বিশ্বজিৎ লায়েক-এর কবিতা বিষয়ক গদ্য

    0
    47
    জন্মস্থান – পুরুলিয়া পেশা – সরকারি চাকরি প্রকাশিত কবিতা বই :- ১) ডানায় সে চুম্বকত্ব আছে ২) উন্মাদ অন্ধকারের ভিতর ৩) ভিতরে বাইরে ৪) পোড়া নক্ষত্রের কাঙাল ৫) মুসলপর্বের স্বরলিপি ৬) কৃষ্ণগহ্বর ৭) শরীরে সরীসৃপ ৮) প্রেমের কবিতা ৯) পোড়ামাটির ঈশ্বর ১০) ঈর্ষা ক্রোমোজোম উপন্যাস ১) কৃষ্ণগহ্বর
    Spread the love
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  

    কবিতা নিয়ে কেন আমি এক্সপেরিমেন্ট করিনি

    মানুষ কীভাবে বাঁচে! কীভাবে লেখে এই রক্ত, পুঁজ, হাড়-মাংস, বায়বীয় জীবনের কথা! কেনই বা লেখে! আমি জানি না। একসময় জানতে চেয়েছিলাম বটে কিন্তু কোনো তল খুঁজে পাইনি। কেবল হাঁতড়ে বেড়িয়েছি এই মাথা থেকে ওই মাথা অব্দি। কিছু কী পেয়েছি! হ্যাঁ, পেয়েছি তো বটেই কিন্তু যা পেয়েছি তা আমি পেতে চাইনি এমনকি তাকে আমি খুঁজিওনি।

    এই খোঁজা খুঁজি থেকে একটু এগিয়ে যাওয়া যাক। সামনের দিকে। সেখানে যা অপেক্ষা করে আছে তা আমার জন্য নয়। তা তোমার জন্যও নয়। কিন্তু সেই অপেক্ষাই আমাকে, তোমাকে এতদিন গ্রহণ করতে হয়েছে। এই গ্রহণে কোনো প্রেম ছিল না। বিরহ ছিল না। ভ্রান্তি ছিল না। কেবল হতাশা ছিল। বেদনার আরক্তিম ফল। তুমি তাকে গ্রহণ করেছ, আমি তাকে বলেছি এসো বন্ধু এসো। কিন্তু বসার জন্য কোনো পিঁড়ি পেতে দিইনি। মোড়া পেতেও দিইনি। আর চেয়ার তো কোনো কালেই আমার ছিল না।

    থাকা! সব কিছু থাকতে নেই। যাদের সব কিছু থাকে আসলে তাদের কিছুই থাকে না। এমনকি তাদের কাছে তারা নিজেরাও থাকে না। আরে থাকবে কী করে! কোনো কিছুর মধ্যে কোনো কিছু থাকা বা না থাকা আসলে শ্রুডিংগারের ম্যাজিক এর মতো। বেড়াল বেঁচেও ছিল। আবার মরেও ছিল।

