সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে গদ্যে অমিতাভ মৈত্র (গল্প – ১ ।। পর্ব – ২)

    0
    9
    Spread the love

    ক্রাচ, সূর্যঘড়ি ও সমুদ্র

    ২।

    মাঝরাতে তারায় ভরা আকাশের নিচে একটা ঘুমিয়ে পড়া সূর্যঘড়ি তার সময় খুঁজে বেড়ায়। সূর্য ডুবে যাবার পর তার সময় থাকে না কোথাও। সূর্যাস্তের পর মৃত্যুও আর ছুঁতে পারে না কোনো সূর্যঘড়িকে। রাতের সমুদ্রতীরে দাঁড়িয়ে সে দেখছে অনেক দূরের শান্ত শক্তিমান মোষের মতো জল ডাঙার দিকে এগিয়ে আসার সময় কিভাবে খুলে যাচ্ছে ঢেউয়ে ঢেউয়ে। কোনো নৌকো হয়তো কখনও ভাসিয়ে দিয়েছিল শক্ত প্লাস্টিকের কোনো লাল রঙের বল। হয়তো বিকেল তখন। মাঝরাত পর্যন্ত সেই বল একা একা যেমন খুশি খেলেছে। এখন বকুনির ভয়ে মুখ একটু লুকিয়ে ফিরে আসছে ডাঙায়। যেখানে ঢেউ খুলছে সেখানে এসে লাল বলের মনে হলো যেন সে পা রাখছে কোনো চলমান সিঁড়িতে। নিচের স্থির জল আর অনেক ওপরে মাটির স্থির অনড়তার মধ্যে শেষহীন, সীমাহীন হাজার সিঁড়ি খুলে যাচ্ছে, যেন দুই স্থির প্রান্তের মাঝখানে এক অনন্ত চলমান কিছু সে। বড়ো একটা ঢেউ সেই লাল বলকে সূর্যঘড়ির কাছে পৌঁছে দিয়ে যায়।
    অনেক দূরের কোনো সমুদ্রে, জলের নিচের অন্ধকার কোনো বিপন্ন প্রজাতির কিলার হোয়েল তার চারশো পাউন্ড ওজনের সদ্যজাত কন্যার মৃতদেহ মুখে নিয়ে সাঁতরে চলেছে উন্মাদের মতো। সতেরো মাস অপেক্ষা করেছিল সে সন্তানের জন্য। জন্মের কয়েকঘন্টা পরে তার চোখের সামনে মারা যায় তার শিশু। কিছু করতে পারেনি সে। আগের বারও এই অভিজ্ঞতা হয়েছিল তার। কিন্তু এবার সে মরীয়া এই শিশুকে বাঁচানোর জন্য। জলের ওপরে মৃত সন্তানকে মুখে তুলে ধরে সে সাঁতরে গেছে একটানা ছ’দিন। প্রতিদিন ষাট-সত্তর মাইল সাঁতরে পার হয়েছে সে। বৃটিশ কলোম্বিয়ার ভিক্টোরিয়া থেকে ভ্যাংকুভার গিয়ে সেখান থেকে স্যান জুয়ান আইল্যান্ড সেখান থেকে আবার কোনো নিরুদ্দেশে—যেন শেষহীন এক সাঁতার। যতবার মুখ থেকে পড়ে জলে ডুবে যাচ্ছে সন্তানের দেহ, জলের তলে নিজে নেমে সে তুলে আনছে। জলের ওপর মৃত শরীর তুলে ধরে জলের নিচে সাঁতার দিয়ে যাচ্ছে।
    মাঝরাতের সূর্যঘড়ি মুখ নিচু করে শোক জানাচ্ছে সেই মা কিলার হোয়েলকে। তাকে শান্ত করার চেষ্টা করছে, ঘুম পাড়াতে চাইছে।

