গদ্যে প্রকল্প ভট্টাচার্য

    0
    9
    Spread the love

    সমরবাবুর সমস্যা

    সমরবাবু লোক ভালো।  মিশুকে স্বভাব, মজাদার কথাবার্তা বলেন, আড্ডার সময় বন্ধুদের চা-মিষ্টি খাওয়াতেও কার্পণ্য করেন না। হঠাৎ সেদিন শুনলাম তাঁর দশ বছরের পুরোনো চাকরিটি চলে গেছে। প্রায় রাতারাতিই।
    অচেনা কেউ হলে ভাবতাম নির্ঘাত কোনো ঘাপলা করেছেন। কিন্তু লোকটা সমরবাবু বলেই কৌতুহলটা বেড়ে গেছিল আমার। এতবছরের চাকরি থেকে তাঁকে এইভাবে ছাড়িয়ে দেওয়ার কী কারণ থাকতে পারে, ভাবতে ভাবতে আমার পেট ফুলে গেল, ঘুম উড়ে গেল, শেষে একদিন থাকতে না পেরে সোজা চড়াও হলাম সমরবাবুর বাড়ি।

    চা পর্ব মিটতেই ভণিতা না করে জিজ্ঞেস করলাম, “আচ্ছা দাদা, আপনার চাকরিটা…”

    সমরবাবু একটু চুপ করে থাকলেন, তারপর বললেন, “খুলেই বলি, আমার একটা সমস্যা আছে।  বেশ ভালো রকম সমস্যা। তা নিয়েই এতদিন চাকরিটা বজায় যে ছিল, সেটাই আশ্চর্যের।”
    আমি তো ভেবে কুলকিনারা পাচ্ছি না।  কী এমন সমস্যা থাকতে পারে দাদার!
    -“ইয়ে, মানে, শারীরিক কিছু অসুবিধা ? তাহলে চিকিৎসা…”
    -“আরে না না সে সব নয়। সমস্যাটা মনে।  “
    সেরেছে।  মানসিক রুগী নাকি! ফিট-টিট হয়ে গেলে তাও ভালো, কিন্তু যদি কামড়ে দেন!

    আমাকে জড়োসড়ো হয়ে বসতে দেখে সমরবাবু বুঝতে পারলেন আমার চিন্তাটা। হা-হা হেসে বললেন, “আরে ভয় পাচ্ছেন কেন, মাথা-টাথা খারাপ হয়নি আমার।  দাঁড়ান, তাহলে আপনাকে গোড়া থেকেই বলি।”
    “আমি চাকরি করতাম একটা বিজ্ঞাপন সংস্থায়।  কাজ ছিল ক্যাচলাইন বানানো। ওই যে তরতাজা কোম্পানির মাখনের অ্যাডটা খুব জনপ্রিয় হয়েছিল, ‘এমন টেস্টি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি!’ সেটা আমারই বানানো ছিল। তারপর প্রিয়া জলের বোতলের ক্যাচ লাইন ‘কেবল প্রিয়ার পানি গ্রহণ’ সুপারহিট হলো।  অসুবিধা শুরু হলো তারপর থেকে।”
    -“অসুবিধা? কিসের অসুবিধা?” থাকতে না পেরে প্রশ্ন করলাম আমি।

    “সেটাই তো বলছি! তারপর থেকে আমার বস আর সহকর্মীরা আমাকে এড়িয়ে চলতে শুরু করলো। আমি নাকি সব কথাই পেঁচিয়ে বলতাম। আসলে যত কাজের চাপ বাড়তে লাগলো, আমাকে সারাক্ষণ নতুন নতুন ক্যাচলাইন চিন্তা করতে হতো।

    দরজায় যেখানে ‘এক্সিট’ লেখা ছিল, আমি সেটা বদলে করে দিলাম ‘ওয়ে টু গো!’ যাতে আরো পসিটিভ লাগে।  তারপর পার্কিং থেকে গাড়ি বেরোবার রাস্তায় লিখলাম ‘কার্গো’…

    -“সেকি! কিন্তু কার্গো মানে তো…”
    -“হ্যাঁ সেটাই তো! বস ভুরু কোঁচকালেন। তারপর ওয়াশ বেসিনের ওপরে লিখলাম ‘মুগ্ধ’, এতেও বস খুশী হলেন না মোটেই।  তারপর একটা ট্রাভেল এজেন্সি থেকে কাজ এলো, ওদের ইতালি-রোম বেড়াতে যাওয়ার।  আমার জুনিয়ার লিখেছিল ‘অল দা রোডস লিড টু রোম’ সেটা আমি একেবারে নাকচ করে বললাম, মৌলিক কিছু চাই! সাজেস্ট করলাম, ‘রোম হর্ষক যাত্রা!’
    -‘এটা তো বেশ নাম! বা:!’
    -“কিন্তু আবার ভূতে পেল, তাই ফাইনাল প্রিন্টিং এর ঠিক আগে ক্যাচলাইন বদলে করে দিলাম ‘চ-রোম ভ্রমণ!’ ব্যাস, ক্লায়েন্ট অর্ডার ক্যানসেল করে দিল। “
    -‘সেকি!’
    -“হ্যাঁ ভাই।  কিন্তু উল্টে আমিই ওদের গালি দিয়ে বললাম, শিককাবাবের টুকরো। ..
    -এটা আবার কেমন গালাগাল!
    -মানে, ‘বেরো শিক’ আর কি।  তখন এইচ আর ম্যানেজার এলেন আমাকে বোঝাতে. আমি তাকে বলে দিলাম, ‘আপনি আর কী বোঝাবেন, আপনার কাজ রিসোর্স নিয়ে, আর এদিকে রিসোর্সের মধ্যেই ভূত! ‘ ব্যস, হয়ে গেল!
    -চাকরি চলে গেল!
    -গেলো।  উনি রিপোর্ট দিলেন, আমার মানসিক অবস্থা চাকরি করবার মতো নয়, তাই অবিলম্বে…
    -শুনে খারাপ লাগলো দাদা।  কিন্তু একটা কথা, এই যে এতক্ষণ আপনি আমার সঙ্গে কথাবার্তা বললেন, সে তো একেবারে স্বাভাবিক! মানে, কোনোরকম প্যাঁচ পয়জার…
    আবার হা-হা করে হাসলেন দাদা।  “ঠিক।  মনে হয়, চাকরির চাপটা চলে গিয়েই এখন স্বাভাবিক চিন্তা করতে পারছি। “
    -তাই তো বলি, ওটা ছিল আপনার নারকেল চেহারা, তাই না দাদা?
    -নারকেল? ও-হো, না রিয়েল? হা-হা-হা, ভাই, আমার অফিসে ভ্যাকেন্সি আছে, অনেকগুলো সুপারি, মানে সুপারিশ করবো নাকি!! হা-হা-হা!!

    Spread the love