গল্পতরু -তে অভিনন্দন মুখোপাধ্যায়

0
10
বাড়ি- মেদিনীপুর শহর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ- সিলভার লাইনিং, লাভ ক্যাপুচিনো(যৌথ), এ জীবন ক্রিকেট-লিখিত প্রকাশিতব্য কাব্যপুস্তিকা - পর্ণগ্রাফিত্তি মূলত কবিতা ও প্রবন্ধ চর্চাকারী। এই গল্পটি প্রথম প্রকাশিত গল্প।
Spread the love

ঘূর্ণি

১.

জ্বরটা কাল বিকেলেই ছেড়ে গেছে হিন্তুকে। তবে চিহ্ন রেখে দিয়ে গেছে খুব প্রখর ভাবেই। শরীর ভীষণ দুর্বল। মাথা টলমল করছে।

আজ নিয়ে চারদিন হলো কলেজের দিকে পা বাড়ায়নি হিন্তু। আজ কলেজ যেতে চেয়েছিল কিন্তু মা যেতে দেয়নি। হিন্তু হেসে মা কে বলেছিল, “ আমাকে কি তোমার এতই শক্তিহীন লাগে? আর জোর তো আসল মনের। ওটা আমার যথেষ্ট আছে”।

মা  মিষ্টি করে হেসে মাথায় হাত বুলিয়ে বললো “ নিজেই তো শুনলি ডাক্তার বলেছে আজকের দিনটা রেস্ট নিতে। একদম সুস্থ হয়ে যাবি না হয়”।

হিন্তু আর কথা বাড়ায়নি। বাবা মারা যাওয়ার পর মায়ের কথার অবাধ্য খুব একটা হয় না ও। বাবার যাওয়াটাও তো একটা আকস্মিকতা ছিল।তখন হিন্তু ক্লাস নাইন। সুস্থ মানুষটা অফিস থেকে ফিরে চা খেয়ে সোফায় বসে “আমার শরীর টা কেমন লাগছে” বলতে বলতে চোখ উলটে গিয়ে প্রচন্ড গোঁ গোঁ শব্দ করে হঠাৎ নিশ্চুপ হয়ে গেল। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সময় পাওয়া যায়নি।

শ্রাদ্ধ শান্তি মিটে যাওয়ার পর বাবার কাগজপত্র  নেড়েচেড়ে দেখতে গিয়ে একটা মাস তিনেক পুরানো প্রেসক্রিপশন পাওয়া গেল। ফ্যামিলি ফিজিশিয়ানের কাছে ওটা নিয়ে গেলে উনি দেখে বলেছিলেন “এ তো হার্টে ব্লকেজ ছিল প্রায় ৭০%। আর যা দেখছি এই ডাক্তার ওনাকে মাস খানেকের মধ্যেই অপারেশনে যেতে বলেছিলেন। উনি আপনাদের কিছু বলেননি?” অবাক হয়ে ফিরে এসেছিল হিন্তু আর ওর মা। আসলে একটা সামান্য সরকারি গ্রুপ ডি স্টাফ হয়ে ওই বিপুল টাকার বোঝা নেওয়ার মতো জোর ছিল না হিন্তুর বাবার।

এরপর অনেক কাঠখড় পুড়িয়েও মা, বাবার চাকরিটা পায়নি। তখনো বাবার ৭ বছর চাকরি বাকি। প্রবল আপত্তি তুলেছিল বিশেষত শাসক কর্মচারী সংগঠনের কিছু নেতা। তাদের যুক্তি ছিল, এই ৫৩ বছর বয়সে মারা গেলে ডাইং হারনেশ কেসে পরিবারের কোনো ব্যক্তি চাকরি পেতে পারে না। এদের মধ্যে অন্যতম ছিল বিপ্লব জানা। তবে তাদের আসল ক্ষোভটা ছিল অন্য জায়গায়। হিন্তুর বাবা সবদিন শাসকের কর্মচারী সংগঠনের বিরোধী সংগঠন করে এসেছে।এইরকম একজন অবাধ্য চাকুরেকে শায়েস্তা করার জন্য যতটা কলকাঠি নাড়া যায় তার সব চেষ্টাই করেছিল এবং অনস্বীকার্য ভাবে সফল হয়েছে। এখন হিন্তুর মা একটা প্রাইভেট সংস্থায় কাজ করে। হিন্তু  ৬ টা টিউশনি করে নিজের হাত খরচটা চালিয়ে নেয়।