    ৩।

    মাঝরাত্রে সমুদ্রতীরে দাঁড়িয়ে থাকা একা ক্রাচের দিকে বছর একান্নর বারবারা কুম্বস তার সাতাশি বছরের বাবার মৃতদেহ টেনে আনছে। বাবার বাড়ির বাগানে ব্যাকইয়ার্ডে কাজ করতে করতে একটা পরিত্যক্ত ঘরে ঢুকেছিল। এই ঘর তার স্মৃতি থেকে মুছে গেছে যেভাবে রক্তের দাগ মুছে যায় ক্ষত থেকে। কিন্তু আজ এই ঘরটি চলমান ছবির মতো মনে পড়িয়ে দিচ্ছে ছোট বেলার সেই তীব্র যন্ত্রণার স্মৃতিগুলো। এখন একই বাড়ির দুই প্রান্তে থাকেন বারবারা আর তাঁর বাবা। মা মারা গেছিলেন সন্দেহজনক ভাবে, যখন বারো-তেরো বছর বয়স বারবারার। মায়ের মৃত্যুর পর দরজা বন্ধ ঘরের ভেতর থেকে আসা ঝগড়ার শব্দ, চিৎকার, মাঝেমাঝে মায়ের তীক্ষ্ণ আর্তনাদে—এসব বন্ধ হয়ে এক নতুন শৃঙ্খলা এল বাড়িতে। আর বারবারার চোখের সামনেই সবরকম সভ্যতা ও সংস্কার থেকে মুক্ত তার বাবার নারকীয় জীবন শুরু হলো। ভয়ে বারবারা একদিন এই ঘরে এসে লুকিয়েছে। বাবা এলেন এবং সেদিনই প্রথম বাবার হাতে যৌন নিগ্রহের শিকার হল সে। এরপর সে হয়ে উঠল তার বাবার যৌনদাসী। যখন বাবা তাকে টানতে টানতে, প্রয়োজনে আঘাত করে, এই ঘরে নিয়ে আসতেন সারাটা সময় চোখ বুজে চিৎকার করে যেত বারবারা। বড়ো বাগানবাড়ির চৌহদ্দি ছাড়িয়ে বাইরে পৌঁছত না সেই কান্না। গর্ভবতী হয়ে পড়লো বারবারা। সন্তানের জন্ম হলো। জন্মের কয়েক ঘন্টা পরেই মৃত্যু হলো সেই সন্তানের। এরপরও দীর্ঘদিন একইরকম অবর্ণনীয় জীবন কাটাতে হয়েছে তাকে। শেষ পর্যন্ত তার ঠাঁই হয় উন্মাদ আশ্রমে, বছরের পর বছর সেখানে থাকতে হয়েছে তাকে। সময়ের সাথে পুরনো সেইসব দুঃস্বপ্নের স্মৃতি হারিয়ে গেছে তখন। অস্পষ্ট ভাবে মনে পড়তো বাবা মায়ের সাথে কাটানো চমৎকার স্মৃতিগুলো। পাগলা গারদ থেকে অবশেষে বারবারা ফিরে এলো তার পুরনো বাড়িতে। বাবাকে সে চিনতে পারে না আর। যোগাযোগ নেই আর দুজনের। মৃত মাকে শুধু খুঁজে বেড়ায় অন্যমনস্ক ভাবে। তারপর বন্ধ হয়ে যায় খোঁজ। সম্পত্তি থেকে রোজগার ছিল তার প্রয়োজনের অতিরিক্ত। মাঝবয়সের এক পূর্ব স্মৃতিহীন একা মানুষ—এর বেশি আর কী বা লাগে বাঁচতে?
    কিন্তু বাগানে কাজ করতে এসে হঠাতই আবিষ্কার করা ঘরে এক ধুলোভরা পুরনো বাক্স তাঁকে ফিরিয়ে দিল যা হারিয়ে গেছিল তাঁর। বাক্সের মধ্যে তিনি দেখালেন তাঁর নগ্ন ছবি, একটি সদ্যোজাত মৃত শিশুর ছবি, আর বেশ কিছু মহিলার আপত্তিকর ছবি। ঘর বন্ধ করে তিনি ফিরে এলেন মাথার ভেতরে আগুনের ঝড় নিয়ে। ঝড় স্থিমিত হয়ে এল একসময় আর তাঁর মনে পড়ে গেল সব। তীব্র ঘৃণা জন্মালো বাবার ওপর। প্রতিশোধ নিতে চাইলেন। আবার এটাও সাথে সাথে মনে হল, বয়সের কারণে যে লোকটা ছুঁয়ে আছে মৃত্যুর চৌকাঠ, তাঁকে ক্ষমা করে দিলেই বা ক্ষতি কি? তারপর মনে হল এই অন্যায়টা সবার জানা দরকার। আর তার জন্য আগে মৃত্যু দেওয়া উচিত তাঁর বাবাকে। রাত্রে বাবার ঘরে গিয়ে ভারি বেলচার আঘাতে বাবার মাথা প্রায় থেঁতলে অন্ধকারে সেই মৃতদেহ টেনে এনে রাখল বারবারা সেই আধোজাগ্রত সূর্যঘড়ির পাশে, রাত্রিবেলা যে আর সময়ের রক্ষক থাকে না। যার অপাপবিদ্ধ জাদুঘরে কিলার হোয়েলের মৃত সন্তান আর নিজের মেয়ের হাতে মরে যাওয়া এক ধর্ষক বাবা পাশাপাশি রাখা থাকবে সমান গুরুত্বের সঙ্গে।

    ৪।

    কথা বলা যায় না এই সমুদ্রের সাথে। যেন মাছের জালের নৌকার নিচে করজোড়ে পড়ে আছে যৎসামান্য জলের এই সমুদ্র। এত সংক্ষিপ্ত, যে আঘাত করতেও মায়া হয় একে। এখানে কেউ তৃষ্ণার্ত হয় না। কারো কোনো প্রশ্নও নেই এখানে। তবু অতল কোনো কুয়োর আঁধার থেকে যেন গভীর সর্বগ্রাসী কোনো উত্তর হয়ে একবার মাত্র বেজে ওঠে ঘন্টার শব্দ—যা চাপা গুমগুমে অশুভ কোনো ঘোষণা মতো, বা কোনো অবসানের সংকেতের মতো।
    তখন ভেতর পর্যন্ত নষ্ট হয়ে যাওয়া বালির স্তূপ আর ভেতর পর্যন্ত একা হয়ে যাওয়া একটা কুকুর আকাশে মুখ তুলে কোনো মহান শূন্যতার উদ্দেশ্যে তাদের নিঃশব্দে ভয়ার্ত চিৎকার পৌঁছে দেয়।

    সমাপ্ত


    Spread the love