প্রবন্ধ – বনবীথি পাত্র

    0
    11
    ঠিকানা: পাটুলি, পূর্ব বর্ধমান বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রী হলেও সাহিত্য আমার প্রথম প্রেম। শব্দের বাঁধনে মানুষের জীবন আর মনের টানাপোড়েনকে ছুঁয়ে যেতে চাই।
    Spread the love

    বিদ্যাসাগর২০০/বিশেষ সংখ্যা

    শ্রদ্ধার্ঘ্য

    -কপাল পুড়িয়েও এতো শখ আসে কি করে! এমন মেয়ের কি দড়ি-কলসী জোটে না?
    বাড়ির ভিতর থেকে কথাগুলো শুনতে পেয়ে একটু অপ্রস্তুত ভাবেই দরজার সামনে থমকে যান নৃপেনবাবু। ভিতরের পরিবেশ যে বেশ গরম, সেটা বাইরে থেকেই আন্দাজ করতে পারে। তিনি এসেছিলেন মাস্টারমশায়ের কাছে। আর তো বেশি দিন বাকিও নেই, জরুরী আলোচনাগুলো মাস্টারমশায়ের সঙ্গে সেরে নিতে হবে। কিন্তু এই অবস্থায় কি ভেতরে ঢোকা ঠিক হবে! ভেতরে ঢুকবে না চলে যাবে ভাবছেন নৃপেনবাবু, তখনই ভেতরে থেকে ডাক আসে,
    -দরজায় কে দাঁড়িয়ে আছেন, ভেতরে আসুন।
    বৌঠান ঘরের ভেতর থেকেও খেয়াল করেছেন নৃপেনবাবুকে। বাধ্য হয়ে ভেতরে ঢুকতেই হলো তাঁকে।
    ছোট একতলা বাড়ি। পাঁচিল দিয়ে ঘেরা ছিমছাম একফালি উঠোন সামনে। উঠোনের এককোণে একটা ঝাঁকুমুকু আমগাছ। গ্রামের প্রাইমারী স্কুলের মাস্টারমশাই ছিলেন, অনেক বছর হলো অবসর নিয়েছেন। মা-বাবা-বোন সবার প্রতি দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নিজের আর্থিক অবস্থার আর সেভাবে উন্নতি করতে পারেননি। মাস্টারমশায়ের প্রথম স্ত্রী মারা যায় তিনবছরের মেয়েটাকে রেখে। মেয়েটাকে বড় করতে একজন মানুষ তো লাগবে, সেই ভেবেই নাকি ওনাকে দ্বিতীয়বার বিবাহে বসতে হয়েছিল। কিন্তু মাস্টারমশায়ের সে ইচ্ছা আর পূরণ হয়নি। সৎমা এসে আপন করে নিতে পারেননি বেচারী মা মরা শ্যামলীকে।
    মাস্টারমশাই বারান্দায় বসে খবরের কাগজ পড়ছেন। সবজি কাটছেন বৌঠান। নৃপেনবাবু উঠোনে ঢুকতেই শ্যামলী ছুটে ঘরে চলে গেল। শ্যামলীর পরনের লাল শাড়িটা নজর এড়ালো না নৃপেনবাবুর। ঐ লাল শাড়ি পরা নিয়েই যে গোলমাল এবার বুঝতে পারলেন। মেয়েটার বেচারী সত্যিই জনম দুখী। বিয়ের পর বরটাও মারা গেল বছর না ঘুরতে। শ্বশুরবাড়ির পাট চুকিয়ে আবার এসে পড়ল সেই সৎমায়ের সংসারে।
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়ের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষ্যে বছরভর কিছু উন্নয়নশীল অনুষ্ঠানের কথা ভাবা হয়েছিল গ্রামের বিদ্যাসাগর পাঠাগারের পক্ষ থেকে। মাস্টারমশাই পাঠাগারের সভাপতি। আজকাল বয়সজনিত কারণে সবসময় আর পাঠাগারে যেতে পারেন না মাস্টারমশাই। তাই ওনার বাড়ি এসেই ওনার সাথে জরুরী আলোচনাগুলো সেরে নেন নৃপেনবাবু।
    মাস্টারমশাই ঠিকই বলেছেন, সাধারণ মানুষকে সমাজ সচেতন করতে হলে প্রথমে বিদ্যাসাগরের আদর্শে নিজেদের অনুপ্রাণিত করতে হবে।
    মাস্টারমশায়ের বাড়ি থেকে ফেরার পথেই মনে মনে সিদ্ধান্তটা নিয়ে নিয়েছিলেন নৃপেনবাবু। আজ ২৬শে সেপ্টেম্বর, বিদ্যাসাগরের জন্মদিন।
    গ্রামে একটা বয়স্ক শিক্ষার সান্ধ্যবিদ্যালয় উদ্বোধন হচ্ছে আজ। অনুষ্ঠান মঞ্চেই নৃপেনবাবু তাঁর একমাত্র ছেলের সাথে শ্যামলীর বিয়ের কথাটা ঘোষণা করলেন।
    বিদ্যাসাগর মহাশয়ের জন্মদিনে এর থেকে বড় শ্রদ্ধার্ঘ্য আর কিছু তিনি খুঁজে পান নি।

    Spread the love