এবার গরমটা পড়েছে খুব। এখন সবে মাঝবিকেল। জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে হিন্তু ভাবছিল ওর কলেজ যাওয়াটা কত জরুরি ছিল। এই চারদিনে বোধহয় ৪০ বার ফোন এসে গেছে কলেজ থেকে।

সদ্য উচ্চ মাধ্যমিক এর রেজাল্ট বেরিয়েছে । আর কিছুদিন পর থেকেই ফার্স্ট ইয়ারে ভর্তি শুরু হবে। হিন্তু এখন সেকেন্ড ইয়ার। কলেজে ছাত্র ইউনিয়নের কালচারাল সেক্রেটারি। দু’বছর আগেই রাজ্যে একটা রাজনৈতিক পালা বদল ঘটে গেছে। দীর্ঘ দিনের শাসক দলকে হটিয়ে ক্ষমতায় এসেছে নতুন দল। হিন্তুদের কলেজ যদিও আগে থেকেই রাজ্যে বিরোধী দলের ছাত্র সংগঠনের নিয়ন্ত্রণে ছিল। এখন আরো জোর চলে এসেছে। কলেজের খাতায় হিন্তুর নাম আর্যদেব চ্যাটার্জী।

কলেজের প্রথম বছরেই হিন্তু ওর বাংলা ডিপার্টমেন্ট থেকে ভোটে জিতে কালচারাল সেক্রেটারি হয়েছে। দায়িত্ব পালনও করছে যথাযোগ্য মর্যাদায়। একটা দেওয়াল পত্রিকা হচ্ছে ৩ মাস ছাড়া। এছাড়াও নতুন ছেলে মেয়েদের জন্য কিছু প্ল্যানিং করে রেখেছে আগামি ৬ মাসের। এই সময় তাই কলেজ যাওয়াটা খুব জরুরি ছিল , কিন্তু যাওয়াই যখন হয়নি অগত্যা বিনয় মজুমদারের কবিতা সমগ্রটা টেনে নিল। দীর্ঘ জ্বরের পর একটু মানসিক পরিচর্যার দরকার।

২.

ছাত্র ইউনিয়নে হিন্তু যে কতটা জনপ্রিয় তা বোধহয় জ্বরটা না হলে বোঝা যেত না। প্রথমেই কলেজের জি এস শতদ্রু দা এসে দু’কাঁধ ধরে নাড়িয়ে দিয়ে বললো, “ ওহে কবি এবার একটু নিজের দিকেও নজর দাও। না হলে যে কদিন বাদে তোমাকে নিয়েই আমাদের এলিজি লিখতে হবে”।হাসিতে ফেটে পড়লো গোটা ইউনিয়ন রুম। থার্ড ইয়ারের রাকা দি ছদ্ম রাগ দেখালো জি এস এর উপর, “ তোরা সবসময় ওকে ওর চেহারা নিয়ে খোঁটা দিস কেন? জানিস রোগা ছেলেগুলো কত সুইট হয়”। হৈ হৈ করে উঠলো শতদ্রু, “এই রাকা ‘রোগা ছেলেগুলো সুইট হয়’ এই লাইনটা তুই ফেসবুক থেকে ঝাড়লি বল”।

রাকা ঠোঁট মুচড়ে বললো, “ইইই, কেন রে ব্যাটা চাড়াল, তুই কুম্ভীলক বলে কি সবাই কুম্ভীলক?”

শতদ্রু চোখ গোল গোল করলো, “যা বাবা, এ আবার কী শব্দ হাজির করলে মা, জম্মেও শুনিনি। এর মানে কীরে?”

হিন্তুই হাসতে হাসতে উত্তরটা দিয়ে দিলো, “ কুম্ভীলক মানে যে অন্যের সৃষ্টি চুরি করে নিজের বলে চালায়”

লাফিয়ে উঠলো শতদ্রু, “এই রাকা বল আমি অন্যের কোন সৃষ্টি চুরি করেছি?”

রাকা ফিচেল হেসে উত্তর দিলো “তুই যে অন্যের গার্লফ্রেন্ড চুরি করে নিজের বলে চালাচ্ছিস?”

শতদ্রু চড় উঠিয়ে বললো, “ মার খাবি রাকা। কোন শালা বললো আমি অন্যের গার্লফ্রেন্ড চুরি করেছি। সে যদি আমার কাছে চলে আসে আমি কী করবো”।

হাসতে হাসতে রাকা তখন অন্য কোণে সরে পড়েছে।

হাসিঠাট্টার মাঝেই ওদের ছাত্র সংসদের কর্মী আকাশ বললো, “শতদ্রু দা ,পরশু থেকে ফর্ম ফিলাপ শুরু হচ্ছে কিন্তু। কিছু নির্দেশ থাকলে দিয়ে দাও”।

শতদ্রু তখনও মুখ গোমড়া করে বসে আছে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও উঠে দাঁড়িয়ে বলতে লাগলো, “ আগামী পরশু থেকে নতুন সেশন এ ভর্তি শুরু হবে। এবারেই শেষ সরাসরি ফর্ম ফিলাপ করে ভর্তি । আগামীবার থেকে অনলাইন। তাই এবার সবাই সতর্ক থাকবে। অপোনেন্ট ঝামেলা পাকানোর চেষ্টা করতে পারে, কিন্তু কেউ কোনো প্ররোচনায় পা দেবে না। পুরোটাই শান্তিপূর্ণ ভাবে হওয়া চাই। তবে ওরা বেশি বেগড়বাঁই করতে এলে ধুয়ে দিতে হবে, মাথায় রেখো সবাই”।

“না শতদ্রু দা, শেষ কথাটা তুমি ঠিক বললে না”। সবাই অবাক হয়ে দেখলো হিন্তু বলছে, “ এই মারধোর, প্রতিহিংসার রাজনীতিতে আমি অন্তত বিশ্বাসী নই। আমাদের চেষ্টা করতে হবে যাতে কোনো সমস্যা না হয়”।

প্রথমে একটু অবাকই হলো শতদ্রু, তারপরেই ঝাঁজিয়ে উঠলো, “তো শালা ওরা মারতে এলে আমরা কি ল্যাজ গুটিয়ে পালাবো? জানিস না মারের বদলা মার। আর মনে রাখিস আমরা এখন ক্ষমতায়। ওদের সময় ওরা করেছে আমাদের সময় আমরা করবো”।

ঘরে পিন ড্রপ সাইলেন্স। শতদ্রু আবার কেটে কেটে বললো, “ আমরা কোনো অশান্তি চাই না, কিন্তু বেগড়বাঁই দেখলে, তোড় দো শালো কো”।

সাইকেল নিয়ে কলেজ থেকে হিন্তু ফিরছে ধীর গতিতে। চারপাশ যেন থমকে আছে। কিচ্ছু ভালো লাগছে না। আজ এই ছোট্ট মফস্বল শহরটার গা থেকে কেমন আঁশটে গন্ধ পাচ্ছে হিন্তু।  ‘মন ভালো নেই, মন ভালো নেই’ এই লাইনটার কথা বারবার মনে পড়ছে। পাড়ার গলিতে ঢুকতে ঢুকতে শুনতে পেলো  কোনো বাড়ির টিভি থেকে উড়ে আসছে ‘আমি কতই রঙ্গ দেখি দুনিয়ায়, ও ভাই রে…’

৩.

