মীনাক্ষী লায়েকের প্রবন্ধ

    0
    11
    জন্ম- পুরুলিয়া, সম্পাদক - বর্ডার লাইন দি (সংবাদপত্র) মহুয়া - (সাহিত্য পত্রিকা)
    Spread the love

    নারী, প্রকৃতি ও পুরুষ

    অহরহ ঘটতে থাকা নারী অত্যাচার, নারী নির্যাতন, অপমান ও ধর্ষণের  সংবাদে একজন নারী হয়ে মাঝেমাঝে মনে হয় নারী জন্ম কি পাপ? আবার সঙ্গে সঙ্গেই মনের যাবতীয় দুর্বলতা ঝেড়ে ফেলে তেড়েফুড়ে উঠে মনকে শক্ত করি,  না – নারী জন্ম বহু পূন্যের ফল। দুর্গার অসুরদলনী রণং দেহী মূর্তিকে স্মরণ করি,  রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র আওড়াই, রানী দুর্গাবতী, রানী লক্ষ্মীবাঈ, ইন্দিরা গান্ধিসহ  শত শত নারীকে মনে আসে। নারী শক্তিময়ী, নারীই শক্তির মূল উৎস। তবু কেন? কেন? এত উদাহরণ, এত এগিয়ে যাওয়া সমাজ, তবু কেন নারীকে লাঞ্ছিত হতে হয় বার বার। উত্তর খুঁজতে বসি, চলে যাই আরও গভীরে।

