্য পরিষদ (কলকাতা) থেকে ‘আন্তর্জাতিক সাহিত্য উৎসব সাহিত্য সম্মানানা ২০১৬ (স্বর্ণপদক) ; জীবনবাজার পত্রিকা (কলকাতা) অনুষ্ঠিত বিশ্ববঙ্গ সাহিত্য উৎসবে প্রদত্ব ‘সাহিত্য সাগর’ স্মারক পুরষ্কার(২০১৬) ; ‘ফাল্গুণের কৃষ্ণচুড়া – ঢাকা থেকে ‘সম্মাননা সনদ মানপত্র’ ; অঙ্কুর সাহিত্য পরিষদ থেকে ‘সাহিত্য সনদ মানপত্র’ ; রোদ্দুর ওয়েব ম্যাগ থেকে ‘সম্মাননা সনদ মানপত্র ’ ; চেতনা সাহিত্য পত্রিকা থেকে ‘অখিল ভারত সাহিত্য সম্মাননা সনদ মানপত্র এবং স্মারক’ । ‘আমার দেশের মাটি’ পত্রিকা থেকে পেয়েছেন ‘পদক এবং স্মারক’ - ২০১৭ ; ‘যুথিকা সাহিত্য পত্রিকা থেকে ‘মাৎসুয়ো বাশো স্মৃতি পুরস্কার – ২০১৯ ; ‘বলাকা সম্মাননা স্মারক – ২০১৯ ; মন্থন সাহিত্য পত্রিকা থেকে ‘মন্থন সাহিত্য সম্মাননা স্মারক’ – ২০১৯ এবং ‘অর্কদীপের সোপান স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন থেকে ‘বিশেষ সাহত্য সম্মাননা স্মারক - ২০১৯ ।
    Spread the love

    বিদ্যাসাগর২০০/বিশেষ সংখ্যা

    বাংলা গদ্যের ক্রমবিকাশ ও ক্রমপ্রতিষ্ঠার ধারা জনকবিদ্যাসাগর

    ২৬ সেপ্টেম্বর, ১৮২০ খ্রীঃ মেদিনীপুরের বীরসিংহ গ্রামের নিরতিশয় দরিদ্র পরিবারে পণ্ডিত ঈশ্বচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জন্ম । পিতা ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায় । মাতা ভগবতী দেবী । ঈশ্বরচন্দ্র তাঁদের প্রথম সন্তান । সে যুগে ইংরাজি ভাষা এবং সাহিত্য পাঠের সুযোগ ছিলো সীমিত । তবু নিজের অধ্যাবসায়ে শুধুমাত্র সংস্কৃত ভাষাতেই নয়, ইংরাজি ভাষাতেও বিদ্যাসাগর অসাধারণ বুৎপত্তি লাভ করেছিলেন । বাঙলা ভাষা এবং সাহিত্যের বিবিধ শাখায় তাঁর সচ্ছন্দ বিচরণ ছিল । গোঁড়া ব্রাহ্মণ পরিবারের সন্তান ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপোধ্যায়ের (বিদ্যাসাগর) মধ্যে কঠোরতা, কোমলতা, বুদ্ধিবৃত্তি এবং হৃদয়াবেগের অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছিল । অনন্যসাধারণ পণ্ডিত, শিক্ষাসংস্কারক, সমাজসংস্কারক এবং পরম করুণাময় তাঁর সমগ্র জীবনসাধনা আভাসিত হয়েছে তাঁরই রচনাবলীর মধ্যে । সাহিত্যস্রষ্টা বিদ্যাসাগর কালের উপর চিরজয়ী । বঙ্কিম থেকে রবীন্দ্রনাথ – বাঙালী লেখকমাত্র সকলেই তাঁর অনুগামী । বঙ্কিমচন্দ্র বলেছেন – “বিশেষতঃ বিদ্যাসাগর মহাশয়ের ভাষা অতি সুমধুর ও মনোহর । তাঁহার পূর্বে কেহই এরূপ সুমধুর বাঙ্গালা গদ্য লিখিতে পারেন নাই, এবং তাঁহার পরেও পারে নাই ।”