ফর্ম ফিলাপ নির্বিঘ্নেই চলছে। আর মাত্র দুটো দিন। ছাত্র সংসদের ছেলেরাই একচেটিয়া ভাবে ছাত্রছাত্রীদের সাহায্য দিয়ে চলছে। হিন্তুদের এই কলেজটায় মাঝারি মানের স্টুডেন্টদের ভিড় বেশি হয়। যদিও ওদের কলেজে বাংলার ফ্যাকাল্টি সব থেকে ভাল। গতবারও ইউনিভার্সিটিতে এই কলেজ থেকেই বাংলা টপার বেরিয়েছিল। তাই বাংলার জন্যই স্টুডেন্টদের চাহিদা বেশি।

“একটু শুনবেন প্লিজ”। একটা মিষ্টি রিনিরিনি গলা শুনে মুখ তুললো হিন্তু। কিন্তু না তুললেই বোধহয় ভালো হতো। ওই ভিড়ের মধ্যেও বাকি সব ঝাপসা হয়ে গেল হিন্তুর কাছে। যেন গোটা পৃথিবী স্লো মোশনে চলছে আর চৌরাশিয়ার বাঁশি বাজছে চারিদিকে খুব মৃদু সুরে। এই প্রচন্ড গরমেও বরফের দেশের হাওয়া এসে লাগলো হিন্তুর গায়ে।

“শুনুন না প্লিজ। আমার রেজাল্টটা দেখে বলবেন এখানে বাংলা পেতে পারি কিনা?”

“ওভাবে তো নিশ্চিত বলা যায় না। আমরা গতবারেরটার সাথে মিলিয়ে মোটামুটি একটা ধারণা দিতে পারি যেটা নাও মিলতে পারে ফাইনালি”।

“ঠিক আছে। তাই ধারণাই না হয় দিন”।

হিন্তু রেজাল্টের কাগজ টেনে নিয়ে চোখটা নামিয়েছে, শুনতে পেলো একটা পুরুষ কণ্ঠ, একটু মিহি, জিজ্ঞাসা করছে, “ কি বলছে রে তৃষা, হতে পারে?”

“না বাবা, এখনো কিছু বলেনি। দেখছে”।

রেজাল্টটা দেখে হিন্তু বুঝলো মেয়েটার মার্কস যা আছে এই কলেজে চান্স হয়ে যাবে আরামে। কিন্তু ওটা তো আর বলা যায় না। মুখ না তুলেই বললো “ মনে হচ্ছে…”।

কথাটা শেষ করতে পারলো না। তার আগেই ওর দিকে প্রশ্ন উড়ে এসেছে “আরে আর্য না?” প্রশ্নকর্তা তৃষার বাবা অর্থাৎ বিপ্লব জানা।

হিন্তু অবাক হয়ে গেল। এই বরফের হাওয়া বয়ে আনা মেয়েটা বিপ্লব জানার মেয়ে! সেই বিপ্লব জানা যে ওর বাবা মারা যাওয়ার পর মা’কে চাকরিটা পেতে দেয়নি। সেই বিপ্লব জানা যে ওকে বলেছিল, “বাবা মারা গেছে তো কী হয়েছে। ও রকম কত মানুষের যায়। তুমি চেষ্টা করো চাকরি পাবার। বাবা মারা গেল আর মা চাকরি পেয়ে গেল সেটি হলে তুমি তো কষ্ট কী জিনিস তা বুঝবেই না”। সব গুলিয়ে গেল হিন্তুর।

“কেমন আছো? মা কেমন আছেন?” একটু অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিল হিন্তু। বিপ্লব জানার প্রশ্নে চমক ভেঙেছে।

