গদ্যে যশোধরা রায়চৌধুরী

    0
    11
    যশোধরা রায়চৌধুরী কবি ও গদ্যকার। বর্তমানে ভুবনেশ্বরের প্রিন্সিপাল অ্যাকাউন্টেন্ট জেনারেল।
    Spread the love

    মিস্টার অ্যান্ড মিসেস ফেকু

    ধন্য আপনারা। এক্ষণে বঙ্গভূষণ, বঙ্গবিভূষণ, বঙ্গ-অতিবিভূষণ যদি কেহই থাকিয়া থাকে তো সে ফেসবুক অর্থাত ফেবু নামক বিপুল বারিধিতে নৌকালীলা করা কলির কেষ্ট ফেকুগণ।

    যদি আজ বৎসরের শেষদিন হয় তো ফেকুদের মহোৎসব। মহোত্তম হৈহৈবৃন্দের লম্ফঝম্প। যুবত্বকালের এক বৎসর গেল দেখিয়া যুবক যুবতীরা বিষণ্ন হইলেন, কিন্তু যাহারা কেক বিস্কুট খাদ্যমদ্যাদির কাঙাল, অকেশন পাইলেই পার্টি করেন তাঁহারা দিনটির বড়ই আদর করিলেন। তবে ফেকু বলিয়া, আসলে ক্যাশবাক্সে হাত পড়িল না রাশি রাশি খাদ্যমদ্যের ফ্রি ডাউনলোড করিয়া পোস্ট করিতে লাগিলেন । কেহ জানিল না ট্যাঁকে কিছু নাই, বাড়িতে মুড়ি চিবাইয়া আছেন। নেট হইতে ভাল কেকটা, ভাল শ্যাম্পেনটা , আশটা ছবি হইয়া দেওয়ালে ঝুলিতে লাগিল।

    এক্ষণে আমরা এজ অফ ইমেজেস এ আছি। ছবিসর্বস্ব জীবন। সেকালে বিছানার মাথার কাছে পয়ঁতাল্লিশ ডিগ্রি হেলানো অবস্থআয় মা কালী, পিতৃদেব, পিতামহ ও অন্য অন্য ঠাকুরগণের চিত্র ঝুলিত, সবুজ ছ্যাঁতলাপড়া দেওয়ালের গায়ে আহা কী শোভা দেখিতাম। আপাতত আমাদিগের ফোনে, ট্যাবে, ল্যাপটপে সর্বত্র ছবি ঝুলিতেছে। কালীপূজার কালী, দুর্গাপূজার দুর্গা, ফ্যাশনসপ্তাহের ঠ্যাংবাহির করা মডেল, গরমের আইসক্রিম, শীতের বনভোজনের আলুরদম, বর্ষার জলভরা ডাবের খোলা… সবই ছবি হইয়া ঝুলিতেছে।

    আর আমরা ঝুলিতেছি, চীঈঈঈঈঈজ। অর্থাত ছবি তুলিবার পোজ, হাসি মুখ, দন্তবিকশিত মুখব্যাদানে জীবনের তাবত দুঃখ বাতিল , যেইভাবে টাকা না থাকিলেও, চকচকে জামা পরিলে টাকার অভাব খানিক পুরে, সেইরূপ আনন্দ না থাকিলেও, চকচকে হাসিলে , সে হাসিমুখ ওয়ালে, ওয়ালপেপারে লাগাইলে মনের দুঃখ খানিক পুরে। খানিক ঢাকা থাকে। বাহিরে প্যান্টুলুন, ভিতরে ছুঁচোর কেত্তনের ন্যায় ফেকুগণের সব দুঃখ, সব বেদনা, সব দারিদ্র্য চাপা পড়িয়া যায় কেবল এই ছবির দৌলতে।

    গরমের ছুটিতে বেড়াইতে যাইতে রেস্তর অভাব? পকেট ঢু ঢু? তাহাতে কি? সার্চ করিয়া সুইজারল্যান্ডের চিত্র টাঙাও। গ্রীষ্মাবকাশের বদলে দৃশ্যাবকাশ রচিত হইল। মদ খাইবার টাকা নাই, মকটেল নামক ঝুঠা সবুজ রঙ পানীয় লম্বা গেলাসে লইয়া পোজ দিয়া ভাব করিতেছ, পৃথিবীর সবচাইতে মাতাল তুমি ও তোমার বয়ফ্রেন্ড? তা বটে, আজিকালি মদালসা নারীর চাহিতে মজালসা নারী অধিক লাইক প্রাপ্তা হয়।