    শুধু বিদ্যাসাগরের দানের নয়, তাঁর সুকোমল হৃদয়বত্তার, মহানুভবতার, স্বাভাবিক ঔদার্যের, হাস্যকৌতুকের কত রকম গল্প বাঙালি সমাজে গড়ে উঠেছে । সেসবের মধ্যে বস্তুগত সত্য সবসময়ে নেই, কিন্তু আছে । রবীন্দ্রনাথের ভাষায় – ‘আরও সত্য’ । বিদ্যাসাগর বাঙালীসাধারণের প্রাণে এমন সব ছোটবড় মানবীয় গুণের প্রতীক । বাইরে যখন সমাজ তাঁকে স্বীকার করতে কুণ্ঠিত তখনো দেশের জনসমাজ অন্তরে অন্তরে তাঁর সেই মানবরূপকে স্বীকার করে বসেছিলো । তিনি কেবল রবীন্দ্রনাথের চোখে ‘হিরো’ নন, বাঙলার জনমনেরও ‘হিরো’ ।
    রবীন্দ্রনাথই প্রথম বিদ্যাসাগরের দুই প্রত্যক্ষ কীর্তি প্রত্যক্ষ করেন – একটি বাঙলা গদ্যে পাঠের সৌকর্যার্থে কমা, সেমিকোলোন প্রভৃতির প্রবর্তন । দ্বিতীয়টি সুক্ষ্মতর – যেভাবে বাঙালীর কণ্ঠ অর্থগত ও স্বরগত নিয়মে বাক্যকে ভাগ করে নেয় – সেই সেন্সগ্রুপ ও ব্রেথ্‌গ্রুপকে সমন্বিত করে বাংলা কথার প্রাণছন্দকে সৃষ্টি করা । তিনি বলেছেন – “বিদ্যাসাগর বাঙ্গালা ভাষার প্রথম যথার্থ শিল্পী ছিলেন । তৎপূর্বে বাঙ্গালায় গদ্যসাহিত্যের সুচনা হইয়াছিল, কিন্তু তিনিই সর্বপ্রথমে বাঙ্গালা গদ্যে কলানৈপুণ্যের অবতারণা করেন । বিদ্যাসাগর বাঙ্গালা গদ্যভাষার উচ্ছৃঙ্খল জনতাকে সুবিভক্ত, সুবিন্যস্ত, সুপরিচ্ছন্ন এবং সুসংযত করিয়া তাহাকে সহজ গতি এবং কার্যকুশলতা দান করিয়াছেন……বিদ্যাসাগর বাঙ্গালা লেখায় সর্বপ্রথম কমা, সেমিকোলন প্রভৃতি ভেদচিহ্নগুলি প্রচলিত করেন । …..বাস্তবিক একাকার সমভূম বাঙ্গালা রচনার মধ্যে এই ছেদ আনয়ন একটা নবযুগের প্রবর্তন । এতদ্দ্বারা, যাহা জড় ছিল তাহা গতিপ্রাপ্ত হইয়াছে । …. গদ্যের পদগুলির মধ্যে একটা ধ্বনিসামঞ্জস্য স্থাপন করিয়া তাহার গতির মধ্যে একটি অনতিলক্ষ্য ছন্দস্রোত রক্ষা করিয়া, সৌম্য এবং সরল শব্দগুলি নির্বাচন করিয়া বিদ্যাসাগর বাঙ্গালা-গদ্যকে সৌন্দর্য ও পরিপূর্ণতা দান করিয়াছেন । গ্রাম্য পাণ্ডিত্য এবং গ্রাম্য বর্বরতা উভয়ের হস্ত হইতেই উদ্ধার করিয়া তিনি ইহাকে পৃথিবীর ভদ্রসভার উপযোগী আর্যভাষারূপে গঠিত করিয়া গিয়াছেন । তৎপূর্বে বাঙ্গালা-গদ্যের যে অবস্থা ছিল তাহা আলোচনা করিয়া দেখিলে এই ভাষাগঠনে বিদ্যাসাগরের শিল্পপ্রতিভা ও সৃজনক্ষমতার প্রচুর পরিচয় পাওয়া যায় ।”
