কবি বিনয় মজুমদার-এর জন্মদিনে উপলক্ষে বিশেষ রচনা-তে বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়

0
12
Spread the love

‘কেন ব্যথা পাও বলো,পৃথিবীর বিয়োগে বিয়োগে ?’

কবি বিনয় মজুমদারকে আমি দেখিনি, কিন্তু এই মানুষটিকে নিয়ে আমার তুমুল বিস্ময়।একজন কবি কীরকম হবে? শুধু কি সাদা পাতার উপর লেখা থাকবে তাঁর কিছু  মায়াবী অক্ষর? সেই অক্ষরের ভেতর আলো ফেলে ফেলে আমরা কবিকে খুঁজব? আর মুগ্ধ হব তাঁর  সাবালক আলোকিত অভিনয়ে? মিথ্যাবর্ণ আয়োজনে? হাততালি দিয়ে উঠব তাঁর খ্যাতি প্রতিপত্তি এবং সম্মোহনের ধারাবাহিক ক্ষমতায়।এর বিপরীতে আমরা কি একবারও প্রত্যক্ষ করব না সেই সত্যকে ?  ভারতের সর্বকালের সেরা ইঞ্জিনিয়ার হয়েও উজ্জ্বল সমস্ত সম্ভাবনাকে  তছনছ করে দিয়ে দামি চাকরি , আর্থিক প্রতিপত্তি ভোগবাদের  সমস্ত বিলাসসামগ্রীকে তাচ্ছিল্য করে, প্রত্যাখান করে  শুধু কবিতার জন্য “হৃদয় নিঃশব্দ রাজ্যে” আত্মগত উপলব্ধিকেই খনন করে যেতে চান আবহমান সময়ের ভেতর। নির্জন আকাশের ধ্বনি আমরা যেখান থেকে অর্জন করি যেখান থেকে আমরা এক একটি সংখ্যার ভেতর প্রাণসংস্থাপনের জৈব জ্যামিতি, গণিতকে দিয়ে কথা বলিয়ে নেওয়ার প্রকৌশল শিখি সেই উৎসভূমির কাছে প্রণত হবো না? না কি একে নিছক পাগলামি বলে মনোবিকলন বলে দূরে সরিয়ে রাখব?
বিনয় মজুমদার সেই কবি যিনি একাধারে গণিতজ্ঞ, বিজ্ঞানবেত্তা এবং মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। তাঁর গাণিতিক সূত্রগুলি বিদেশে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত। গণিত এবং বিজ্ঞান দিয়ে কবিতার গভীর এবং রহস্যঘন অন্তঃপুরে তিনি প্রবেশ করেছেন। দেখেছেন অনুভূতি প্রদেশের প্রতিটি ইলেকট্রন প্রোটন নিউট্রন। তাদের চলাচল ঘুর্নন কীভাবে কবিতার জন্ম দেয় তা  অনুভব করেছেন  জলের মতো করে। তাই তাঁর কাব্যভাষা এক নতুন পৃথিবীর অনুসন্ধান করে।  ম্যাথমেটিক্যাল স্ট্রাকচার তাঁর কবিতার বিষয় ও প্রকরণকে দিয়েছে ভিন্নতর এক বিন্যাস।এক অভিনব সত্যের উদ্ভাসন।যাকে বলে অ্যাএক্সিওমেটিক ট্রুথ।তাই তাঁর কবিতার মেটাফোর একদিকে যেমন যুক্তি বিজ্ঞান এবং গাণিতিক তত্বের উপর দাঁড়িয়ে থাকে অন্যদিকে থাকে জীবনের দর্শন, থাকে প্রেম ভালোবাসার চিরকালীন সত্তা।এই মহাবিশ্বে কোন কিছুই বৈজ্ঞানিক সূত্রবিযুক্ত নয়।কবিতাও নয়, কোন সৃষ্টিরহস্যই নয়। জীবনের সূচনা কীভাবে হয়। শূন্যের ভেতর থেকে কীভাবে খুলে যায় এক একটি সম্ভাবনার দরজা কবিতার যৌক্তিক কাঠামোয় তিনি তা তুলে এনেছেন এভাবেই
