মৃদুল শ্রীমানীর ধারাবাহিক

    0
    13
    জন্ম- ১৯৬৭, বরানগর। বর্তমানে দার্জিলিং জেলার মিরিক মহকুমার উপশাসক ও উপসমাহর্তা পদে আসীন। চাকরীসূত্রে ও দৈনন্দিন কাজের অভিজ্ঞতায় মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষের সমস্যা সমাধানে তাঁর লেখনী সোচ্চার।
    Spread the love

    মহা প্রাচীন ভারতের জেনেটিক্স ( নতুন পর্ব ১ থেকে ১২)

    পর্ব ১।

    ব্রহ্মপুত্রের নদীজন্ম

    ব্রহ্মা ছিলেন প্রাচীন ভারতের খুব গুরুত্বপূর্ণ দেবতা। ওঁকে পিতামহ বলা হত। প্রজাপতিও বলা হত। তো এই ব্রহ্মা একবার মহর্ষি শান্তনুর অপরূপ লাবণ্যবতী স্ত্রী অমোঘা কে একাকী দেখে কামাতুর হয়ে পড়েন। তিনি অমোঘার কাছে সঙ্গম প্রার্থনা করলেন। কিন্তু অমোঘা ছিলেন ডাকসাইটে সতী। ব্রহ্মার অসঙ্গত আবদারে রুষ্ট হয়ে ঋষি পত্নী অমোঘা তাঁকে অভিশাপ দিতে উদ্যত হন। তাঁর শাপ ভয়ে ব্রহ্মা তাঁকে ধর্ষণ করতে সাহস না পেয়ে আশ্রম দ্বারে বীর্যপাত করে হংস রূপ ধরে পালান। মহর্ষি শান্তনু আশ্রমে ফিরে এসে আশ্রম দ্বারে হংস পদচিহ্ন দেখে সন্দিগ্ধ হন। শেষে স্ত্রীর কাছে জিজ্ঞাসাবাদ করে ব্রহ্মার কীর্তি কলাপ জানতে পারেন। কিন্তু তাঁর সাধ্বী স্ত্রী ব্রহ্মার মত গুরুত্বপূর্ণ দেবতাকে ভাগিয়ে দিয়েছেন জেনে মনঃক্ষুণ্ন হলেন। স্ত্রীর উপর বেশ একটু বিরক্তিও প্রকাশ করলেন। তারপর সবদিক ভেবে চিন্তে তিনি প্রজাপতি ব্রহ্মার বীর্য নষ্ট না করার পক্ষে মত দেন। নিজের সতী সাধ্বী পত্নী অমোঘাকে তিনি ব্রহ্মবীর্য পান করতে নির্দেশ দেন। বলেন লোকহিতের স্বার্থে তুমি এই বীর্য গ্রহণ করো।
    ঋষি পত্নী অমোঘা শুধু সতী ছিলেন না। তাঁর মাথায় বুদ্ধি শুদ্ধিও কিছু ছিল। পলিটিক্যালি কারেক্ট থাকার দায়ে তিনি স্বামীকে অনুরোধ করেন আপনি এই ব্রহ্মবীর্য পান করে তার পর আমায় প্রসাদ দিন। মহর্ষি এ কথায় না করতে পারলেন না।
    এই রকম ব্যবস্থার পর অমোঘা গর্ভবতী হলেন। ব্রহ্মবীর্যে তাঁর অভ্যন্তরে বিপুল জলরাশির সঞ্চার হল।
    অমোঘার গর্ভে জন্ম নিলেন ব্রহ্মপুত্র নদ। মহর্ষি শান্তনু সেই জলরাশিকে কৈলাস, গন্ধমাদন, জারুধি ও সংবর্তক এই চার পর্বত দিয়ে ঘেরা এক কুণ্ডে রক্ষা করলেন। এই কুণ্ডে স্নান করে মাতৃহননকারী পরশুরাম শাপমুক্ত হন। পরে পৃথিবীর মঙ্গলের জন্য পরশুরাম এই কুণ্ড থেকে এই বিপুল জলরাশির প্রবাহপথ তৈরি করে দিলেন।

