চোখে রেখো এ আবেশ

    0
    9
    Spread the love

    নিভৃতে, নির্জনে ভালোবাসার এক অভূতপূর্ব জায়গা কোভালাম সৈকত৷

    প্রজ্ঞা

    রোজকার এক বাধা-ধরা রুটিনে যখন মন-প্রাণ দুই-ই একঘেয়ে এবং ক্লান্ত হয়ে ওঠে, তখনই বিশ্রামের খোঁজে মনে ভ্রমনের দোলা দেয়৷ কিন্তু ইচ্ছা থাকলেই কি আর সবসময় উপায় হয়! প্রয়োজন হয় ছুটির, অবকাশের, নীরব নীর্জনতা বা নীল সান্নিধ্যের৷ চেনা জাঁতাকলের বাইরে এক টুকরো শান্তির নীড়ের৷ কিন্তু যাব কোথায়? দীঘা,পুরী,দার্জিলিং একই জায়গায় বারংবার নৈব নৈব চ৷ তাই চেষ্টা নতুন কিছু উপভোগ করার৷
    যেমন ভাবা তেমনই কাজ৷ নিজের সাধ্যের মধ্যেই কিছুদূরে খুঁজে পেলাম তামিলনাড়ুর কোভালাম তথা কোভলংকে৷
    যদি হাতে সময় থাকে তবে কিছুদিন আগে থেকে টিকিট কেটে রাখা যেতেই পারে৷ আর তা যদি সম্ভব না হয়, তবে তত্কালে টিকিট কেটে সোজা চেন্নাই৷ সেখান থেকে মহাবলীপুরমের পথে কোভালাম পৌঁছাতে গাড়িতে এক ঘন্টার চেয়ে একটু বেশিই সময় লাগবে৷ কোভালাম ঢোকার মুখেই আপনার চোখ ও মন দুই-ই কাড়বে দুপাশে নুইয়ে পড়া নারকেল গাছের সারি৷ দেখে মনে হবে যেন আপনাকেই স্বাগত জানাতে এদের এরূপ ভঙ্গীমা৷ প্রায় নিস্তব্ধ যে রাস্তা এখানে পৌঁছে দেবে, তার দু-পাশেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে রিসর্ট, হোমস্টে, রেস্তরাঁ, বেকারি৷ যেহেতু এটা অফ-সিজিন, তাই পযর্টকদের সেরকম কোন আনাগোনা নেই৷ হোটেলেও তূলনামূলক ভীড় কম৷ শহরের চেনা একঘেয়ে জগতের বাইরে এ এক অপূর্ব নিস্তব্ধ, নীর্জনতায় ভরা সম্পূর্ন অন্য জগৎ৷ শান্ত-সুন্দর ঠিক স্বপ্নের এক মহিমা৷
    পৌঁছতেই ওখানকার নীল বঙ্গোপসাগর থেকে আসা নোনা বাতাস প্রাণ জুড়িয়ে দিল৷
    প্রাণ ভরে আনন্দ উপভোগ করার জন্য একদম সমুদ্র সংলগ্ন হোটেল বাছা যেতে পারে৷ ভোরবেলা হোটেলের বিশাল জানলা থেকে উপভোগ করা এ যেন এক আলাদা স্বপ্নের-কোভালাম সমুদ্রতট৷ আস্তে আস্তে বদলে যাওয়া সমুদ্রের রূপ যেন এক আলাদা অনুভূতি৷ এতেও যদি রঙ্গ-রসনা তৃপ্ত না হয়,তবে হোটেলেই রয়েছে কোভালামের বিখ্যাত বডি-মেসেজের সুবিধা৷ অথবা যদি খুব একঘেয়ে লাগে, তবে সহজেই বালি-পাথরের সান্নিধ্য ছেড়ে লাইব্রেরীর নিশ্চুপ পরিবেশ বেছে নিতে পারেন, সমুদ্রতটের কিছু দূরের “পাওলো কোয়েলহোকে”৷
    আর যদি সমুদ্রের প্রতি ভালোবাসা থাকে তবে আর কি প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে বেরিয়ে পড়ুন বিচের পথে৷ খেজুর গাছ আর বাঁশের তৈরী ছোট বড় নানা মাপের জায়গায় বসে ঢেউয়ের আনাগোনা উপভোগ করা যেতে পারে৷ এছাড়াও সমুদ্রতটের সামনে এসময় দেখতে পাওয়া যাবে কিছু জেলের দল মাছ ধরার নৌকা নিয়ে ফিরছে৷ আরেক দিকে যারা একটু অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমী তারা কিছুক্ষনের জন্য সমুদ্রের দাপট কব্জা করতে বেছে নিতে পারেন ওয়াটার-স্কুটার৷ এরপর জলে নামতে ইচ্ছা হলে নীল সাগরের সম্মোহনী প্রেমে ভেসে যাওয়ার ইন্ধন৷ কিন্তু স্নানের পরই খিদেয় পেট চোঁ চোঁ৷ তাই অযথা দেরি না করে হোটেলে ফিরেই দুপুরের খাবারের বন্দোবস্ত শুরুর পালা৷
    এক্ষেত্রে বাছা যেতে পারে ওখানকার বিখ্যাত তামিল থালি৷ ভেজ ও নন ভেজ দুটোরই সমান বিস্তার৷ এক থালিতে বারো-চোদ্দ রকম পদ আর চার-পাঁচ রকম মছের বাহার! কোনোটায় নারকেল বাটা – সর্ষে ফোড়নে কারিপাতার স্বাদ তো কোনোটায় তেঁতুল – টম্যাটোয় পাতলা ঝোলে আদা বাটার ঝাঁঝ……….এ যেন অমৃত সুখ৷ তবে এখানকার আরও একটা বিখ্যাত জিনিস হল ছোট শার্ক৷ হাঙরের মাংস শুকিয়ে কাঁচা-লঙ্কা সর্ষে বাটা দিয়ে কষিয়ে রান্না হয়৷ ইচ্ছা হলে এটিরও স্বাদ নেওয়া যেতে পারে৷
    এরপর গোধুলি বেলায় কোভালামের নীল-সবুজ জলের পারে আস্তে-আস্তে আনন্দমুখর হয়ে উঠল সারি সারি গুমটির হলুদ আলো এবং মাছ ভাজার ঘ্রাণ৷ মিউজিক আর প্রাণের স্পন্দন৷ আর তেষ্টা পেতেই গলা ভেজানো যেতে পারে পাতিলেবু, মুসাম্বি, আদা, এলাচ, লঙ্কা দিয়ে বানানো ওখানকার বিখ্যাত ব্ল্যক-কফি ও ফ্রেশ লাইমের ফিউশন৷ এক চুমুকেই শরীর ও মন তরতাজা৷
    আর যদি ভাগ্য ভালো থাকে তবে অচিরেই সুখ পাওয়া যেতে পারে শ্রাবনের আকাশের কালো মেঘের দমকা হাওয়া এবং ঘুটঘুটে অন্ধকার ও নিস্তব্ধতা৷ চোখের সুখ বলতে কেবল দূরে কুয়াশায় ঢাকা দিগন্তে লাইট হাউসের আলো, সাথে সমুদ্রের ঢেউয়ের অদ্ভুত শব্দধ্বনি৷ মন-প্রাণ সব উজাড় করে দেবার ইচ্ছা৷ মাঝে মাঝে দূরে তকালে আবছা আলোয় দেখা যেতে পারে জাহাজের অবয়ব৷ বৃষ্টির স্পর্শ না থাকলেও ঠান্ডার স্নেহময় স্পর্শে মন আর্দ্র হবেই৷
    এরপর পরিযায়ী পাখির সন্ধানে গাড়িতে কিছুটা দূরে যাওয়াই যেতে পারে “পুলিকট হ্রদে “৷ সেখানে দেখা মিলতে পারে নানা পরিযানের; যেমন ফ্লেমিংগো, পেলিকান, হেরন, বালি হাঁসের৷
    এই তো গেল কোভালাম এর গল্প; হাতে যদি আর কয়েকটা দিন সময় বেশি থাকে তবে কোভালাম থেকে আরেকটু দূরে আরেক সমুদ্রতট “মহাবলীপুরমে”৷ আর সে পথেই পড়বে “গোল্ডেন বীচ”৷ তামিলনাড়ুর ‘কোভালাম’ তো বটেই তার সাথে ‘মহাবলীপুরমেরও’ কিন্তু জুড়ি মেলা ভার৷ এক কথায় মন ও প্রাণ ভরে খোলা বাতাস নেওয়ার জন্য তামিলনাড়ু ঘুরে আসলে মন্দ হয় না।


    Spread the love