ফিল্ম -এ- মেহেফিল, জহিরুল কাইউম ফিরোজ 

0
13
Spread the love

সার্চিং : প্রযুক্তির কাছে সম্পর্কের পরাজয়

প্রযুক্তির উৎকর্ষের ফলে পৃথিবীজুড়ে প্রতিনিয়ত যে বিপ্লব ঘটছে তার সবকিছুই আমাদের অনুকূলে, এমনটি ভাবা নিছক বোকামি বৈ কিছু নয়। বরঞ্চ বলা যায় এতে তৈরি হচ্ছে দূরত্ব, প্রযুক্তির কাছে হেরে যাচ্ছে সম্পর্কের সত্যিকার আবেদন। যা কখনো কখনো ধারণ করে ভয়ানক রূপ। ২০১৮ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ইন্দো-আমেরিকান চলচ্চিত্র “সার্চিং” চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে সেসবের একচ্ছত্র।
জন্মের পর শিশুর প্রথম ডাকতে শেখা থেকে শুরু করে হাঁটতে শেখা, মায়ের রান্নাঘরে উঁকিঝুঁকি, বাবার জন্মদিনে সারপ্রাইজ দেয়া। এসবেই নয়। ফার্স্ট ডে এট স্কুল, পিয়ানোতে প্রথম সুর তোলা; মেয়ের সঙ্গে যাবতীয় অনুভুতিগুলিকে স্মৃতির ফ্রেমেই নয় শুধু, প্যাম (সারা সন) ও ডেভিড কিম (জন চো) দম্পতি ক্যামেরার রিলে তুলে রাখেন। স্থিরচিত্রে, ভিডিওটেপে। প্রিয়তমা স্ত্রীর মৃত্যুর পর সেসবের আবেগ, আবেদন বেড়ে যায় কয়েকগুণ।
বাবা মেয়ের কথা হয় রোজ। আড্ডা, সারাদিনের ফিরিস্তি, সময়মত খোঁজ নেওয়া। মা হারা মেয়েকে যেন মায়ের অভাব বুঝতেই দেন না স্নেহময় পিতা। হুমায়ূন আহমেদ বলেছিলেন যেমন, পৃথিবীতে অসংখ্য খারাপ মানুষ থাকলেও একটাও খারাপ বাবা নেই’। এতকিছুর পরেও এক রাতে বান্ধবীর বাসায় গ্রুপস্টাডি শেষে ঘরে ফিরে না মেয়ে মার্গো কিম (মিশেল লা)! সকাল হতেই মাথায় চিন্তার পাহাড় জমতে শুরু করে বাবা ডেভিড কিমের। সকাল থেকে? মেয়ে তো নিখোঁজ রাত থেকেই, তাহলে? বাবা মেয়ে একই ছাদের নিচে থাকে, তবে কথা হয় স্রেফ অনলাইনে। চ্যাটিং আর ভিডিও কলে। প্রচন্ড ব্যস্ত জীবনযাত্রায় একত্রে বসে কিছুক্ষণ সব ছেড়ে নিজেদের নিয়ে মেতে থাকার সময় হয় না কারোই। মেয়ের কলেজ, পিয়ানো ক্লাস সবকিছুর ফি ডেভিড ট্রান্সফার করে মার্গোর অ্যাকাউন্টে, টাকা চাইবার ছলেও তাই কথা হবার নূন্যতম সুযোগটুকুন নেই। মেয়ের কোন বন্ধুকেও এমনকি চিনে না ডেভিড!
রাতেই মার্গো বলেছিল গ্রুপস্টাডি শেষে বান্ধবীর বাসায় থেকে যাবে। ঘুমোতে যাবার আগে কল, মেসেজের রিপ্লাই না পেয়ে ডেভিড শুয়ে পড়ে। সকাল গড়ায়, সময় গড়ায়, কম্পিউটার স্ক্রিনে চোখজোড়া আবদ্ধ রাখলেও মেয়ের চেহারা ভাসে না। হঠাৎ তার নজরে আসে মার্গো ওর ল্যাপটপ রেখে গেছে ঘরে। সম্ভাব্য সর্বত্র খোঁজ নেওয়ার পর পুলিশে জানালে ডিটেক্টিভ ভিক (দেব্রা মিসিং) দায়িত্ব পায় এই কেসের। শুরু হয় তদন্ত। অফলাইনে পুলিশ, অনলাইনে ডেভিড।
ল্যাপটপে একের পর এক ট্যাব ওপেন হতে থাকে, আর নিজের ভুল ভাঙ্গতে শুরু হয় ডেভিডের। মেয়ের সর্বোচ্চ খেয়াল রাখা, তাকে জানাশোনা সবকিছুই ভুল! মার্গো কিম সমন্ধে তার বাবা ডেভিড কিম যে একদমই কিচ্ছু জানে না। বরঞ্চ মার্গোর চাচা পিটার (জোসেফ লি) জানেন অনেককিছু! ই-মেইল, ইন্সটাগ্রাম, ফেসবুক ঘেঁটে ডেভিড বুঝতে পারে মাতৃহারা মেয়ের একাকীত্ব কতখানি! পিয়ানো ক্লাসের কথা বলে এতদিন নিয়ম করে নিতে থাকা টাকার এক কানাকড়িও যায়নি সেখানে, পিয়ানো শেখাই বন্ধ করে দিয়েছে ছ’মাস আগে! মার্গো কি জড়িয়ে যায় কোন মাফিয়ার জালে? চাচার সঙ্গে কি এমন কোন সম্পর্কে জড়ায় সে যা সমাজ মেনে নেবে না?
ডিটেক্টিভ ভিক নিজের মতোন সাধ্যের সর্বোচ্চ দিতে থাকেন। একের পর এক অভিযান, বাদ দেন না অনলাইন হতে প্রাপ্ত কোন লোকেশনের একচুলও। ডেভিড কিমের পরিণতির সঙ্গে কোথাও যেন তারও মিল আছে। তার একমাত্র ছেলেটাও ঠিক মার্গোর গল্পের পুরুষ চরিত্র। একজন পুলিশ হবার আগে তিনি একজন অভিভাবক! কেসটায় তাই নিজেকে দেখতে পান ভিক।