    আমি এর মাঝামাঝি থাকি। মাঝামাঝি থাকতে আমার  ভারী পছন্দ। এই যেমন, আমি যখন বাড়ি থেকে বেরোই বউ পইপই করে বলে দেয় বাসের কেবিনে বসবে  না। পিছনের সিটেও বসবে না। তাহলে মাঝামাঝি বসার অপশনটাই বাকি থাকল। কারণ মাঝামাঝি ওই জায়গায় নাকি ঝুঁকি কম। তা এই মাঝামাঝি থাকতে গিয়ে আমাদের যে চিঁড়েচেপটা অবস্থা!  না ঘরকা, না ঘাটকা। আঁত, পিত বেরিয়ে পড়ার জোগাড়। কিন্তু যেমনই থাকি না কেন আমার নিরাপত্তা চাই। ডাল ভাতের জীবন চাই। রগড় আমার চাই না। আমাকে ওসব মানায় না। আমি মুখ বুজে, চোখ মুজে থাকতেই আরাম পাই। কে যে কিসে আরাম পায় শালা ভগবানও জানে না বোধ হয়!
    মধ্যবর্তী অবস্থানটা এমনই গোলমেলে যে সেখান থেকে বেরোনো শুধু মুশকিলই না প্রায় নামুনকিন! মাঝামাঝি অবস্থানে থাকতে থাকতে আমরা সামনের লোকটাকে এগিয়ে দিয়ে বলি যা এগিয়ে যা, লাফ মার, আরে ঘুঁসিটা বাগিয়ে মারতে পারলি না, তোর দ্বারা কিচ্ছু হবে না বুঝলি! যেন আমার দ্বারা সব কিছু হয়ে গেছে কেবল মঙ্গল অভিযানটাই বাকি রয়েছে!
    আমি যখন মাঝের লোকটা হয়ে যাই তখন পিছনের লোকটিকে গোড়ালি দিয়ে গুতোতে থাকি। বলি, আরে দাদা ঠেলছেন কেন! সোজা হয়ে দাঁড়ান। এত বয়স হল এখনও দাঁড়াতেও শিখলেন না। নিজে সামনে আর পিছনের লোকগুলোর কাঁধে ঝুলে থেকে জ্ঞান দিচ্ছি। জ্ঞান দেওয়া আমার  কর্ম, কিন্তু কর্মযোগে আমার বিশ্বাস শূন্য।

    ভাবি কবিতা লিখেই নিজেকে শূন্যের কাছে নিয়ে যাবো।  সেখানে খেলবো থা কিত কিত থা। কারণ কাবাডি খেলার মতো এলেম আমার নেই। ফুটবল খেলার মতো দমও আমার নেই।আমি তাই কিত কিত খেলতে ভালোবাসি। লুডো খেলতে ভালোবাসি। চার আর ছয় হবে না জানি। তাতে কী! এক, দুই, তিন তো হবে। তাতেই আমার সুখ ও অরগ্যাজম।

    সুখ শব্দটির সঙ্গে আমার বেশ মাখামাখি সম্পর্ক। আমি যেমন সুখকে পেয়ার করি, সুখও আমাকে বসতে দেয়,শুতে দেয়। কিন্তু মুশকিল হল যে দিন গুলো আমি সুখের সঙ্গে বসি, সুখের সঙ্গে শুই সেই সব দিনে আমি লিখতে পারি না। আমার অফিসের এক কলিগকে কেন জানি না এই কথাটা বলেছিলাম। আর ও আমাকে বলেছিল, তুই আমার কী বাল লিখিস,কবিতা নাকি! আমি ভয়ে ভয়ে বলেছিলাম, চল চা খেয়ে আসি। চা খেতে গিয়ে আমরা কেউ সুখকে নিয়ে  কথা বলিনি। আমি ইচ্ছে করেই বলিনি আর আমার কলিগ বন্ধু তো কখনই ভাট বকেনি, তাই এযাত্রা রক্ষা!

    সেদিন আমার এক তরুণ বন্ধু আমাকে হঠাৎ বলল, দাদা তুমি কি কোনো দিন কবিতা নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করেছ? আমি বললাম, না ভাই, আমি নিজেকে নিয়ে এন্তার পরীক্ষা নিরীক্ষা করেছি বটে কিন্তু কবিতা নিয়ে ওসব কিছু করার সাহস পাইনি।

    এতলোক করছে, তুমিও তো করতে পারতে! এর উত্তরে আমি লম্বা করে হাসলাম। আর বেঁটে করে নিশ্বাস নিয়ে ভাবলাম, আমি কী সত্যিই বোকা পাঁঠা, না রামছাগল! আমার চেয়ে ১৫ বছরের ছোটো বন্ধু যা করতে পারে আমি তা পারি না!

    জীবনকে বললাম কী হে এতদিন তো আমারই খেলে, পরলে আর আমাকেই ল্যাঙট দেখাচ্ছ। আমাকেই এতকাল বোকা বানিয়ে চুষে নিলে আমারই রক্তরস। বেশ, বেশ! এবার তবে দেখো আমিও তোমাকে খেল দেখাবো।  কত ধানে কত চাল দেখবে হে ছোকরা এবার তোমার মাড় ভাত জোগাড় করাও মুশকিল হল বলে!