“আমি ভাল আছি। মাও ভাল আছেন”।

“বাঃ। বেশ বেশ। তোমার বাবা মারা যাওয়ার পর তোমাদের যা কষ্ট গেছে। লোক মুখে তো খবর পেতাম। বিকাশবাবুও বড় ভাল মানুষ ছিলেন। ওনার চলে যাওয়াটা একদম অসময়ে”।

হিন্তুর ইচ্ছে করছিল একটা সজোরে ঘুঁষি বিপ্লব জানার চোয়াল লক্ষ করে উগরে দিতে। এখন বিপ্লব জানা দিব্যি ভোল পালটে বর্তমান শাসক দলের অধীনস্থ হয়ে পদ বাগিয়ে নিয়েছে সে খবর হিন্তু রাখে। তৃষা বললো, “তুমি ওকে চেনো বাবা”।

“হ্যাঁ রে মা। ও তো আমার অফিসের কলিগ বিকাশ বাবুর ছেলে”।

“তাহলে তো ভালোই হলো বলো। এই কলেজে ভর্তি হওয়ার আগেই আমি আমার একজন পরিচিত পেয়ে গেলাম। কিন্তু আমাকে তো বললেন না আমার হওয়ার চান্স আছে কিনা?” শেষ প্রশ্নটা হিন্তুকে উদ্দেশ্য করে।

“এখনই বলা যাচ্ছে না নিশ্চিত করে। এবার নম্বর অনেক আসছে তো। ফাইনাল লিস্টেই দেখতে হবে”।

বিপ্লব জানা মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললো, “আরে ঠিক আছে। আমি তো আছি। বলে দেব ঠিক জায়গায়। এই কলেজেই হবে। চিন্তা করিস না”।

তৃষাকে তবু নিশ্চিন্ত মনে হলো না মুখ দেখে, “আমি তাহলে ফর্ম ফিলআপ করে ফেলে দিই আজকেই”

৪.

“ওরে ব্বাবা। ফর্ম ফেলার লাইনে কী ভিড়। আর ঘোষনা করে দিল তো দেখলাম নতুন করে কেউ যাতে লাইনে না দাঁড়ায়। আবার আগামীকাল ফর্ম জমা নেওয়া হবে”। তৃষা অনর্গল বলে যাচ্ছে “ কিন্তু আমার তো আজ ছাড়া হবে না। কাল তো কলকাতা যাচ্ছি কয়েকটা কলেজে ফর্ম ফেলতে। কী হবে বাবা তাহলে? এখানে তো পরশু লাস্ট ডেট। আমি তো ফিরবো তারপরের দিন”।

 “দাঁড়া দাঁড়া। কিছু একটা ব্যবস্থা করতে হবে”। বিপ্লব জানার গলা স্পষ্ট উদ্বিগ্ন শোনালো। তৃষা এখন একদম হিন্তুর কাছ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে। ঘাম এবং পারফিউম মেশানো একটা গন্ধ হিন্তুকে কেমন পাগল করে দিচ্ছে।

প্রস্তাবটা বিপ্লব জানার কাছ থেকেই এলো, “বাবা আর্য। তুমি ফর্মটা একটু রেখে দিতে পারো না? ফিলআপ তো হয়েই গেছে। তুমি শুধু যদি একটু ফেলে দাও তাহলে মেয়েটার খুব উপকার হয়”।

হিন্তু আড়চোখে দেখলো তৃষা খুব আগ্রহ নিয়ে হিন্তুর মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। অন্য কেউ হলে হয়তো হিন্তু এই দায়িত্ব নিতো না। কিন্তু ওই রিনরিনে গলা। ওই গন্ধ। ওই বরফের হাওয়া হিন্তুকে না বলতে দিলো না, “ঠিক আছে। দিয়ে যান”।