    পর্ব ২।

    কাকে বলে অরণি, কার নাম টিয়া পাখি

    পরাশর ঋষির কামনায় সত্যবতী নামে এক কুমারী কন্যার গর্ভে মহর্ষি কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস জন্মান, সে গল্প আগেই করেছি। এই গল্পও বলেছি যে, সেই সত্যবতীর আহ্বানে বিচিত্রবীর্যের স্ত্রীদ্বয় অম্বিকা ও অম্বালিকার গর্ভে যথাক্রমে ধৃতরাষ্ট্র ও পাণ্ডু ; এবং এক শূদ্রাণী গর্ভে মহাত্মা বিদুরের জন্ম দেন।
    কিন্তু এই ব্যাস মহাশয়ের পুত্রোৎপাদন আকাঙ্ক্ষা তাতেই নিবারিত হয় নি। আবার পুত্র কামনায় তিনি সুমেরু পর্বতে মহাদেবের তপস্যা শুরু করেন। কেমন পুত্র চাই মহাশয়ের? ব্যাসদেবের চাহিদার কথাটি শোনা যাক। পুত্র হবে অগ্নি, বায়ু, ভূমি ও আকাশের মত শক্তিশালী।
    সে রকম কামনা তো সোজা কামনা নয়। সুমেরু পর্বতে তপস্যা করতে করতে একশো বছর কেটে গেল ব্যাসদেবের। তখন মহাদেব ব্যাসকে বর দিলেন যে তেজোময়, কীর্তিমান ও বিক্রমশালী এক পুত্র হবে তোমার। যাও, এবার ঘরে ফিরে যাও। হোম করো গে।
    তো পুত্রকামনায় হোম যজ্ঞের রীতি ছিল মহা প্রাচীন ভারতে। ব্যাসদেবও হোমের আয়োজন করে কাঠ কুটো সাজালেন। তখন তো দিয়াশলাই ছিল না। কাঠে কাঠ ঘষে লোকে আগুন জ্বালত। সেই ঘর্ষণ কাষ্ঠকে ভালো কথায় বলত অরণি ।
    তো মহা প্রাচীন ভারতে অতীব সেক্সি মহিলারা ছিলেন। কেউ হোম যজ্ঞ করলে কেন কি করছে, কি করলে তা পণ্ড করা যায়, তার জন্য দেবরাজ ইন্দ্র এমন একটা টিম গঠন করেছিলেন। এই সব টপ সেক্সি মহিলারা অপ্সরা নামে সাধারণ ভাবে পরিচিত ছিলেন। উর্বশী, রম্ভা, মেনকা, তিলোত্তমা, ঘৃতাচী ছিলেন হাই লেভেল অপ্সরা। বড় বড় ধ্যানী জিতেন্দ্রিয় ব্রহ্মচারী মুনি ঋষিকে পকেটে পুরে ফেলা ছিল এঁদের বাম হাতের খেল। তো এই টপ লেভেল অপ্সরা গোষ্ঠীর একজন ঘৃতাচী টুকি দিতে এলেন হোমের আয়োজন করে অরণি কাষ্ঠ ঘষতে থাকা ব্যাসদেবের চোখের সামনে। ব্যস, হয়ে গেল। অমন ডাকসাইটে সুন্দরী দেখে ব্যাসদেবের রেতঃপাত হয়ে গেল। মহর্ষি ঠাকুরের শুক্র ছিটকে গিয়ে একেবারে পড়বি তো পড় ওই পবিত্র অরণি কাষ্ঠের মধ্যে। ব্যাসদেব কামোত্তেজনায় ওই শুক্র লিপ্ত অরণি কাঠকেই অতি প্রবল ভাবে ঘষতে লাগল। কামার্ত ব্যাসদেবের চেহারা যে কেমন হয়, ভাল জানতেন অম্বিকা আর অম্বালিকা। ভয়ে চোখ বুজে ফেলেছিল অম্বিকা। আতঙ্কে হী হী করে কেঁপেছিল অম্বালিকা। ওরা রীতিমতো রাজকন্যা ছিল। এনিমিয়া গ্রস্ত পানাপুকুরে স্নান করা গ্রামবাংলার মেয়ে ছিল না। তবু ব্যাসদেবের ভয়াবহ লিঙ্গ দর্শনে ওদের ওই অবস্থা হয়েছিল। ঘৃতাচীই বা পার পাবে কেন। ব্যাসদেবের কামোন্মত্ত চেহারা দেখে সে একটা টিয়া পাখির রূপ ধরে পালিয়ে বাঁচে।
    টিয়া পাখিকে ভাল কথায় বলে শুকপাখি। ব্যাসের অরণি মন্থন থেকে অতি পবিত্র জিতেন্দ্রিয় এক ঋষিকুমার জন্মাল। তিনি শুকদেব। টিয়া পাখিকে ভুলতে পারেন নি মহর্ষি ব্যাসদেব।