    ফেকুগণ কথায় কথায় রাশি রাশি আমোদ করে, রাশি রাশি লাইকপ্রাপ্ত হইয়া দেখায়ঃ দ্যাখো আমি কত ভাল দেখতে। দ্যাখো আমি কী অপূর্ব শাড়ি কিনিয়াছি। দ্যাখো আমি কত ভাল সাজিতে পারি। দ্যাখো আমি কত সুন্দর পোজ দিতে পারি। দ্যাখো আমির কোন শেষ নাই। দ্যাখো আমি কী চমৎকার ফোটো তুলিতে পারি। আমার তোলা ফোটোই না দেখিতেছ! দ্যাখো আমি কী ভাল রাঁধিতে পারি। এই তোমাদের পোলাও রাঁধিয়া ছবি ট্যাগ দিলাম। দ্যাখো আমি কত ভাল ঘর সাজাই। দ্যাখো আমার বইয়ের তাকে কত দেশ বিদেশের বই, আমি কত বিদ্বান। দ্যাখো আমি দ্যাখো আমি দ্যাখো আমি।

    ফেবুর আর এক ফেকু হইল কথায় কথায় কংগো, কংগো, কনগ্রাচুলেশনের বন্যা। তবে ফেসবুকের আমোদ শীঘ্র ফুরায়, অভিনন্দনের অকেশনও পরদিবসে বাসি পচা গলা ও ধসা হইয়া যায়, ক্রমে একই পোস্ট তেতো হইয়া পড়ে, টাটকা অকেশন টাটকা –টাটকা থাকাই ভাল।

    হায়! কি দিনকাল পড়িল। ফেকুতে ফেকুতে ফেবু ছাইয়া গেল । ফেক আইডেন্টিটি, ফেক নাম, ফেক প্রোফাইল, ফেক ছবি। সব ফেক জানিতাম, এমনকি কলিযুগে ভালবাসা, প্রেম স্নেহ মমতা বন্ধুত্ব। কথার কথা বলিয়া দেশ উজাড় হইয়াছে ফেকু আবগে। তাও সহিতাম । শেষে দেখি, আর এক নতুন ফেকের ভেক। লেখক হইয়াছেন সব। ফেবুতে ফেক লেখা… প্রচুর, প্রভূত সাহিত্যের নামে পুরাকীর্তির ন্যায় প্রধান প্রধান সাহিত্যপুস্তক হইতে হস্ত লাঘব। অসংখ্য ছোট বড় পত্রপত্রিকার ই-ভার্শান। অর্থাত কাগজ নাই কলম নাই, শুধু মাউজ হাতে লইয়াই লেখক। টাকা চাইনা, কেবল ইন্টারনেট চাই। কীবোর্ড খুটখুটাইয়া লেখক বনিয়া যাইতেছে সদ্যোজাত বালকবালিকাগণ … বৃদ্ধ-প্রৌঢ়েরাও কম যায় না। সকল ফেকুগণ মহা মাতব্বর। লিখিলেই সারি সারি লাইক, বুড়া আঙুল উঁচাইয়া। আর ওয়াহ, অসাম, দারুণ , অসাধারণ, কী সুন্দর , আহা… । কমেন্টের বন্যা। ঝোপ বুঝিয়া কেবল কোপ মারনের অপেক্ষা। তক্কে তক্কে থাকিয়া মধ্যরাত্রে নোট পয়দা করিয়াছে, গাজর!… লিখিয়াছে, গেটক্র্যাশ গাজরেরা আজ সব মিছিলে শামিল অলীক তন্তুবায় বুনে যাচ্ছে মিহি সারিগান অতিকায় হস্তীযূথ ঢুকে পড়ছে স্বপ্নের মহলে কড়ায় গন্ডায় আজ বুঝে নেবে অসীম শাসন…।

    আহা, কী হাততালির আওয়াজ। সারি সারি অদৃশ্য সিটে ভর্তি জনতা … শ্রোতা ও দর্শক। অলীক , ভার্চুয়াল। তাহারা তালি মারিতেছে আর কবি লেখা পয়দা করিতেছে। পয়সা লাগে না। না লিখিতে, না তালি মারিতে। যদি প্রতি লেখা পোস্ট করিতে দু টাকা, আর প্রতি লাইক দিতে কুড়ি পয়সা ফাইন হইত তবে বুঝিতাম কত ধানে কত চাল!