    নারী অবদমন সর্বকালে ছিল, আছে। আর নারীর স্বাধীকার প্রতিষ্ঠার লড়াইও ছিল এবং আছে। একটু তলিয়ে দেখলে বোঝা যায় নারীমুক্তি সংগ্রামের সবটাই পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে। কিন্তু আর একটি প্রবল প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে তারা নিশ্চুপে লড়ে যায়, তা হলো প্রকৃতি, যে নিজেই নারীর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। সেখানে হাজার সংগ্রাম করলেও তা বিফলে যায়। প্রকৃতি নারী ও পুরুষ সৃষ্টি করলেও তাদের শরীরিক গঠনের পার্থক্য  চলে গিয়েছে নারীর বিরুদ্ধে। একটি পুত্র ও একটি কন্যা যখন জন্মায় তাদের মধ্যে আচরণগত পার্থক্য করা হয় না। তারা শিশুই থাকে। সমস্যা হয় কন্যার বয়ঃসন্ধিকালে। ধীরে ধীরে কন্যার শারীরিক গঠনের পরিবর্তন হতে থাকে প্রকৃতির নিয়মে। স্তন, নিতম্ব, ওষ্ঠ – যা নারী শরীরের বহিঃর্ভাগে অবস্থান করে এবং পুরুষদের যৌন আবেগকে তাড়িত করে। প্রকৃতি যদি নারীশরীরের এই প্রত্যঙ্গগুলির অবস্থানের পরিবর্তন করতো তাহলে বোধহয় নারীদের লাঞ্ছিত হবার সুযোগ অনেকাংশে কমে যেত। দ্বিতীয়ত, নারীর যৌনাঙ্গের গঠন, যা এমনভাবে গঠিত যার জন্য ইচ্ছের বিরুদ্ধেও পুরুষদের কাছে নারীকে সমর্পিত হতে হয়। অপরদিকে পুরুষদের ইচ্ছে না থাকলে যৌন মিলনে অংশগ্রহণ করে না বা করতে পারে না। প্রকৃতিই নারীকে প্যাসিভ মিলনে বাধ্য করেছে যার জন্য নারীকেই ধর্ষণের শিকার হতে হয় নির্বিচারভাবে। না, নারীরা প্রকৃতির বিরুদ্ধে যেতে পারে না। পুরুষকেই প্রকৃতি যারপরনাই শক্ত পেশীবহুল গায়ের জোরসম্পন্ন শক্ত সমর্থ করে তুলেছে, তুলনায় নারী শারীরিক ভাবে দুর্বল। অন্যদিকে নারী অবদমনের আরেকটি প্রকৃতিদত্ত হাতিয়ার যা শুধু নারীদেহেই ঘটে থাকে তা হলো রজঃস্বলা হওয়া। এক্ষেত্রে প্রকৃতি যদি বিভাজন না করে পুরুষকেও তেমনভাবে তৈরী করতো তাহলে পুরুষদের নারীরা কোনওদিন স্বার্থপর ভাবতো না, প্রকৃতিকেও দোষারোপ করতো না। প্রকৃতি তার সৃষ্টির ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে নারীদেহকেই ব্যবহার করেছে। পুরুষ, সৃষ্টির এই বৈষম্যকে কাজে লাগিয়ে নারীর উপর চাপিয়েছে হাজার নিষেধাজ্ঞা। কখনো সে নারীকে পর্দানশীন, গৃহবন্দী করে রেখেছে, কখনও তার উপর সামাজিক, ধর্মীয় এবং কিছু পাশবিক অনুশাসন চাপিয়ে কর্তৃত্ব ফলিয়েছে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীর মালিক পুরুষ, অন্যান্য সম্পদের মতো নারী পুরুষের অধিকার। নারী তখন তার কাছে সম্পদের মতোই ভোগ্যবস্তু, আনন্দের উৎস।  পুরুষের একটি চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য – জয় করা। জয়েই তার আনন্দ। সাথে সাথে নূতন প্রজন্মের সৃষ্টি। লক্ষ্য করলে দেখা যায় রজঃস্বলা হবার পর নারী মা হবার উপযোগী হয়ে উঠলে পুরুষ বিধিনিষেধ আরোপ করে দখলদারী বজায় রাখতে, কখনও তার পারিবারিক পবিত্রতার নাম করে, কখনও ধর্মীয়, সামাজিক পবিত্রতার অছিলায়। নারীর পোশাকের বিধিনিষেধ, ঘোমটা, বোরখা দিয়ে সর্বাঙ্গ ঢেকেঢুকে রাখা, কিছু ধর্মীয় ও সামাজিক বিধিনিষেধ, মূল্যবোধের পাহাড় নারীকে অহেতুক ভীত ও সংকুচিত  করে তোলে। নারী যেন দোষী। তাকে প্রতিনিয়ত যেন সতর্ক থাকতে হয় এসময়। আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে এসময়ই নারীদের স্কুল ছাড়ার প্রবনতা সবচেয়ে বেশী। কারণ, তার আচরণবিধির উপর গণ্ডি আরোপিত হয়। যত্রতত্র নারী গমন করতে পারবে না। নারী যখনই তার চাহিদাকে অগ্রাধিকার  দিয়েছে তখনই তার চাহিদাকে দমন করা হয়েছে, কখনও তাকে গৃহবন্দী করেছে পুরুষ, যেন তেন প্রকারেণ পাত্রস্থ করা হয়েছে। আবার কখনও সমাজের তথাকথিত ‘মাথা’রা তাকে বেশ্যা-কুলটা আখ্যা দিয়েছে। এও দেখা গিয়েছে পরিবারেরই সদস্য নারীর মুণ্ডু কেটে কাটা মুণ্ডটি নিয়ে সদর্পে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কয়েক বছর আগে এমন বীভৎস দৃশ্যর কথা আমরা কাগজে পড়েছিলাম। পারিবারিক সম্মান বজায় রাখতে তারা কন্যাটিকে হত্যা করতে পিছপা হয় নি। পারিবারিক ও সামাজিক সম্মান রক্ষার দায়িত্ব শুধুমাত্র নারীদের। তাই ধর্ষিতা নারী আজও মুখ লুকিয়ে ঘুরে বেড়ায়, গোপন করতে হয় তার ধর্ষণের খবর। পুরুষ ভাবতে ভুলে যায় ধর্ষিতা নারীর লজ্জিত হবার কোন কারণ নেই। লজ্জিত হবার কথা পুরুষের। কারণ যে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের গর্ব তারা করে সেই সমাজেই নারীকে তারা নিরাপত্তা দিতে পারে নি। অমন বিদঘুটে সমাজের কি প্রয়োজন! এবার আসি নারীর মাতৃত্বের প্রসঙ্গে। পৃথিবীতে সবথেকে সুখ মা হওয়া। পুরুষ ও নারীর যৌথ প্রয়াসে সৃষ্টি হয় নবজীবন। সন্তানকে নিজের শরীরে ধারণ করে নয় মাস পর প্রচণ্ড যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে মা সন্তান প্রসব করে। এখানেই তার দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। সন্তানের লালন, পরিচর্যা সব বর্তায় মায়ের উপর। মা খুশী হয়ে দায়িত্ব পালন করে। কিন্তু সন্তানের পিতা সমপর্যায়ের দায়িত্ব কি বহন করে আমাদের সমাজে? অন্যান্য দেশে ব্রেস্ট ফিডিং ছাড়া সন্তানের পিতা আর সব দায়িত্ব পালন করে। এদেশে চাকরীরতা মা সন্তানের দেখভালের জন্য ছুটি পায় বা নেয়। কিন্তু প্রয়োজনে মাকেই চাকরিটি ছাড়তে হয়। কিছুদিন আগেও নারীর মা হবার ইচ্ছেটুকু পর্যন্ত তার হাতে ছিলো না।  কৃত্রিম বন্ধ্যাত্বর জন্য যে contraceptive pil নারীর জন্য ব্যবহার্য সেটি জাপানের মতো উন্নত দেশেও একসময় বাজারে বিক্রির অনুমতি পাওয়া যেতো না। অথচ ভায়াগ্রা জাতীয় যৌন উদ্দীপক হু-হু করে বিক্রি হতো।আমাদের দেশে বন্ধ্যাত্বের জন্য অপারেশন পর্যন্ত বেশীর ভাগ নারীকেই করতে হয়, তার অনেক শারীরিক অসুবিধা সত্ত্বেও। কারণ, পুরুষ ভাবে তারা এ অপারেশন করলে তাদের পুরুষত্বের হানি ঘটে। আসলে অনেক পুরুষ জানেই না পৌরুষ কি।