X=0
এবং Y=0
বা X=0=Y
বা X=Y
শূন্য ০ থেকে প্রাণী X ও  Y সৃষ্টি হল
এইভাবে বিশ্বসৃষ্টি শুরু হয়েছিল। ( একটি গান )
ক্যালকুলাস নিয়ে তাঁর অবিরত ভাবনা, সমাকলন বা অবকলনের উপর তাঁর ক্রান্তদর্শী অবলোকন, কিউবরুট নিয়ে নিরন্তর গবেষণা এবং  স্থানাঙ্ক জ্যামিতির বিভিন্ন স্তর উন্মোচনে তাঁর সদাজাগ্রত অনুচিন্তার নানাবিধ প্রতিফলন যা বিজ্ঞানের প্রথগত তত্বের বাইরে এক কাব্যভুবনের ক্ষেত্রকেই প্রসারিত করে।গাণিতিক যুক্তিশীলতা, পরিমিতিবোধ তাঁর কাব্যস্থাপত্যের উপর নির্মাণ করেছে নতুন সৌধ। তিনি নিজেকে কখনই খন্ডিতের অংশবিশেষ বলে মনে করেননি বরং তিনি ধারণ করেছেন সমগ্রতাকে।তাই তাঁর কবিতা সামগ্রিকের ধারণাকেই লিপিবদ্ধ করে।
ক্যালকুলাসের এক সত্য আমি লিপিবদ্ধ করি।
যে কোনো ফাংকশনের এনেথ ডেরিভেটিভ এন
সমান  বিয়োগ এক বসিয়ে দিলেই
সেই ফাংকশানটি ফার্স্ট ইন্টিগ্রেশনের ফল পাওয়া যায়
এনেথ ডেরিভেটিভ এন
সমান বিয়োগ  দুই বসিয়ে দিলেই
সেই ফাংকশানটির সেকেন্ড ইন্ট্রিগ্রেশন হয়-
এনেথ দেড়িভেটিভ  এন
সমান বিয়োগ তিন বসিয়ে দিলেই
সেই ফাংকশানটির  থার্ড ইন্ট্রিগ্রেশনের ফল পাওয়া যায়
এইভাবে  সহজেই তা যে কোনো অর্থাৎ
দশম বা শততম অথবা সহস্রতম  ইন্ট্রিগ্রেশনের
ফল অতি সহজেই পাই
এই কবিতায় লেখা পদ্ধতির আবিষ্কর্তা  আমি
বিনয় মজুমদার। আমার পত্নীর নাম রাধা।
আর
আমার পুত্রের নাম কেলো। ( ভারতীয় গণিত)
একজন কবি লিখতে আসেন কেন? কেন তাঁকে ডেকে নেয় লেখার টেবিল?এই প্রশ্নগুলির দিকে ঘুরে দাঁড়ালে আমরা দেখব যে বুকের ভেতর জমে থাকা অসন্তোষ তাঁকে সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। তিনি এই সত্যগুলিকেই লিখতে চান। এই নিভৃত সত্যগুলি।কিন্তু যত সময় যায় তিনি বুঝতে পারেন সব সত্যগুলো লেখা যায় না।লিখতে পারেন না অনেককিছু হারানোর ভয়ে। যাঁরা হারাতে চান না, শুধু পেতে চান দুহাত ভরে। বিনয় মজুমদারের স্থানাঙ্ক এর বিপরীত অবস্থানে। কী হয় কবিতা লিখে? বিনয় মজুমদার হয়ে যাওয়া ছাড়া একজন প্রকৃত কবির  কাছের আর কোন সারস্বত সাধনা নেই। যিনি শুধু কষ্ট পেয়ে যাবেন পৃথিবীর বিয়োগে বিয়োগে।নিজের সমস্ত সম্ভাবনাগুলি পুড়িয়ে পুড়িয়ে তৈরি করবেন আশচর্য বেদবর্ণ বিকিরণ। যা তাঁর সুখ শান্তি পরিতৃপ্তি।
কেন এই অবিশ্বাস, কেন আলোকিত অভিনয়?