    জীবন শালা কম হারামি না, আমার কথা শুনে একটুও রাগল না, মুচকি হাসল। বলল, যাও তোমাকেও তিন দিন সুযোগ দিলাম আমাকে ছেড়ে এই তিন দিন কবিতাকে নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট নামাও। দেখি তোমার এলেমের জোর! যাক একটা সুযোগ পেয়ে আমিও লাফিয়ে উঠলাম।

    তরুণ বন্ধুটিকে ফোন করে বললাম, ভাই আমিও নামাচ্ছি। তুমি যে পত্রিকার জন্য লেখা চেয়েছ তাতে এবার এক্সপেরিমেন্ট ওয়ালা কবিতা দেবো। একদিন সময় দাও। হয়ে যাবে।

    কোন সকাল থেকে বসে আছি। অক্ষর আসছে না। শব্দ আসছে না। যতি আসছে না।  বাক্য ছিটকে ছিটকে যাচ্ছে। কাউকে ধরতেই পারছি না। সব পিছলে পিছলে যাচ্ছে। পাঁকাল মাছের মতো। ঘুরপাক খাচ্ছি চারপাশে। মেঘ ছিটকে যাচ্ছে। আকাশ আরো উঁচুতে গিয়ে ভেংচি কাটছে। গাছপালা সব ন্যাড়া হয়ে যাচ্ছে। আর চারপাশে এক ঘূর্ণি ঝড়। মাতাল মাতাল লাগছে। আর মাত্র  দু’ঘন্টা।  তার পরেই জীবন এসে কৈফিয়ত চাইবে। লেখা কই! আমি প্রচন্ড ঘেমে যাচ্ছি।  বউ বলছে, তোমার কী হল, ঘামছো কেন! এসি চালিয়ে দেব? আমার মুখ থেকে কোনো কথা বেরচ্ছে না। শুধু গো গো শব্দ হচ্ছে। আর চারপাশে হলুদ আর হলুদ রঙে অকাল গোধুলি!

    হাসপাতালের  বেডে শুয়ে আছি। মনে মনে ভাবছি এই যা এবারও হেরে গেলাম। পারলাম না। মুচকি হেসে সামনে এসে দাঁড়ালো জীবন দেবতা। কী হে বাবু এখন কেমন বোধ করছ? বললাম, ভালো। আর ছটপট করবে? বললাম, না। শোনো তুমি যা পার সেটা নিয়েই থাকো এদিক ওদিক করে কোনো লাভ নেই,  বুঝলে। বললাম, হ্যাঁ। আমি মাঝামাঝি লোক মাঝামাঝিই থাকতে চাই। আর তোমাকে নিয়েই এক্সপেরিমেন্টটা শেষ করতে চাই! জীবন বাবাজি আর মুচকি হাসলো না। হো হো করে হাসতে হাসতে বলল, শোনো, যারা আমাকে নিয়েই তৃপ্ত নয় তারা কোনো এক্সপেরিমেন্টেই দাঁত ফোটাতে পারেনি। আগে আমার সঙ্গে আমাকে যোগ করো, মানে ওই জীবনে জীবন যোগ না হলে…

    এমন সময় আমার দুই ছেলে হৈ হৈ করতে করতে ছুটে এল। বাবা, তুমি এখানে শুয়ে আছো! আমাদের জন্য প্যান্ট, জামা, জুতো কিনবে না! দুগ্গা পূজা তো কাল থেকেই। আমি বিছানা থেকে তড়াক করে লাফিয়ে নামলাম মেঝেতে। দুই ছেলেকে কাঁধে চাপিয়ে বললাম, চল…

    পিছনে পড়ে থাকল আমার কবিতার খাতা, কলম আর এক্সপেরিমেন্ট। আসছে বছর, না, না আবার জনমে আবার হবে। কিন্তু আমার তো পর জন্মেও বিশ্বাস মরে গেছে।


    Spread the love
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •  
    •