    পর্ব ৩।

    পুঞ্জিকস্থলার কথা

    সেই যে বেণ রাজার গল্প বলেছিলাম, আর তাঁর মৃতদেহটির দক্ষিণ হস্ত মন্থন করে জন্মানো সন্তান পৃথুর কথা বলেছিলাম, আর বলেছিলাম ইক্ষাকুর পুত্র নিমির কথা। নিমি বশিষ্ঠের শাপে মারা পড়েন, আর তাঁরও মৃতদেহ মন্থন করে জনক বা মিথি নামে পুত্রের জন্ম হয়। দুটি ক্ষেত্রেই মৃতদেহ মন্থন করে পুত্রজন্ম দেবার ব্যবস্থা করেন মুনি ঋষিরা। তারা বিস্তর জেনেটিক্স জানতেন। তবে বেণ সহজে পুত্র উৎপাদন করার একটি বিশেষ কৌশল উদ্ভাবন করেছিলেন। সেটি অতি সহজ ও সরল। একের স্ত্রীতে অন্যের নিয়োগ ছিল সেই টেকনিকের মূল বিষয়। একে প্রাণ ভরে সাপোর্ট করেছিলেন মহর্ষি আরুণি উদ্দালকের পুত্র শ্বেতকেতু । শ্বেতকেতুকে উদ্দালক বলেছিলেন সকল স্ত্রীই গাভীদের মত স্বাধীন। সহস্র পুরুষে আসক্ত হলেও তাঁদের অধর্ম হয় না। উদ্দালক জোর দিয়ে বলেছেন এটাই সনাতন ধর্ম। শ্বেতকেতু কিন্তু পিতৃবাক্য খুব একটা ভালো মনে নেন নি। তিনি সন্তান উৎপাদন ক্রিয়ায় অসমর্থ ব্যক্তিদের উদ্ধার করতে বিধান দেন একজন পুরুষ তার স্ত্রীর গর্ভে সন্তান কামনা করে অন্য পুরুষ নিয়োগ করতে পারবেন। এই সন্তান কিন্তু ওই অসমর্থ ব্যক্তির সন্তান হিসেবেই সমাজ স্বীকৃতি পাবে। আমাদের ধৃতরাষ্ট্র ও পাণ্ডু এইভাবে মহর্ষি কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন ব্যাসের ঔরসজাত হয়েও বিচিত্রবীর্যের সন্তান। আর যুধিষ্ঠির ভীম ইত্যাদি পঞ্চ পাণ্ডবদের জন্ম ধর্ম, বায়ু, ইন্দ্র ও অশ্বিনীকুমারদ্বয় এর ঔরসে হলেও ওঁরা পাণ্ডুর পুত্র হিসেবে স্বীকৃতি প্রাপ্ত।
    এইভাবে যে শারীরিক অক্ষমতাকে পাশ কাটিয়ে সন্তান উৎপাদন এর সহজ সাধনা মহা প্রাচীন ভারতে শাস্ত্রবিধিসম্মত ছিল। এভাবে জন্মানো সন্তানদের ক্ষেত্রজ সন্তান বলা হত। তবে এটা পুরুষদের একচেটিয়া একতিয়ার ছিল। শ্বেতকেতু আবার বলে দিয়েছিলেন স্বামী এইভাবে অন্যের ঔরসে পুত্র উৎপাদন করে দিতে বললে স্ত্রীরা সেই আদেশ মান্য করতে বাধ্য থাকবেন। আমাদের প্রিয় হনুমান মহাশয় ছিলেন এইরকম বিশিষ্ট ক্ষেত্রজ সন্তান।
    মহা প্রাচীন ভারতে ব্রহ্মার নাতির ছেলে রাবণ, যিনি একজন মুনিপুত্র, (অর্থাৎ এখনকার ভাষায় এলিট ক্লাসের লোক ছিলেন) তিনি ছিলেন একজন বিশিষ্ট ধর্ষক। নারী ধর্ষণ ছাড়াও শ্লীলতাহানির মতো কাজে রাবণরাজার প্রগাঢ় আগ্রহ ছিল। মুনিপুত্র রাবণ বেদবতী এবং রম্ভা সহ অনেক মহিলাকে ধর্ষণ করেছিলেন। নারীর বিরুদ্ধে অপরাধের বিচারে