কী আছে এমন বর্ণ ,গন্ধময়, জীবনের পথে,
গন্ধময় জীবনের পথে হেঁটে যেতে যেতে দেখবেন বিকৃত পচে যাওয়া শবের ভেতর  ইতিহাস নির্মাণের প্রয়াস চলছে ।আর যা চিরকালীন শাশ্বত হয়ে থাকার কথা ছিল তাকে জোর করে কবরের মধ্যে পুরে দেওয়া হচ্ছে। এই সুখ ক্রমেই ব্যথা হয়ে উঠে। মানুষের ভেতর রয়ে গেছে অনির্বাণ পিপাসার বেগ। একে প্রতিরোধ করবার গতিরোধ করার স্পর্ধা কারুরই নেই। তাই এই পলকা ইতিহাস একদিন পালকের মতো ঝরে যাবে।
ঘুম ভেঙে দেখা যায়, আমাদের মুখের ভিতর
স্বাদ ছিল, তৃপ্তি ছিল, যেসব আহার্য পচে ইতিহাস সৃষ্টি করে
সুখ ক্রমে ব্যথা হয়ে উঠে ।
অঙ্গুলীয় নীল পাথরের বিচ্ছুরিত আলো
অনুষ্ণ অনির্বাণ জ্বলে যায় পিপাসার বেগে
ভয় হয় একদিন পালকের মত ঝরে ঝরে যায়।
জীবনানন্দ পরবর্তী সময়ের  এক দ্যুতিময় কবি তিনি। সমাজব্যবস্থার প্রেক্ষাপট থেকে রাজনীতির ইতিহাস, ক্ষমতার ইতিহাসকে তিনি বিশ্লেষণ করেছেন।ব্রিটিশ উপনিবেশোত্তর ভারতের সাম্রাজ্যবাদের চেহারা তিনি অনুভব করেছেন। দেখেছেন সাম্রাজ্যবাদী পুঁজিবাদের বৈঠকখানায়  কীভাবে ঢুকে যাচ্ছে সনাতন ভারতবর্ষের উৎপাদনী কাঠামো। বিনয়ের কবিতা হয়তো কাজী নজরুলের কবিতার মতো উচ্চকিত নয় আবার রাবীন্দ্রিক রোমান্টিকতাও তাকে আচ্ছন্ন করেনি। বরং হেলাল হাফিজের শব্দ ধার করে তাঁকে বলা যেতে পারে “ বিনীত বিদ্রোহী”। যদি প্রশ্ন করেন কোথায় বিদ্রোহ। তাহলে বলা কি খুব অসঙ্গত হবে যে,  তাঁর সমগ্র জীবনই তো একটি জ্বলন্ত প্রতিবাদ। ভোগবাদের বিরুদ্ধে, নাগরিক মাতব্বরির বিরদ্ধে পুঁজিবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে।মেকী আধুনিকতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে যথার্থ আধুনিকতার স্বরূপ উন্মোচন করেছেন তিনি। যা উঠে আসে জনগণের ভেতর থেকে যা উঠে আসে মানবতার ভেতর থেকে। বিনয় বুঝেছিলেন যে পুঁজির নিপীড়ন শুধুমাত্র  মেহনতী এবং পিছিয়ে পড়া মানুষের উপর চরম ভাবে নেমে আসে তাই নয়, তা বিপন্ন করে মানবিক সত্তাকেও।তিনি লিখেছেন
জঠরের ক্ষুধা তৃষ্ণা9+, অট্টালিকা,
সচ্ছলতা আছে
সফল মালার জন্য, হৃদয় পাহাড়ে
ফেলে রাখো ( কেন এই অবিশ্বাস )
তবু তিনি প্রেমের কাছেই ফিরে এসেছেন বারবার। যে প্রেম মানুষকে নতুন করে। অসহায় আর্ত মানুষের পাশে এসে দাঁড়ায়। মুছে দেয় চোখের জল, বুকের দীর্ঘশ্বাস। এই পিপাসা তো যথার্থ  একজন কবির পিপাসা
দীর্ঘ তৃষ্ণা ভুলে থাকি আবিস্কারে, প্রেমে
এই প্রেমের জন্যই তিনি  তিনি দিতে চেয়েছেন এক স্বচ্ছ ডানার অঙ্গীকার, দিতে চেয়েছেন তাঁর আশ্চর্য ফুল” শ্বাস ফেলে যুবকের  প্রাণের উপরে”। ভালোবাসা দিতে চেয়েছেন নিজেকে নিংড়ে যদি তা গ্রহণের সক্ষমতা থাকে
ভালোবাসা দিতে পারি , তোমরা কি গ্রহণে সক্ষম ?