    ধর্ষণের মাধ্যমে পুরুষ বার বার যেমন প্রকাশ করেছে নারীদেহ পুরুষের আনন্দের উৎস, তেমন তাদের বৈরিতার ভাবটিও প্রকাশ হয়েছে ধর্ষণের মাধ্যমে। নারীকে ‘দেখে নেবো ‘ এই মনোভাবটি নিয়ে সে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং দেখে নেয়। অন্যদিকে নারী যেহেতু তাদের কাছে শুধুই ভোগ্যবস্তু তাই নারীর উপর দখলদারী করে কখনও পিতা, কখনও স্বামী, কখনও ভাই বা দাদা। এই মালিকত্ব দেখাতে গিয়ে যত বিপত্তি। অন্যান্য সম্পত্তির মতো নারীকেও তারা নিয়ন্ত্রণ করেছে বহুভাবে। তাই নারীর বিরুদ্ধে বহু অনিয়ম, বিকৃতি, নিষ্ঠুরতা, দৈহিক পীড়ন, এমন কি নারীদেহ বিকলাঙ্গ করতেও তাদের মনুষ্যত্বে বাঁধে না। আফ্রিকা ও আরবের কিছু স্থানে নারী যখন কিশোরী, তার যৌনাঙ্গর বহিঃর্ভাগে একধরনের অপারেশন করা হতো যাতে তারা যৌন আনন্দ উপভোগ করতে না পারে। আনন্দ না পেলে তারা বিপথগামী হবে না। উপভোগ ও আনন্দের অধিকারী একমাত্র পুরুষ। পুরুষের এই বিকৃত দাবি পূরণে নারীও একসময় তার সহযোগী হয়ে উঠেছে প্রায়ই। পূর্বে এটাই সামাজিক নিয়ম বলে মেনে নিয়েছে। ইদানীং যেন তেন প্রকারেণ পুরুষকে খুশী করতে গিয়ে  তারা হরমোন রিপ্লেসমেন্ট, বক্ষে সিলিকন জেল ব্যবহার, প্লাস্টিক সার্জারি প্রভৃতি করে, সবটাই নারী শুধু নিজের আনন্দের জন্য করে ভাবলে ভুল হবে। আসলে বহুকাল পূর্বে ‘মেয়েরা কুড়ি পেরোলেই বুড়ি’ এই ভয়ঙ্কর আপ্তবাক্যটি তাদের মস্তিষ্কে সুচারুভাবে ঢুকিয়ে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে নারী কত গুরুত্বহীন। তাই রজঃনিবৃত্তিতেও নারী অবসাদগ্রস্ত, ভাবে তার প্রয়োজন ফুরিয়েছে।

