গদ্যে স্বাতী ব্যানার্জী

    0
    12
    Spread the love

    কমলমিত্র ছায়াদেবী খুকি ও গুলজার 

    খুকি বরাবর‌ই কবিতা প্রচন্ড ভালোবাসেন । খুব ছোট্টবেলা থেকেই খুকি নিজেও কবিতা লেখেন । খুকির কবিতা সচরাচর দুরকমের হয় । প্রেমে পড়ার আগে ইতিবাচক এবং ব্রেক‌আপের পরে নেতিবাচক । যদিও খুকির বন্ধুরা দুধরনের কবিতাই এড়িয়ে চলতো তবু এভাবেই সংবেদনশীল মন ব্যালেন্স করতে করতে খুকি বড় হয়েছেন , চাকরিও করেন প্রাইভেট ফার্মে । মাইনে অবশ্য খুব‌ই কম । মাইনে পেলে মানুষ সাপের পাঁচ পা দেখে । খুকিও ঘরের সব কাজ মায়ের ঘাড়ে ছেড়ে সারাদিন অফিস করেন , সন্ধ্যায় কবিতা লেখেন এবং রাত্রিতে ইনবক্সে চ্যাট করেন । এহেন খুকি সদ্য তিনশো তেত্রিশতম প্রেমে পড়েছেন । পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসাবে দিবারাত্র গালিব , রুমি , গুলজার পড়ছেন । ভুল হিন্দিতে অখাদ্য ও খাজা শায়েরি লিখে নিজের দেওয়ালে ঘুঁটে দিচ্ছেন । শুধু শায়রিতে লাইক টানা মুশকিল বলে সঙ্গে নেট থেকে মনোমুগ্ধকর ছবিও দিচ্ছেন । লোকে হামলে পড়ে  “ওরে , নারে , পিলে ছুঁয়ে গেল রে , শায়েরীবাসা নিস রে ” কমেন্ট করছেন । গর্বে খুকি সপ্তম স্বর্গে অবস্থান করছেন । সারারাত কবিতা লিখে প্রত্যাশিত প্রেমিককে পাঠাচ্ছেন । অর্শের রুগী প্রেমিক কবিতার ভয়ে রাত বারোটা বাজলেই অন্য কাজের অজুহাতে কেটে পড়ছেন এবং ফেক থেকে স্বমহিমায় অন্যান্য খুকিদের সাথে চ্যাট করছেন ।
    খুকির বাবা কমল মিত্র সমস্ত ঘটনা পর্যালোচনা করে অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে উঠলেন । তিনি রাশভারী মানুষ । তার মনে প্রথমেই যে ভাবনা এল তা হল এ মেয়ের বিয়ে দেবেন কী করে ?? আহ্ণিক গতির মতন‌ই অভ্যাসগত স্বতসিদ্ধ স্বভাবে তিনি বুঝলেন এর জন্য একমাত্র দায়ী খুকির মা ছায়াদেবী । সারাজীবন‌ই তিনি মেয়েকে শাসন করে ঠিকপথে আনতে ব্যর্থ হয়েছেন । সুতরাং মেয়ের মতিগতি ঠিক করতে তিনি নিজেই আসরে নামবেন ঠিক করলেন । স্ত্রী ছায়াদেবীকে বললেন , রবিবার বিকেলে আমি খুকির সাথে কথা বলবো । ওকে বোলো যেন তৈরি থাকে । তোমার মেয়েকে চাকরি ছাড়তে হবে । ওকে আমাদের পারিবারিক চপশিল্প তথা ফাস্টফুড কারখানার দায়ীত্ব নিতে হবে । আমার ম্যাজিস্ট্রেট বন্ধুর সিভিক পুলিশ ছেলের সাথে আমি ওর বিয়ে দেবো । ওকে বুঝতে হবে যে স‌ংসারটা ছেলেখেলা নয় । এখানে দায়ীত্ব না নিলে চলে না । কবিতা লিখে আর যাই হোক রোজগার হয় না । আমার মেয়ে হয়ে তাকে কবিতা লিখতে আমি দেবো না ।