লীলাময়ী করপুতে তোমাদের সবই ঝরে যায়-
হাসি , জ্যোৎস্না, ব্যথা, স্মৃতি, অবশিষ্ট কিছুই থাকে না ( ভালোবাসা দিতে পারি)
কবি বিনয় মজুমদার অনুভব করেছেন ‘পৃথিবীতে বাঁচা এক আশর্য ব্যাপার” তাই সবসময় তিনি আনন্দের ভেতর থাকতে চেয়েছেন। প্রগাঢ় আনন্দে। যা সৃষ্টির ভেতর দিয়েই সম্ভব।
আমার সৃষ্টিরা আজ কাগজের ভগ্নাংশে নিহিত
কিছু ছন্দে, ভীরু মিলে আলোড়িত কাব্যের কণিকা
এখন নিক্ষিপ্ত বায়ুপথে, ঝড়ের সম্মুখে
আমাকে ডেকো না কেউ  নিরলস প্রেমের বিস্তারে
ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সময় তিনি বামপন্থী ভাবধারার সংস্পর্শে এবং বামপন্থী ছাত্রআন্দোলনের সাথে যুক্ত হন। এই কারণেই তাঁর কবিতার ভেতর বস্তুবাদী চেতনার প্রতিফলন ঘটে। মানুষের কল্যাণে সাম্যবাদী ভাবনার কোন বিকল্প নেই এ কথা তিনি অনুভব করেছিলেন মনেপ্রাণে তাই ভোগবাদী চিন্তাচেতনার আগ্রাসন তাঁকে বিন্দুমাত্র প্রভাবিত করতে পারেনি।তিনি লিখেছিলেন –
‘’আমি এক কমিউনিস্ট – এই কথা উচ্চারিত হোক
দিকে দিকে পৃথিবীতে- এ আমার সঙ্গত কামনা।
এই সঙ্গত কামনাই তার রক্তময় আবেগ।তিনি তাঁর সাম্যবাদী চেতনাকে আরও বহুদূর অবধি প্রসারিত করেছেন। শুধু মানুষ নয়, মনুষ্যেতর প্রাণীদের মধ্যে তিনি নিজের অনুভবকে সঞ্চারিত করেছেন।“ মানুষের , বস্তুদের, প্রাণীদের জীবন প্রকৃতপক্ষে পৃথক পৃথক অসংখ্য  জীবন নয়, সব একত্রিত হয়ে একটি জীবন মোটে’ ফলে তাঁর সৃষ্টি হয়ে উঠে সম্মিলিত সকলের। এ কথা তিনি সগর্বে বলেছেন – “ একজন কবির কবিতার পেছনে তাঁর নিজের কোন অহংকার থাকা উচিত নয়, কেননা তাঁর সৃষ্টির পিছনে রয়েছে  সমস্ত জীব ও জড় জগতের নিঃশব্দ অবদান” অর্থাৎ যেকোন সৃষ্টিকে তিনি সমুদয়ের কীর্তি হিসেবেই চিহ্নিত করেছেন। ব্যক্তিপুজার বিপরীতে, আমাকে দেখুন এই ভাবনার উল্টোদিকে তাঁর অবস্থান। যা একজন প্রকৃত সাম্যবাদীর ভাবনাকেই প্রতিফলিত করে। এই ভাবনা দীর্ঘ অনুশীলনসমৃদ্ধ।তাই গ্রাম এবং প্রকৃতির সম্পন্নতাকে তিনি ব্যক্তিগত সমৃদ্ধির চেয়ে বেশি গুরুত্ব আরোপ  করেছেন। তিনি দেখেছেন “ কালক্রমে পৃথিবীর সবই মাটি হয়ে যায়, তবুও মাটির থেকে  রসাত্মক উদ্ভিদ গজায়, মানুষ মাটির সঙ্গে লেগে থাকে সর্বত্রই ধানখেতে, গ্রন্থাগারে, লোকসভায়”
তাহলে তো কোথাও বিয়োগচিহ্ন নেই। মাটিতেই জড়িয়ে আছে সবকিছু। আমাদের চিন্তাচেতনা উচ্চাকাঙ্ক্ষা, লোভ লালসা এবং ভালোবাসার সমূহ অক্ষর।তাহলে শুধুমাত্র রূপান্তরের ভেতর কেন যন্ত্রণা, কেন অসহায় আর্তি। “ কেন ব্যথা পাও তুমি পৃথিবীর বিয়োগে বিয়োগে ?

Spread the love