এক রাত্তিরে এভাবেই খোঁজ নিতে নিতে ডেভিড জানতে পারে মার্গোর লোকেশন। তড়িৎ ভিককে জানালে পুলিশ নিয়ে বেরিয়ে পড়ে ওরা। শহর থেকে দূরে, নিবির জঙ্গল, পাশে গিরিখাদ, নদী বয়ে যাচ্ছে। মার্গো কোথায়? কি হলো তার? মাফিয়ার বেড়াজালে আটকে গেল? তার গাড়িতে যে পুলিশ অনেকগুলো টাকাভর্তি ব্যাগ পায়। পালাচ্ছিল সে?

অসংখ্য প্রশ্নের জন্ম দিয়ে এক পলকে গোটা গল্প ইউটার্ণ নেয়! পুরো সিনেমাজুড়ে আক্ষরিক অর্থেই আপনার দৃষ্টি আবদ্ধ থাকবে কম্পিউটার স্ক্রিণে। মুভির তিন চতুর্থাংশই কম্পিউটারে খোঁজাখুঁজির খেলায় মত্ত। না, এতটুকু বিরক্ত হবার জো নেই। সকলের ন্যাচারাল অভিনয়, হালকা আবহের ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকে উল্টো উৎকন্ঠিত হবেন। সাদামাটা এক মুভি কখন যে থ্রিলারে পরিণত হবে টেরই পাবেন না। পরিচালকের কেরামতি তো সেখানেই। শেষটায় আপনার সামনে অনেকগুলো প্রশ্ন দাঁড় করিয়ে দিবে। যেসব প্রশ্নের উত্তর জানা থাকলেও প্রযুক্তির ডাকে সাড়া দিতে গিয়ে কারো সঙ্গে সেসব ভাগ করে নেবার ফুরসত আমরা পাই না!

পরিচালক আনিশ চ্যাগান্তির এটি প্রথম ছবি। মিষ্ট্রি, থ্রিলার ঘরানার ছবিতে দারুণ সোশ্যাল মেসেজ দিয়েছেন তিনি। আইএমডিবিতে ৭.৭ এবং রটেন টম্যাটোজে ৯২% মার্ক, মাত্র ১ মিলিয়ন বাজেটের সিনেমাটির ৭৩.৭ মিলিয়ন আয় প্রমাণ করে দর্শক এবং সমালোচক সকলে সাদরে গ্রহণ করেছেন এই চলচ্চিত্রকে।


Spread the love