মহা প্রাচীন ভারতীয় আইন দীর্ঘসূত্রিতার ঐতিহ্য বহন করে আসছে। বহুবার নারী ধর্ষণে অভিযুক্ত রাবণের শাস্তি দিতে মহা প্রাচীন ভারতীয় বিচার ব্যবস্থা যুগের পর যুগ লাগিয়ে দিয়েছে। তো রাবণের হাতে লাঞ্ছিতা অজস্র মেয়ের একটি ছিলেন পুঞ্জিকস্থলা। অতীব সুন্দরী এই মহিলা ছিলেন অপ্সরী এবং দেবরাজ ইন্দ্রের টিমের একজন। আগেই বলেছি দেবরাজ বিশিষ্ট ব্যক্তিদের যজ্ঞ করার খবরাখবর রাখতেন ও ইনফিরিওরিটি কমপ্লেক্স থেকে সেই যজ্ঞ নষ্ট করাতে এক একটা অপ্সরীকে কাজ দিতেন। এই কাজে রিস্ক ছিল সাংঘাতিক। মাতাহারির মতোই সে যুগের অপ্সরীগণ প্রাণ হাতে নিয়ে কাজ করতেন।
    তো আমাদের পুঞ্জিকস্থলা একবার ব্রহ্মার কাছে যাচ্ছিলেন। পথে রাবণ এই মহিলার শ্লীলতাহানি করেন ও বিবসনা করেন। রাবণের বিরুদ্ধে সে মেয়ে ব্রহ্মার কাছে অভিযোগ করেন। নাতির ছেলে রাবণকে ব্রহ্মা সতর্ক করে দেন যে এমন যেন ভবিষ্যতে আর না হয়।
    যাই হোক পেশাগত দায়িত্বে ইন্দ্রের নির্দেশে মার্কণ্ডেয় মুনির তপস্যা ভঙ্গ করতে গিয়ে পুঞ্জিকস্থলা অকৃতকার্য হয়। মার্কণ্ডেয় মুনি তাকে অভিশাপ দেন। তাতে তার বানরজন্ম হয়। কুঞ্জর নামে এক বানর রাজার কন্যা হিসেবে জন্মান সেই পুঞ্জিকস্থলা। বানর রাজকন্যার নাম হল অঞ্জনা। আরেক বানর রাজা কেশরীর সাথে অঞ্জনার বিবাহ হয়।
    বানরী হলে কি হবে, অঞ্জনা শাড়ি পরতেন জমকালো করে। রাজকুমারী সুলভ বিকেলে বাগানে বেড়াবার অভ্যাসও তাঁর ছিল। পবনদেব এই মহিলাকে দেখে দুষ্টুমি করে তাঁর শাড়িটি উড়িয়ে দেন। মেয়েদের শাড়ি উড়িয়ে দেবার অভ্যাসটি পবনদেবতা বেশ রপ্ত করেছিলেন। তিনি একবার গঙ্গার শাড়িও উড়িয়ে নিয়েছিলেন। সে আবার বাগানে নয়, একেবারে দেবসভার মাঝ খানে। গঙ্গা ছিলেন ভারি স্মার্ট পোস্ট মডার্ন মেয়ে। পোশাকহীনতা নিয়ে তিনি মাথা ব্যথা করেন নি। কিন্তু আচমকা বেআব্রু হয়ে যাওয়ায় অঞ্জনা বায়ুর উপর রাগ করলেন। তিরস্কার করলেন। তার কি আগেও একবার রাবণের হাতে বেইজ্জতির কথা মনে পড়ে গেল?
    পবনদেব তাঁকে আদর করে আলিঙ্গন করে বললেন, সুন্দরী গো, দোহাই দোহাই, রাগ কোরো না। আমি তোমায় পুত্রবতী করছি।
    অঞ্জনা এক গুহা মধ্যে হনুমানকে প্রসব করলেন। হনুমান বানর রাজ কেশরীর ক্ষেত্রজ পুত্র হিসেবে সামাজিক পরিচিতি পান। এই হনুমান বড় হয়ে ব্রাহ্মণবেশে রাবণ মহিষী মন্দোদরীর কাছ থেকে রাবণের মৃত্যুবাণ ভিক্ষা করে আনেন। তাতে কি পুঞ্জিকস্থলার একটুও মনোকষ্ট নিবারিত হয়েছিল?