    স্নেহান্ধ ছায়াদেবী শঙ্কিত হয়ে উঠলেন । পিতা পুত্রীর যুদ্ধে কোনো একজনের পরাজয় অবশ্যম্ভাবী । তিনি কাকে ছাড়বেন ? তার কাছে দুজন‌ই প্রিয় । রাশভারী স্বামী , ড্রেসিং গাউন পরা কমল মিত্রর সাথে তিনি কখনোই চোখ তুলে কথা বলেননি , এমনকী রাত্রিকালীন ঘনিষ্ঠ সময়েও তিনি ভয়ে চোখ বুজেই থেকেছেন। ওদিকে খুকি অত্যন্ত স্বাধীনচেতা । নিজ মর্জির মালিক । মায়ের প্যানপ্যানানির সাথে মশার পোঁওওওওওওওওওও গানের কোনো তফাত খুকি করে না । এখন ছায়াদেবী কী করবেন ? তিনি পৃথিবীর বঞ্চিত নিপীড়িত সর্বহারা মাতৃসমাজের প্রতিভু । তাও তো খুকির বাবা জানে না যে খুকি মাঝেমধ্যে রাত্রিতে একলা ঘরে মদ্যপান করে । জানলে কী হবে ভেবেই তিনি শঙ্কায় নীল হয়ে উঠলেন । শুক্রবার রাত্রে খুকিকে অনেক বোঝানোর চেষ্টা করলেন । খুকি পাত্তা দিলেন না । আজ তিনি কৃষ্ণনগর লোকালের মালিক ছোকরার কাছ থেকে আধখানা টিকটিকি কিনেছেন নেশার জন্য । টিকটিকি মেরে বড় কাতলা মাছের পেটে পুরে তিনমাস মাটির তলায় পুঁতে তীব্র বিষ তৈরি করে এই মালিক ছেলেটি । ঐ বিষের সামান্য নিলেই তীব্র নেশা হয় । মা কে ভাগিয়ে দরজা লাগিয়ে সেই নেশার পরখ করার জন্য উদগ্রীব হয়ে আছে সে । কাল দেখা যাবে যা হবে , দরকারে বাড়ি ছেড়ে দেবে , প্রেমিকটি তাকে বিখ্যাত শায়র গুলজার সাহেবের সাথে সাক্ষাৎ করাতে নিয়ে যাবে বলেছে । তেমন বুঝলে তাই করা যাবে খন । মায়ের ঘ্যানঘ্যানানিকে পাত্তা না দিয়ে খুকি দরজা বন্ধ করে টিকটিকির লেজ নিয়ে বসলেন ।
    পরদিন যা হ‌ওয়ার ছিল তাই হল । কমলমিত্র ও খুকির তরজায় বাড়ি উত্তাল হয়ে উঠলো । খুকি বিয়ে করতে অস্বীকার করে বললেন তিনি কবিতা লেখাকে পেশা করতে চান । ভাদ্রমাসের গরমে থ্রি পিস স্যুট পরে ঠোঁটের কোনায় মোটা হাভানা চুরুট ঝুলিয়ে কমলমিত্র  জানালেন কবিতা লেখা কোন পেশা হতে পারে না । তাঁর  বাড়িতে থেকে ঐসব করা চলবে না । খুকি জিজ্ঞেস করলেন ,
    ” আপনি কি চাইছেন আমি গৃহত্যাগ করি ?”
