মুড়িমুড়কি -তে সুজাতা রায়

    0
    8
    Spread the love

    হিপোক্রিসি 

    যখন প্রথম আমার বাড়ি এলো তখন ওর কতো বয়স হবে, দশ কি এগারো, সে আজ প্রায় কুড়ি বছর হলো। হাসু আর আমারহাসু মেয়ে একদম এক বয়সী, এমন কি জন্ম মাস টাও এক।আসতেই দুজনের বন্ধুত্ব একদম যাকে বলে জমে ক্ষীর। আমার মেয়ের একাকীত্বের ফাঁক গলে হাসু একদম অন্দরে ঢুকে গেল।ও হ্যাঁ, হাসু কে –তাই তো বলা হয় নি, হাসু হলো হাসুর মা এর বড়ো মেয়ে-আর হাসুর মা? সে হলো, সে-ই-ভোরবেলায় ইষ্ট নাম করার আগে যার নাম করি, এই পৃথিবীতে যাকে ছাড়া নিজের অস্তিত্ব ই কল্পনা করতে পারি না–সে।আর পাঁচটা অশিক্ষিত-অসংস্কৃত বাড়ির মতো আমরা কিন্তু ওকে মোটেই ‘হাসুর মা’ বলে ডাকি না–আদর করে ডাকি ‘বৌ’ আর আমার মেয়ের ‘বৌ মাসি’।
    তো হাসু যখন এলো আমার কন্যা টি তখন ক্লাস ফাইভ।ইস্কুলে না ভর্তি করলেও ঘরেই আদর্শ লিপি, বর্ণপরিচয় কিনে হাসুকে সাক্ষর করার চেষ্টা য় উঠেপড়ে লাগলাম।বেশ একটা সমাজ সেবা, সমাজ সেবা ভাব।কিন্তু কে শোনে কার কথা! যতই হোক পরের মেয়ে-কাজ করাতে পারি, মারতে তো আর পারি না; হালকা বকুনি দিয়ে (বেশি বকলে যদি পালায়), বুঝিয়ে ও কাজ হলো না-সে পড়বেই না-আমরা হাল ছাড়লাম।আমার কন্যা টি যদিও সময়মতো ইচ্ছায় হোক অনিচ্ছায় হোক টিফিন-জল-ব্যাগ নিয়ে ইস্কুল যেতে বাধ্য, হাসুই সব পরিপাটি করে গুছিয়ে দিতো।আমরা কিন্তু কক্ষনো ওকে পরের মেয়ে ভাবিনি,কক্ষনো না।খাওয়া-দাওয়া-শোয়া(না না শোয়াটা নয়)কক্ষনো দুই দুই করিনি।শোয়াটা কি আর পারা যায়? তবে হ্যাঁ তাই বলে একা ঘরেও শোয়াইনি, বাচ্চা মানুষ ভয় পাবে না?আমার মেয়ের কাছে ই মানে মেয়ে র ঘরেই মাটিতে বিছানা পেতে শুতো।
    শিশু শ্রমিক নিয়ে বড় বড় কথা বললেই তো আর হবে না-তখন বৌ প্রতি বছর পুত্র সন্তানের আশায় কন্যা সন্তানের মা হচ্ছে-এতোগুলো বাচ্চা খাবে কি? সরকার তো নিয়ম করেই খালাস।আমি ও প্রতিবছর মেটার্নিটি লিভ দিতে দিতে জেরবার।শেষকালে বোধহয় বৌ যতো না ছেলের জন্য ঠাকুর-দেবতার কান ঝালাপালা করতো তার চাইতে আমি বেশি করতাম।প্রতিবার মেয়ে হওয়ার পর ভস্মে ঘি ঢালা র মতো বৌ কে লাইগেশন করানোর জন্য দিন রাত বোঝাতে বোঝাতে টের পেতাম বৌ আবার সন্তান-সম্ভবা।অবশেষে পাঁচটি কন্যা র জন্মের পর বৌ বহু আকাঙ্ক্ষিত পুত্র সন্তানের জন্ম দিল; আমি বাৎসরিক মেটার্নিটি র হাত থেকে হাফ ছেড়ে বাঁচলাম।
    ইতিমধ্যে হাসু ষোড়শী হয়ে উঠলো।বাবুদের বাড়ির আলো-বাতাস-খাদ্য গুনে বয়সোচিত লাবণ্য লক্ষণ সব দেখা দিতেই বৌ বিয়ের জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়লো।আমার বিস্তর বাঁধা-আপত্তি সত্ত্বেও (সেটা কতোটা হাসুর অপ্রাপ্তবয়স্কতা, কতোটা ওকে ছাড়া আমার অন্ধকার দেখার কারনে জানি না) হাসুর বিয়ে হয়ে গেল। আমি যতোটা ফাঁপরে পড়বো ভেবেছিলাম-একটুও পড়লাম না-সৌজন্যে বৌ এর কন্যাকুল।হবে না? হাসুর বিয়েতে আমি যেভাবে পাশে দাঁড়িয়েছি তা কি ওরা দেখেনি? হাসু কি আমার মেয়ের চাইতে কম ছিল?(আরে এটুকু না করলে কি পরের মেয়ে গুলো কে পেতাম?)যাইহোক একটি করে আসে বছর পাঁচেক থাকে, বিয়ে হয়-আর একটি আসে।পাড়া প্রতিবেশী, আত্মীয় স্বজনের ঈর্ষার কারণ হয়ে আমিও ফুল্ল-কুসুমিত সংসার তরণী টি নিরুপদ্রবে উজান-ভাটায় তরতরিয়ে বাইতে থাকলাম।হবে না? আমার হাতে কাজের মেয়ের রেখাটি যে এক্কেবারে খাঁড়া উঠে গেছে,যাকে বলে তুঙ্গে বৃহস্পতি!
    কিন্তু হায় চিরদিন কাহারও সমান নাহি যায়!শেষপর্যন্ত শেষ কন্যা টিকে শ্বশুর বাড়ি রওনা করিয়ে দিয়ে বৌ হাফ ছেড়ে বাঁচলো আমি অথৈ জলে পড়লাম। বৌ এর বয়স হয়েছে, কৃতজ্ঞতা য় মায়ায় ছাড়তে পারে না-আসে।আমার ও বয়স থেমে নেই চিরদিন মাঝ নৌকায় বসে হাওয়া খেয়েছি, এখন বৈঠায় হাত লাগানোর দম ও নেই, ধক ও নেই।নিজের কপাল নিজেই চাপড়াই-চিরকেলে মাথামোটা আমি, কোন আক্কেলে তখন বৌ কে লাইগেশন করতে বলেছিলাম?একটা ছেলের কোনও মূল্য আছে? কথায় বলে-“এক পুত্রে আশ/নদী তীরে বাস।”আর দু চারটে মেয়ে হলে কোন মহাভারত অশুদ্ধ হতো?
    কদিন আগে হাসু এসেছিল দেখা করতে।বড়ো মেয়ে ক্লাস ফোরে পড়ে কিন্তু হাসুর মতোই-একদম পড়াশোনায় মন নেই।কিন্তু বিয়ে তো দিতে হবে–আমি হাসুকে মনে করিয়ে দিলাম ওর বিয়ে র ধুমধামের কথা।
    হাসু বুদ্ধিমতী।মেয়েকে দিয়ে গেছে।

    Spread the love