    পর্ব ৪।

    কোলাহল নামে পর্বত আর শক্তিমতী নামে নদী

    সেকালে এক ভারি নামকরা রাজা ছিলেন উপরিচর বসু। “উপরিচর” এঁর সাম্মানিক উপাধি। কেননা, এই বসু রাজা ইন্দ্রের উপহার দেওয়া বিমানে আকাশে ঘুরে বেড়াতেন। ইন্দ্র আসলে বসুকে বেশ একটু সমঝেই চলতেন। বিমানের সাথে ইন্দ্র ওঁকে আরো কিছু দামি জিনিস উপহার দিয়েছিলেন। এই বসু রাজার রাজধানীর কাছে শক্তিমতী নামে একটি নদী ছিল। কাছেই ছিল একটি পর্বত। নাম তার কোলাহল। সেকালে নদী পাহাড় এরা সব সচেতন ও সচল ছিল। কোলাহল পাহাড় ছিল কামান্ধ। শক্তিমতী নদীর উপর তার কুনজর ছিল। এখন দুষ্ট বুদ্ধি প্রভাবিত হয়ে কোলাহল পাহাড় করল কি শক্তিমতী নদীকে আক্রমণ করে বসল। নদীকে আটকালো ঘেরাটোপে। আর জোর করে সঙ্গম করলো। অপমানিতা ধর্ষিতা নদীর কান্না বসু রাজার কানে গেল। বসুরাজা ছিলেন ভদ্রলোক। ধর্ষিতার কান্না শুনে ‘এমনটা তো হয়েই থাকে’ বলে খ্যা খ্যা করে হাসবার মতো শাসক তিনি ছিলেন না। অন্যায়ের প্রতিকার করার ন্যায়বুদ্ধি তিনি বিসর্জন দেন নি। তো বসুরাজা পর্বতের অন্যায় ব্যবহারে ক্রুদ্ধ হয়ে এক লাথি মেরে পাহাড় বিদীর্ণ করে নদীকে বন্দীদশা থেকে মুক্তি দেন। কোলাহলের অন্যায় সঙ্গমে ইতিমধ্যেই শক্তিমতী নদী গর্ভবতী হয়েছিলেন। নদীর গর্ভে যথাকালে জন্মাল একটি পুত্র ও একটি কন্যা। কিন্তু অন্যায় অত্যাচারের স্মারক সেই গর্ভজাত পুত্র ও কন্যাকে শক্তিমতী নদী রাখতে চাইলেন না। তিনি ওদের রাজার হাতেই অর্পণ করলেন। উপরিচর বসু রাজ দায়িত্বে সেই নবজাত শিশুদের পালনের দায়িত্ব নিলেন ।