    কমলমিত্র নেভানো চুরুট দাঁতে চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন ,
    ” চাইছি না , বলছি ।”
    ছায়াদেবী আসন্ন বিপদের কথা ভেবে প্রমাদ গুনে খুকিকে শান্ত হতে বললেন । এও বললেন খুকি যেন ক্ষমা চেয়ে নেয় । কিন্তু খুকি জানিয়ে দিল কবিতা লেখা তার জীবনের বিলাসিতা নয় , নেসেসিটি । তিনি গৃহত্যাগ করলেন । আটপৌরে করে শাড়ি পরা ছায়াদেবী মেয়ের শোকে ঠাকুরঘরে হত্যে দিয়ে পড়লেন । খুকি সটান গিয়ে উঠলেন প্রেমিকের বাড়ি । প্রেমিক বিবাহিত , তিন সন্তানের পিতা , তবুও “বেঙ্গলি ম্যাট্রিমনি “, “পরকীয়া “এবং “ডিভোর্স চান প্রান বাঁচান ” নামক গ্রুপ গুলির অ্যাডমিন । ভাগ্যিস স্ত্রী হাফ ইয়ার্লির পর পুত্র কন্যাদের নিয়ে বাপের বাড়ি গেছেন । নাহলে অ্যাডমিন দাদাইয়ের মব লিঞ্চিং কেউ আটকাতে পারতো না । বাঁশ পিছনে গুঁজে প্রেমিক অ্যাডমিন খুকিকে নিয়ে র‌ওনা হলেন মুম্বাইয়ের উদ্দেশ্যে , কবি গুলজারের সাথে দেখা করাতে । বহু চেষ্টার পর গুলজার তাদের সাড়ে চারমিনিট সময় দিতে স্বীকৃত হয়েছেন ।
    যথাবিহিত সময়ে সাদা শাড়ি ও মিনিমাল মেক আপে জুঁইফুল সেজে খুকি গুলজারের বাড়িতে গেলেন । সঙ্গে গিলতেও পারেনা , ওগরাতেও পারে না প্রেমিক , মুখের ভাব কনস্টিপেটেড । গুলজারের বাড়ি দেখে খুকি হতাশ । তেমন কিছুই আহামরি নয় । গুলজার বারান্দায় বসে আছেন খালি গায়ে আসল বাংলাদেশী মন্টুর লুঙ্গি পরে এবং ঘ্যাসঘ্যাস করে পেট চুলকাচ্ছেন । সামান্য অভিবাদন ও পরিচয়ের মধ্যে তিনি একবার‌ও জুস্তজু , আহিস্তা , সুলঝনে , বহকনে বা মেহকতি শ্বাসে শব্দগুলির প্রয়োগ করলেন না । খুব খিঁচিয়ে কাকে যেন বাগানের গাছগুলিতে জল দিতে বললেন । খুকি দুচারটে কথা বললো , যেমন আমি আপনার ফ্যান ইত্যাদি । কবি হাসিমুখে বললেন ,
    ” আমার ব‌ই কিনে এনেছেন তো ? দিন স‌ই করে দি । “
    স‌ইসাবুদ হ‌ওয়ার পর হোটেলে ফেরার পালা । পথে প্রেমিক নিজের বৌ বাচ্চার কথা জানাতে বাধ্য হয়েছে কারন তিনদিনে বৌ তেত্রিশকোটিবার ফোন করেছে । খুকি প্রেমিককে লাথি মেরে হোটেলের রুমের বাইরে বার করে দিয়েছেন । গৃহত্যাগের ঠিক আটদিন পর খুকি বাড়ি ফিরে এসেছেন। ছায়াদেবী তাকে গোটা কাতলার মাথা দিয়ে মুড়িঘন্ট করে খাইয়েছেন । এই নভেম্বরে তার বিয়ে । সকলের নিমন্ত্রণ র‌ইলো । বিয়েতে চুয়ান্ন রকমের চপ থাকবে মেনুতে ।
    এই গল্পের সাথে জীবিত বা মৃত কোন ব্যক্তির মিল সম্পূর্ণ কোকিলতালীয় । সম্ভবতঃ গুলজার বা‌ংলা পড়তে পারেন না । পারলে ক্ষমা চাওয়ার মুখ থাকবে না ।

    Spread the love