    রবীন্দ্রনাথের এই কথাটির মধ্যে সমগ্র বিদ্যাসাগরসাহিত্যের মূল সত্য নিহিত আছে । বিদ্যাসাগর বাঙলা ভাষার ‘প্রথম যথার্থ শিল্পী’ অর্থাৎ শুধু লেখক নন, প্রচারক নন, শিক্ষাগুরু নন; সেসবের সীমা অতিক্রম করে, বিদ্যাসাগর সাহিত্যশিল্পী । বাঙলা সাহিত্যে বিদ্যাসাগরের স্থান বুঝতে হলে বাঙলা সাহিত্যের ইতিহাস ও বাঙলা গদ্যের ইতিহাসের ধারা থেকেই বুঝতে হবে । তবে এই পরিপ্রেক্ষিতে বিদ্যাসাগরের পূর্ববর্তী কিছু মানুষের দানের কথা মনে রাখা দরকার । প্রধানত স্মরণীয় – উইলিয়াম কেরি, মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার, রামমোহন রায়, ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়, প্যারীচাঁদ মিত্র, অক্ষয়কুমার দত্ত প্রভৃতির দান ।
    উইলিয়াম কেরির ‘কথোপকথন’ (১৮০১ খ্রীঃ) অসামান্য বস্তু । বিভিন্ন শ্রেণির ও বিভিন্ন স্তরের বাঙালীর শিষ্ট আলাপ থেকে মেয়েলি কোঁদল পর্যন্ত নানা রীতির কথিত বাঙলার নিদর্শন এতে পাওয়া যায় । মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কারকে কেউ কেউ প্রথম গদ্যশিল্পী বলে গণ্য করেন । মৃত্যুঞ্জয়ের লেখায় স্বভাবতই বিষয়বৈচিত্র্য এবং ভাষার বৈচিত্র আছে । ‘প্রবোধচন্দ্রিকা’য় (রচিত ১৮১৩, প্রকাশিত ১৮৩৩) আমরা অন্তত তিন রকম গদ্যরীতির নমুনা পাই । একদিকে সংস্কৃতানুরাগী সাধুভাষা, মাঝখানে সরল সচ্ছন্দ সাধুভাষা এবং অন্যদিকে প্রায় কথ্য ভাষা – যা কেরির ‘কথোপকথনে’র কথা মনে করিয়ে দেয় । মৃত্যুঞ্জয়ের শিল্পকৌশল স্বীকার্য । কিন্তু অনেক কারণেই তাঁর শিল্পবোধ খণ্ডিত এবং শিল্পরীতিতেও ব্যাহত । তিনি নানারূপ ভাষার পরীক্ষা করেছেন অথচ সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারেননি । বিষয়ের দিক থেকে বৈচিত্র্য থাকলেও রীতিস্থিরত্ব নেই । বিচার-যুক্তিতেও তিনি কুযুক্তিপরায়ণ, অশালীন, কটুক্তিবিলাসী । রামমোহন রায়ের বাংলা গদ্য সম্বন্ধে ‘সংবাদ প্রভাকর’-এ (১৮৫৪ সালে) বলা হয়েছে – “রামমোহন জলের ন্যায় সহজ ভাষা লিখিতেন । তাহাতে কোনো বিচার ও বিবাদ ঘটিত বিষয় লেখায় মনের অভিপ্রায় ও ভাব সকল অতি সহজে স্পষ্টরূপে প্রকাশ পাইত; এজন্য পাঠকেরা অনায়াসেই হৃদয়ঙ্গম করিতেন, কিন্তু সে লেখায় শব্দের বিশেষ পারিপাট্য ও তাদৃশ মিষ্টতা ছিল না ।”