    পর্ব ৫।

    অগস্ত্য আর লোপামুদ্রা

    সেই সেকালে ছিলেন এক মহাতেজা মুনি। নাম তাঁর অগস্ত্য। আদিত্য যজ্ঞে উর্বশীকে দেখে উচ্চপদস্থ বৈদিক দেবতাদ্বয় মিত্র এবং বরুণ, দুজনেই তীব্র কামার্ত হয়ে যজ্ঞের কলসির মধ্যেই রেতঃপাত করেছিলেন। এই রেতঃপ্রবাহ থেকে দু দুটি নামকরা মুনির জন্ম হয়। তাঁদের একজন অগস্ত্য আর অন্যজন বশিষ্ঠ।
    অগস্ত্যের একবার ইচ্ছা হল বংশরক্ষা করবেন। তখন তিনি জেনেটিক্স চর্চা করে পৃথিবীর সমস্ত প্রাণীর সুন্দর ও শ্রেষ্ঠ অংশ সংগ্রহ ও সমন্বয় করে এক পরমাসুন্দরী নারীর জন্ম দেন। মেয়ের নামও মুনি ভালোই নির্বাচন করলেন। নাম দিলেন লোপামুদ্রা। এই নামের পিছনে যুক্তি ছিল যে সমস্ত জীবের সৌন্দর্যের শ্রেষ্ঠ জিনিস এই নারী লোপ করে নিয়েছেন।
    অগস্ত্য মুনি পরমাসুন্দরী কন্যাটি তো সৃষ্টি করলেন। এখন শিশুটি পালন করে কে?
    বিদর্ভরাজের হাতে দেওয়া হল লোপামুদ্রাকে বড়ো করার ভার। বিদর্ভরাজ সে কাজ দায়িত্বের সাথে করছিলেন।
    মেয়ে বড় হয়ে আরো সুন্দর হয়েছে শুনে একদিন অগস্ত্য ফিরে এলেন। এসেই লোপামুদ্রাকে স্ত্রী রূপে প্রার্থনা করলেন। লৌকিক বুদ্ধিতে বিদর্ভরাজের মনটা কেমন করে উঠল। যিনি সৃষ্টি করেন, তিনি তো পিতা। পিতা হয়ে কন্যাগমন করতে চান অগস্ত্য!
    কিন্তু অনিচ্ছা সত্ত্বেও মুনির হাতেই লোপামুদ্রাকে তুলে দিতে হল।
    একদিন ঋতুস্নান করে সৃষ্টি কর্তা অগস্ত্যের কাছে সে কন্যা এলে মুনি তাকে পুত্রোৎপাদনের জন্য আহ্বান করলেন। লোপামুদ্রার গর্ভে জন্ম নিল দৃঢ়স্যু নামে এক বলিষ্ঠ ও শক্তিশালী পুত্র।