“উফ। তুমি আমাদের বাঁচালে । আসলে কার ছেলে দেখতে হবে তো। বিকাশবাবুও জীবিত অবস্থায় এইরকমই ছিলেন। পরোপকারী, শান্ত ধীর-স্থির”। বিপ্লব জানার মুখে চওড়া হাসি। হিন্তু চোখের কোণ দিয়ে দেখতে পেল তৃষার মুখটাও হাসি হাসি।

যাওয়ার আগে বিপ্লব জানা বলে গেল, “ মা কে বোলো আমার সাথে দেখা হয়ে ছিল। তোমরা ভাল আছো দেখে আমি খুব খুশি হয়েছি”।

দুজন  চলে যাওয়ার পর সাত্যকি বললো, “ওই বিপ্লব জানা মালটা কী বলছিল তোর সাথে অত? আর সাথে ওটা কে ছিল? মেয়ে? ঝাক্কাস তো গুরু। ওই খ্যাঁচড়া বাপের ওই মেয়ে। ভাবাই যায় না”।

হিন্তু সংক্ষেপে ব্যাপারটা বলার পর সাত্যকি মুখ বিকৃতি করে বললো, “শালা সব জায়গায় চুকলিবাজি। যদ্দিন ওদিকে ছিল তদ্দিনও একে ধরে ওকে ধরে কাজ হাসিল করেছে। এখন এদিকে ভিড়েও একই অবস্থা। আমাদের নেতাগুলো যে এই সমস্ত দু’নম্বরীদের কেন সুযোগ দেয় কে জানে”!

হিন্তু কিছু না বলে ফর্মটার দিকে দেখতে লাগলো।

“কি অত দেখছো বাওয়া ছবির দিকে? মনে লেগেছে মনে হচ্ছে” সাত্যকি একটা বাজে শব্দ করে হাসলো।

“বাজে বকিস না তো” । চেয়ারটা ঠেলে হিন্তু উঠে পড়ে স্ট্যান্ডের দিকে এগিয়ে গেল সাইকেলটা নিতে।

অনেকদিন বাদে আজ নদীর কাছে এলো হিন্তু। মনখারাপ থাকলে বা কিছু লিখতে না পারলে এখানে আসে ও।

যাওয়ার আগে বিপ্লব জানার শেষ কথাটা হিন্তুকে পাগল করে দিচ্ছে। ‘তোমরা ভাল আছো’ এই বাক্যটাই হিন্তুর ভেতরে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে। একটু আগে তৈরি হওয়া সব অনুরাগ জ্বলে পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে।

হঠাৎ মাথায় বিদ্যুৎ চমক জাগলো। বিপ্লব জানা যা করেছে ওদের সাথে তার প্রতিশোধ নেওয়ার এ এক মোক্ষম সুযোগ।

আর বেশি ভাবলো না হিন্তু। ব্যাগ থেকে বের করলো তৃষার ফর্মটা। ধীর পায়ে এগিয়ে গেল নদীর কিনারের দিকে। ফর্মের সাথে সব ডকুমেন্টস এর জেরক্স দেওয়া আছে। হিন্তু প্রথম শেষ কাগজটা ছিঁড়লো। উড়িয়ে দিলো নদীর দিকে। তারপর আর একটা। এভাবে সব শেষে যখন খালি ফর্মটাই হাতে রয়ে গেছে, ভাসাতে গিয়েও একটু থমকে গেল। ফর্মে চেটানো তৃষার ছবিটা ছিঁড়ে নিয়ে রাখলো বুক পকেটে। তারপর হাত থেকে মুক্ত করে দিল ফর্মটা।

কোথা থেকে হৃদয় ঠান্ডা করে দেওয়ার মতো বরফের হাওয়া এসে হিন্তুকে একটু কাঁপিয়ে দিয়ে গেল। একটা দমকা হাওয়ায় গাছের পাতাগুলো কেঁপে উঠলো রিনিরিনি করে।


Spread the love