    রামমোহন রায়ের আমলের পণ্ডিতদের মধ্যে মৃত্যুঞ্জয় ছিলেন গদ্যগুরু । নানা ধরণের লিপিকৌশল দেখাতে ওস্তাদ ছিলেন । রামমোহন রায় আয়ত্ব করেছিলেন বাঙলা ভাষার মূল রূপটিকে । তিনি বিচার ও আলোচনার গদ্যই তৈরি করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু রামমোহন শিল্পী নন – বিচারকুশল তার্কিক । গদ্যসাহিত্য সৃষ্টি তাঁর কল্পনায়ও ছিল না । রামমোহনের বিচারপদ্ধতিও সংস্কৃত শাস্ত্রবিচারের ঐতিহ্যানুযায়ী মধ্যযুগের স্কুলম্যান-এর পদ্ধতি । কারণ, পণ্ডিতের ঐতিহ্যপদ্ধতির তখনো সমাজে প্রতিষ্ঠা ছিল । রামমোহন প্রথম থেকেই (বেদান্তগ্রন্থের অনুবাদ, ১৮১৫) বাঙলা বাক্যের মূল প্রকৃতি ধরতে পেরেছিলেন । বাঙলা গদ্যভাষার ‘অন্বয়’ – কর্তা, কর্ম, ক্রিয়া প্রভৃতির বাক্যমধ্যে চমৎকার প্রমাণ । রামমোহন বক্তব্যকে সরল করার জন্যই লিখতেন – শব্দ বা বাক্যের খেলা দেখাবার ইচ্ছায় নয় । তার্কিক রামমোহন বিপক্ষের বিরুদ্ধে কটূক্তি প্রয়োগ করেননি এবং অপরের কটূক্তিকে যুক্তির দ্বারা নিরসন করেছেন । ‘প্রবর্তক-নিবর্তক সংবাদ’-এ স্ত্রীজাতির গুণাবলীর সমর্থনে শুধু অদ্ভুত উদার দৃষ্টির পরিচয় দেননি, সে লেখাতে রীতিমত আন্তরিকতার স্পর্শও আছে । বিদ্যাসাগরের গদ্যরচনায় এসব গুণের (রসবোধের সঙ্গে) সমাবেশ ঘটেছে । তাতেই বিদ্যাসাগর গদ্যশিল্পী ।
    রামমোহন রায়ের সময়কার ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় (নববাবুবিলাস) কিন্তু গদ্যসাহিত্য রচনা করেছিলেন । সে দিক থেকে টেকচাঁদ ঠাকুরের (প্যারিচাঁদ মিত্র) ‘আলালের ঘরের দুলাল’-এর গুরুত্বই সর্বাধিক । লেখাটি চমৎকার । একথা ভোলা উচিৎ নয় যে, বাঙলা গদ্য গড়তে এঁরাই সর্বাপেক্ষা বেশি সাহায্য করেছেন । ‘তত্ত্ববধিনী পত্রিকা’-র বাঙলা গদ্যও উল্লখেযোগ্য । স্বয়ং বিদ্যাসাগর ছিলেন সে পত্রিকার সঙ্গে জড়িত । যদিও দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, রাজনারায়ন বসু ‘তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা’য় বাঙলা গদ্যে আরও সজীবতা সঞ্চার করছিলেন তবুও অক্ষয়কুমার দত্ত ছিলেন ‘তত্ত্ববধিনী’র সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য লেখক । ‘বাহ্যবস্তুর সঙ্গে মানববস্তুর সম্বন্ধবিচার’ (১৮৫২-৫৩) ও ‘ভারতবর্ষীয় উপাসক সম্প্রদায়’ (১৮৭০-১৮৮৩) বস্তুনিষ্ঠ আলোচনায়, লিপিকুশলতায় বাঙলা ভাষার চিরকালের সম্পদ । কিন্তু অক্ষয়কুমার দত্তের ভাষায় সরসতা কম । তা বিশুদ্ধ যুক্তিবাদের ভাষা এবং অনেকটা বিশুষ্ক যুক্তিবাদের ভাষা । এখানেই বিদ্যাসাগরের গদ্যরচনার সার্থকতা । তাঁর যুক্তিবাদী লেখা কিন্তু সরস এবং প্রয়োজনমত রসাভিষিক্ত যা বুদ্ধিকে জীইয়ে তোলে, প্রাণকে সজীব করে । বিদ্যাসাগরের হাতে বাঙলা গদ্য তাই আত্ম-আবিষ্কার করল । বাংলা গদ্যের ক্রমবিকাশ ও ক্রমপ্রতিষ্ঠার ধারায় কাউকে ‘জনক’ বলতে হলে বিদ্যাসাগরকেই বলা চলে । রবীন্দ্রনাথের ভাষায় তাঁকে “বাঙ্গালা ভাষার প্রথম যথার্থ শিল্পী” বলাই বরং সর্ব রকমে সুসঙ্গত ।
    শিক্ষাপ্রয়াসে বিদ্যাসাগর সামান্যই সাফল্যলাভ করেছিলেন । অথচ এখনো তাঁর শিক্ষানীতি অচল নয় । সমাজসংস্কারে বিদ্যাসাগরের সাফল্য আরও সামান্য । তিনি বিধবা বিবাহ আইন পাশ করিয়েছিলেন কিন্তু সেই প্রথা আজও তেমন ফলপ্রসু হয়ে উঠলো না । ১৮৫৫ সালে তিনি প্রকাশ করেন ‘বিধবা বিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিৎ কিনা তদ্বিষয়ক প্রস্তব’ বই । এর চোদ্দ মাসের মধ্যেই বিধবা বিবাহ আইন পাশ হয় । আইনসিদ্ধ হওয়ায় বিধবা বিবাহের আর বাধা রইলো না এবং প্রথম বিধব বিবাহ অনুষ্টিত হয় ডিসেম্বর, ১৮৫৬ । বিদ্যাসাগরের এই উদ্যোগ সর্বত্র সাড়া ফেললেও সমাজে ব্যাভিচার এবং ভ্রুণহত্যা – কোনোটাই কমেনি । নেভেনি বৈধব্যযন্ত্রণার অনল । এমনকি বিধবাকে বিবাহ করার পথপ্রদর্শক শ্রীশচন্দ্রকে স্ত্রীর মৃত্যুর পর প্রায়শ্চিত্ত করে জাতে উঠতে হয়েছিলো । বিধবা বিবাহ আইনের অসফলতার কারণ হলো বাঙালী মানসিকতা এবং সমাজভীতি । তাই হয়তো ‘রঙ্গালয়’ পত্রিকায় (৩ জ্যৈষ্ঠ, ১৩০৮) লেখা হয়েছিলো, ‘স্বর্গীয় বিদ্যাসাগর মহাশয়ের ন্যায় পুরুষশ্রেষ্ঠ যখন সর্ব্বস্বপণ করিয়া বাঙ্গালায় বিধবা বিবাহ চাপাইতে পারেন নাই, তখন আপাততঃ বাঙ্গালায় কাজের মত কোন কাজই হইতে পারে না ।”
    তিনি শিক্ষাগুরু, সমাজগুরু, সাহিত্যগুরু’র চেয়েও আগে ছিলেন ‘বিদ্যার সাগর’, ‘দয়ার সাগর’ । দানবীর বিদ্যাসাগর স্বোপার্জিত অর্থেই অকাতরে দান করেছেন । তিনি শিক্ষাবিদ এবং সমাজ সংস্কারক হিসেবে পরিচিত হবার সঙ্গে সঙ্গে ব্যবসায়ী হিসেবেও সফলতা লাভ করেছিলেন । সংস্কৃত কলেজে চাকরী করার কালেই, ১৮৪৭ সালে, সংস্কৃত কলেজেরই এক সহকর্মী মদনমোহন তর্কালঙ্কারের সঙ্গে যৌথ ভাবে একটি ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা করেন । ব্যবসার মূলধন জোগাড় করেছিলেন জনৈক নীলমাধব মুখোপাধ্যায়ের কাছ থেকে ছয় শত টাকা ধার করে । প্রথম বরাত পেলেন ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের ছাত্রদের জন্য ‘অন্নদামঙ্গল’ ছাপানোর । সেই শুরু হলো তাঁদের ‘সংস্কৃত প্রেস’-এর যাত্রা । তাঁদের উদ্যোগে প্রাচীন সাহিত্যের হারিয়ে যাওয়া বহু পুথি, গ্রন্থ ছাপা হতে থাকলো সংস্কৃত প্রেস থেকে । এর পর তাঁরা নিজেদের লেখা বই নিজেরাই ছাপায় উদ্যোগী হলেন ।
    ১৮৪৯ সালে  এই ছাপাখানা থেকে প্রকাশিত হলো মদনমোহন তর্কালঙ্কারের ‘শিশুশিক্ষা’র প্রথম এবং দ্বিতীয় ভাগ । পরের বছর ছাপা হলো তৃতীয় ভাগ । ১৮৫৫ সালে ছাপা হলো বিদ্যাসাগরের ‘বর্ণপরিচয়’-এর প্রথম এবং দ্বিতীয় ভাগ । ‘বর্ণপরিচয়’- এর প্রথম সংস্করণ প্রথমে ছাপা হয়েছিলো তিন হাজার কপি । এর পর প্রতিবার ছাপা হতো পাঁচ হাজার কপি করে । প্রথম দু’বছরের মধ্যে ‘বরণপরিচয়’ –এর নয়টি সংস্করণে তিপ্পান্ন হাজার কপি প্রচারিত হয়েছিলো । ১৮৮৫ সালে একশত তেত্তিরিশ সংস্করণ থেকে প্রতিবার ‘বর্ণপরিচয়’ প্রথম ভাগ ছাপা হতে থাকলো পঞ্চাশ হাজার কপি করে । ১৮৫৬ সালে  বিদ্যাসাগরের ‘কথামালা’ প্রকাশ হয় । ১৮৯০ সাল পর্যন্ত এই বইয়ের একান্নটি সংস্করণ হয় । তাঁর কর্মক্ষমতায় এবং ব্যবসায়িক যোগ্যতায় তাঁর বই ও ব্যবাসায়ের আয় মাসে ক্রমে তিন চার হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছিল । সংস্কৃত প্রেস বিক্রি করে দেওয়া পর্যন্ত বিদ্যাসাগরের ‘বর্ণপরিচয়’ এবং ‘কথামালা’ বিক্রি তাঁর প্রকাশনাকে অর্থে ভরিয়ে দিয়েছিলো । তবুও ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে তিনি তখনো পরম মিতব্যয়ী । তাঁর উদ্দেশ্য ছিলো অর্জিত অর্থ সম্পূর্ণ সার্থকভাবে দরিদ্র ও অভাবগ্রস্তের কষ্টমোচনে বা যোগ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অকাতরে উৎসর্গ করা ।
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর একেবারেই রূপবান পুরুষ ছিলেন না । তাঁকে খর্বকায়ও বলা চলতো । শ্যামবর্ণ, নাক-মুখ-চোখ অতি সাধারণ । মাথা একটু বড়, তাতে সামনে কামানো উড়ে খোঁপা বাঁধা । বিদ্যাসাগর নিজেও তাঁর রূপ নিয়ে সচ্ছন্দে পরিহাস করতে পারতেন । কৈলাশচন্দ্র বসুর গৃহে তাঁর