    প্রথমে এই ফেকুদিগকে আমিও চিনিতে পারিনাই। এইরূপ ফেকুসাহিত্যকারীগনের কার্যকলাপ হইতে অসাবধান পাঠক আমি, শুরু হইতে শেষ পর্যন্ত ভাবিয়া গিয়াছি, উহারা যাহা লেখেন তাহাই সৎ সাহিত্য। উহাদের সাহিত্যচেতনা, উহাদের জগত, উহাদের লেখালেখি, উহাদের দ্বারা যতটুকু ভালবাসা সম্ভব … তাহা বিক্রয়ের আসরটি এবে চিনিয়াছি। এ যে কী জিনিশ। সবের প্রতি আজ জানাই ক্ষুরে খুরে নমস্কার। আজ আমার চক্ষুর উন্মীলন ঘটিয়াছে। অনেক ঠকিয়া আজ আমি চিনিয়াছি আপনাদিগকে। আপনারা ধন্য।

    নিচে দিলাম কয়েক ফেকুর কার্যকলাপের বিবরণ, পড়িয়া পাঠক হও অবধান, সাবধান। এক ফেকু মহাশয় প্রথমে বড় মানুষের বাড়ির রবিবারের আড্ডায় স্রেফ হাজিরা দিতেন, বড় বড় পন্ডিতগণ সেখানে কথা বলিতেন, ফেকুবাবু শুধু হাঁ-টা হুঁ-টা দিতেন। বা, মুখে কিছু না বলিয়া, কেবলি ঘন ঘন মাথা নাড়িতেন। সেখানে পাত না পাইয়া এখন আর বাড়ি হইতে বাহিরান না। অনেক সহজ হইল , বাস ভাড়া নাই, পাটভাঙা জামাটি পরিবার কসরত নাই, হাঁটিয়া স্টপ হইতে বড়মানুষ দাদার বাড়ি যাওয়ার ঝামেলা নাই। বাড়ি বহিয়া গিয়া দুইচারিটা গালাগাল খাওয়া নাই। এখন ফেবুতে ঢুকিয়া মহাশয় সকাল সকাল বসিয়া পড়েন। আড্ডা মারেন, চ্যাটান। আর সাহিত্য গ্রুপ ভিজিট দ্যান। আপাতত নানা গ্রুপে হাজিরা দিবার ফলে, বিশেষ কিছু কিছু অন্য অন্য ফেকুগণের লেখায় লাইক দিবার ফলে, আর অন্য গ্রুপের কারো কারো পোস্টে আগু বাড়াইয়া গালি দিয়া, সমালোচনার নামে ঝগড়া করিয়া আসিবার ফলে, গ্রুপ মডারেটরগণের সূক্ষ্ম বিবেচনায়, জনৈক ফেকু সম্পাদকের সুপারিসে ও জনৈক বড়দার কৃপায় নিজেই পন্ডিত হইয়া পড়েন। এখন নিজে তিনি গল্প, কবিতা ও মুক্তগদ্য লিখিয়া পোস্ট দেন যথাসম্ভব বেশি সংখ্যক লাইক পান, ছিপ ফেলিয়া সকাল হইতে ফেবুতেই বসিয়া থাকেন। কসরতের মধ্যে শুধু মাঝে মাঝে উঠিয়া গিয়া বইয়ের তাক হইতে এক আধখান কোটেশনের বই নামানো আর ঝাড়িয়া দেওয়া। ঐটুকু না করিলে ভয় আছে। শুনিয়াছেন কোন এক বাবু সারাদিন কম্পিউটারের সম্মুখে বসিয়া থাকিয়া থাকিয়া শেষ অবধি মহাপুরুষের ন্যায় হইয়া গিয়াচেন। ধ্যানস্থ হয়ে ফেসবুক করেন, গায়ে বড় বড় অশোথগাছ ও উইয়ের ঢিপি হয়ে গিয়েছে!

    আর একজন ছিলেন, রোজ সকালে বঙ্গভাষার ব্যাকরণের গুষ্টির তুষ্টি করিয়া কবিতায় স্ট্যাটাস দিতেন। সবাই বাহা বাহা করিতেন। একদিন খেয়াল করিলেন, স্ট্যাটাস তো দিনগত পাপক্ষয়ের ন্যায় ক্ষয় পাইয়া যায়। তাই, সব স্ট্যাটাস একত্র করিয়া বই করিবেন, এই মানসে “ স্ট্যাটাস-সমগ্র” বাহির করিবেন ভাবিতেছেন। ইহাই তাঁহার জীবনের হাই পয়েন্ট হইবে।


    Spread the love