    সভ্যতা যেমন এগিয়েছে সমাজেও পরিবর্তন হয়েছে। পরিবর্তন এসেছে নারী-পুরুষ সম্পর্কেও। হয়তো নারী অবদমনের বিষয়গুলি পুরুষ সহানুভূতি সহকারে ভাবতে শিখেছে। অনেকক্ষেত্রেই পুরুষ নারীর যথেষ্ট সহযোগী হয়ে উঠেছে,  সহমর্মী হয়েছে। তাই নারী আজ অনেক বেশী সাহসী, অনেক যুক্তিবাদী।  এক্ষেত্রে মহিলা কমিশন, মানবাধিকার সংস্থা, নারীমুক্তি আন্দোলনকারী সংস্থাগুলি, এমন কি রাষ্ট্রপূঞ্জ প্রচুর কাজ করছে। তবু ফাঁক থেকেই যায়। সে ফাঁক পূরণ করবে উপযুক্ত পরিবেশ ও শিক্ষা।  নারী-পুরুষ বৈষম্য রুখতে ‘নারী মানেই অধঃস্তন কোন প্রজাতি ‘ এই ভাবনার পরিবর্তন চাই, আর তার জন্য চাই উন্মুক্ত মন। শিক্ষা, শিক্ষাই আনবে সে মন। সে মন আসতে  আজও দেরী কেন? আমরা নিজেদের শিক্ষার যে বড়াই করি সেখানেও কিছু অবাঞ্ছিত শব্দ ঘোরাফেরা করে, সেগুলিও নারীবান্ধব নয়, যেমন – ‘কুমারী মাতা’। কুমারী মাতার  কৌমার্য হরণ করেছে সেই বিশেষ পুরুষটি যে বিবাহের প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে অক্ষম হয়েছে। অথবা নারীটি ধর্ষিতা হয়েছে। তাই সন্তান ধারণ। সমাজে পুরুষটি লাঞ্ছিত না হয়ে লাঞ্ছিত হয়েছে নারীটি, ‘কুমারী মা’ নামে কলঙ্কিত হয়েছে অবিবাহিতা নারীটি, ফলশ্রুতি আত্মহত্যা। এখন অবশ্য অনেক নারী সিঙ্গল পেরেন্ট হয়ে পিতৃত্বের পরিচয়হীন সন্তানকে মানুষ করছে, কারণ ন’মাস ধরে তিল তিল করে যে সন্তানকে সে নিজের রক্তমাংসে, পুষ্টি দিয়ে বিকশিত হতে দিয়েছে সেই সন্তান তো মায়েরই সম্পদ। পিতার অস্তিত্ব মা স্বীকার করলে আছে, নাতো নেই। ‘নারী কেলেঙ্কারী’ আরেকটি শব্দ। শব্দটি আপত্তিজনক। কেলেঙ্কারীর সাথে পুরুষটিও জড়িত। অথচ কেলেঙ্কারীর দায়ভারটি নারীর ঘাড়ে চেপে বসেছে। ঝগড়া ও কিছু আচরণের সাথে নিন্দার্থে ‘মেয়েলি’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়। সে আচরণ কিন্তু একইরকমভাবে পুরুষও করে। গাইনোকোলজিক্যাল সমস্যাগুলি আজও ‘মেয়েলি’ রোগ এবং খুব গোপন। এই শব্দগুলির বর্জন দরকার। বর্জন দরকার পুরুষালি কিছু ফর নাথিং ইগোর, কাজের ক্ষেত্রে সম্পর্কগুলি মানবিক হওয়াই প্রয়োজন। বোঝা দরকার নারী-পুরুষ পার্থক্য দেহগত বৈশিষ্টে, হরমোনাল সিক্রেশনে। গুণগত বা মেধাগত পার্থক্য নেই বললেই চলে। তাই সম্পর্ক মানবিক হোক, চাপের নয়, নিষ্পেষণের নয়। রাণাঘাটের মাদারকে ধর্ষণ করলে মা-কে ধর্ষণ করা হয়, ৬ বছরের শিশুকে ধর্ষণ করলে কন্যাকে ধর্ষণ করা হয়, এ বোধ ধর্ষকদের কবে হবে? এ তো চূড়ান্ত সামাজিক অবক্ষয়। সে সমাজ কি কোনোদিন শিরদাঁড়া সোজা করে দাঁড়াতে পারে? সাময়িক উত্তেজনায় পুরুষগুলি ভারতবর্ষের মূল্যবোধকে কালিমালিপ্ত করছে কোন অধিকারে?


    Spread the love