প্রতিকৃতির নিচে ‘শ্রীমান্‌ ঈশ্বরচন্দ্রোহয়ং’ লেখা দেখে তিনি বলেছিলেন – “শ্রীমান্‌ না হলে কি এমন উড়ে চেহারার রূপ হয় ?” দেহকে বেশভূষায় কিছুটা শোভন করা মানুষের স্বাভাবিক দুর্বলতা । এই ব্যাপারেও বিদ্যাসাগরের অভ্যাস সুবিদিত । তিনি আজীবন ধুতি, মির্‌জাই, চাদর, চটিতে ব্রাহ্মণ পণ্ডিতের বেশই দুর্বার নিয়মে ধারণ করে গিয়েছেন । চটি-চাদর ছিল একই কালে নবজাগরণের পুরুষ বিদ্যাসাগরের আত্মমর্যাদা ও জাতীয় মর্যাদাবোধের সুস্থির আত্মঘোষনা । সাহেব দেখলে মেরুদণ্ড বেঁকে যাবার মত মানুষ তিনি ছিলেন না । শুধু সাহেব কেন, ধনী বা ক্ষমতাবানদের কাছেও নিজের আত্মমর্যাদা ক্ষুণ্ণ হতে দিতেন না । মনুষ্যত্বের মর্যাদাবোধেই তিনি মানুষকে মর্যাদা দিতেন । ক্ষমতা কিম্বা পদগরিমায় নয় । নবজাগরণের ভদ্রসমাজে তিনি খাপছাড়া – উগ্রপ্রকৃতির না হয়েও আত্মস্বাতন্ত্র্যে একক । আত্মপ্রত্যয়ে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ । আত্মমর্যাদায় অনমনীয় । তিনি কলকাতার সমাজে আত্মপ্রতিষ্ঠিত হয়েছেন বিদ্যায়, পাণ্ডিত্যে, চরিত্রবলে । আভিজাত্যের যুগকে শেষ করে বাঙলায় এসেছেন শিক্ষিত মধ্যবিত্তের যুগের পুরোধারূপে ।
    ধর্মবিশ্বাসের প্রশ্ন তুলতে বিদ্যাসাগর নিজে উৎসাহ বোধ করতেন না । তিনি দেবমন্দিরে যেতেন না । কোনো মাতাজী, বাবাজী প্রভৃতির কাছেও ঘেঁষতেন না । এদেশে ধর্ম বলতে যা বোঝায় এবং ধার্মিক লোকেরা ঈশ্বর বলতে যা বঝেন বিদ্যাসাগর তাতে আস্থা রাখতেন না । তাঁর একমাত্র বিশ্বাস ছিল মানবিক ধর্মে । মন্দির, মসজিদ, ব্রাহ্ম-উপাসনা – সকল জিনিসেই তাঁর সমান নিরপেক্ষতা ও নিস্পৃহতা । তবে একটি কথায় তিনি নিজের চিন্তা ব্যক্ত করেছিলেন  – “এই বিধাতা ও বিধান এতই গভীর রহস্য যে মানুষের জ্ঞানবুদ্ধি আরও অনেক অনেক উন্নত হলেও তার যথার্থ সন্ধান পেতে বহু বিলম্ব হবে ।” তিনি বুঝেছিলেন, জ্ঞানবিজ্ঞানের পথে এগিয়ে চলাই মানুষের ধর্ম । বৈজ্ঞানিক জ্ঞানে ও মানবিক প্রেমে-মমতায় কর্তব্যপালনই মানবধর্ম ।
    ঈশ্বরচন্দ্র সম্বন্ধে বিবেকানন্দের ধারণা – “মানুষের উপর যাঁর এমন মমতা তিনি যথার্থ ধার্মিক ।” ভগিনী নিবেদিতাকে বিবেকানন্দ বলেছিলেন, রামকৃষ্ণের পরেই তাঁর গুরু বিদ্যাসাগর । বিদ্যাসাগর কিন্তু ঐশী শক্তির কথা রঙ্গতামাসায় উড়িয়ে দিতেন । সবার উপরে মানুষ বিদ্যাসাগর সত্য । তিনি আজীবন ধুতি, মির্‌জাই, চাদর, চটিতে ব্রাহ্মণ পণ্ডিতের বেশই দুর্বার নিয়মে ধারণ করে গিয়েছেন । তাঁর বিলাসিতা বলতে ছিলো – বই । আর বইগুলি ভালোভাবে রাখার জন্য বহু খরচে বাঁধাই করে রাখা । এই ব্যাপারে তিনি ছিলেন অকুণ্ঠিত । বই ছাড়া আর একটা বিষয়ে তিনি কিছু অর্থব্যয় করেছিলেন । নিজের বিপুল গ্রন্থসম্ভার রাখার জন্য বাদুর বাগানে একটি দোতলা বাড়ি, শঙ্কর ঘোষ লেনে ‘মেট্রোপলিটন ইনস্টিটিউশন’ অর্থাৎ আজকের বিদ্যাসাগর কলেজের নিজস্ব ভবন এবং সাঁওতাল পরগণার কমাটাঁড়ের বাড়ি ‘নন্দন কানন’ নির্মাণ করায় । ক্লান্ত, পীড়িত, মানুষের প্রতারণায় দগ্ধবিদগ্ধ বিদ্যাসাগর শেষ পর্যন্ত শান্তি পেতেন একমাত্র কার্মাটাড়ে সাঁওতালদের সাহচর্যে । তারা কাপট্যহীন নর-নারী, সভ্য সমাজ ও তার সভ্যতার বাইরে সহজাত মনুষ্যত্বে তারা মানুষ । তাদের কাছে বিদ্যাসাগরের আপনার জন হয়ে উঠ্যেছিলেন । তাঁর বিশ্বাস বিনষ্ট হয়ে গিয়েছিল দেশের ধনী ও বড়লোকদের উপর, তাঁর স্বশ্রেণির ভদ্রলোকদের উপর এমন কি তাঁর আপন আত্মীয়-স্বজনদের উপর । তাই কার্মাটাডের সাঁওতালগণের কাছে উপস্থিত হলেই তিনি নিজের সুস্থ হৃদয়মন ফিরে পেতেন ।
    মধ্যবিত্তের প্রথম পথিকৃৎ নবজাগরণের দায়িত্ব নিতে গিয়ে বিদ্যাসাগর নিজের শ্রেণিতেই ছিলেন একক ও অগ্রাহ্য । ইতিহাসের দাবী মেনে নিয়েছেন বলেই নিজের শ্রেণিতে তিনি অপাংক্তেয় । নিজের সংসারে-পরিবারেও নিঃসঙ্গ । তাই দেখি আবাল্য বন্ধু মদমমোহন তর্কালঙ্কারের সঙ্গে বিদ্যাসাগর সম্পর্কচ্ছেদ করেন । মহেন্দ্রলাল সরকারের মতো কৃতী পুরুষের সঙ্গেও তাঁর বিচ্ছেদ ঘটে । কনিষ্ঠ ভ্রাতা ঈশানচন্দ্র তাঁর বিরুদ্ধে মামলায় প্রবৃত্ত হন । একমাত্র পুত্রকেও তিনি বর্জন করতে বাধ্য হন । পত্নী দিনময়ীও তাঁকে বুঝতে পারতেন না । পরিবার ও আত্মীয়দের আচরণে মর্মাহত হয়ে তিনি জন্মের মতো বীরসিংহ ছেড়ে চলে এলেও গ্রামের উন্নতি ও গ্রাম্য দরিদ্রদের সাহায্য আজীবন করেছিলেন কিন্তু বীরসিংহে আর কখনো পা রাখেননি । তিনি অসংখ্য কাজে সদা ব্যস্ত ছিলেন । তার উপর শেষ জীবনে ছিলেন পীড়াগ্রস্ত । তাই বহুলোকের আগ্রহ সত্ত্বেও নিজের কর্মবহুল জীবনের কথা লিখে যেতে পারেননি । মাত্র দুটি পরিচ্ছেদ তিনি লিখেছিলেন – পিতৃমাতৃকুলের কথা ও পাঠার্থে নিজের কলকাতায় আগমন পর্যন্ত বাল্যজীবনের কথা ।

    Spread the love