    পর্ব ৬।

    গিরিকা, অদ্রিকা আর রাজা উপরিচর বসু

    সেই যে কন্যাসমাকে স্ত্রী হিসেবে প্রার্থনা করেছিলেন মহামুনি অগস্ত, রাজা উপরিচর বসুও অনেকটা অমন কাজ করেছিলেন। সেই যে কোলাহল পর্বতের দ্বারা ধর্ষিতা নদী শক্তিমতীর পুত্র ও কন্যাকে রক্ষার দায়ভার তিনি নিলেন, সেই পুত্রকে করলেন রাজ্যের সেনাপ্রধান আর মেয়েটিকে, ওর নাম রেখেছিলেন গিরিকা , তাকে করলেন মহিষী।
    একবার মৃগয়াকালে রাজার মনে পড়ে গেল সুন্দরী গিরিকার কথা। বসুরাজা কামাবিষ্ট হলেন। তাঁর শুক্র স্খলন হল। রেতঃপাত নিয়ে সেকালে আদৌ ঘিন ঘিনানি ছিল না। সবাই এটাকে দেহের স্বাভাবিক ক্রিয়া বলে জানতো। শুক্রপাত হলে গেল গেল রব তোলার বাতিক তাদের অজানা ছিল। তো রাজা মশাই তাঁর স্খলিত শুক্র একটি শ্যেন পক্ষীর দ্বারা রানী গিরিকার কাছে পাঠালেন। কিন্তু পথে আর একটি শ্যেন পক্ষী রাজার শুক্রবাহী পাখিটিকে আক্রমণ করে। রাজার শুক্র দুই পাখির ঝটাপটিতে একেবারে জলে।
    ইশশ, রাজ শুক্র জলে গেল?
    না, না, সেখানে অপেক্ষা করছিল একটা মাছ। সেই মাছ গ্রহণ করল রাজা উপরিচর বসুর মহার্ঘ শুক্র।
    নদীর নামটি যমুনা। যমুনার কালো জলে সেই যে মাছ, আসলে সে মাছ নয়। শাপভ্রষ্ট অপ্সরী। নাম তার অদ্রিকা। অদ্রিকা পেল গিরিকার পাওনা জিনিস। রাজবীর্য। এবং গর্ভিণী হল। মৎস্যজীবীর জালে ধরা পড়া মাছের পেট থেকে বের হল ভারি চমৎকার দু দুটো ফুটফুটে ছেলে মেয়ে। রাজা খোঁজ করে ছেলেটিকে ঘরে আনলেন। মেয়ে পড়ে রইল ধীবরদের কাছে। সেই মেয়ে সত্যবতী হয়ে ব্যাসদেবের কুমারী মা হবেন। তারপর হবেন কুরুরাজ শান্তনুর স্ত্রী। সে অন্য গল্প।

    পর্ব ৭। 

    কিমিন্দম মুনি আর পাণ্ডু রাজা

    আমাদের ধৃতরাষ্ট্রের ছোট ভাই পাণ্ডুর বিয়ে হয়েছিল দুজনের সাথে। কুন্তিভোজ রাজার পালিতা কন্যা, যিনি প্রকৃত পক্ষে রাজা শূরের ঔরসজাত কন্যা ছিলেন, সেই কুন্তী; এবং মদ্ররাজ শল্যের ভগিনী মাদ্রী। এই দুইটি বউকে নিয়ে পাণ্ডুরাজা বনে বনে মধুচন্দ্রিমা করছিলেন। এমন একদিন রাজা মশাইয়ের মৃগয়া করতে ইচ্ছে হল। মৃগ মানে এখনকার ভাষায় হরিণ হলেও তখনকার দিনের ভাষায় মৃগ মানে ছিল পশু। মৃগেন্দ্র অর্থে সিংহ এবং শাখামৃগ অর্থে বানর কথায় তার ছাপ ধরা আছে।
    যাই হোক, পাণ্ডু রাজা বনে বিচরণ কালে মৈথুনরত এক মৃগ দম্পতিকে শরবিদ্ধ করেন। আহত মৃগটি ভূপতিত হয়ে বলে যে সে কিমিন্দম মুনি। পুত্র কামনায় মৃগ রূপ ধরে দাম্পত্য ক্রিয়া করছিলেন তিনি। পাণ্ডু তো শুনে হতবাক। ব্রহ্মশাপ লেগে বংশনাশ হয় আর কি। কিন্তু ব্রহ্ম শাপ লাগল না। কেননা, পাণ্ডু তো আর মুনি জেনে ওঁকে হত্যা করেন নি। হরিণ ভেবে করেছেন। কিন্তু কিমিন্দম মুনি বলে গেলেন স্ত্রী সঙ্গম কালেই পাণ্ডুর মৃত্যু হবে।
    পাণ্ডু পড়লেন মহা জ্বালায়। দু দুটো টুকটুকে বউ । এদিকে দাম্পত্য ক্রিয়া করবার যো নেই। কেননা, কিমিন্দম মুনি ও রাস্তা আটকে দিয়েছেন। পাণ্ডু পড়লেন মহা বিপদে।
    অবশ্য কুন্তীর কাছে এর একটি সমাধানের রূপরেখা ছিল। কুন্তী স্মার্ট মেয়ে। সে স্বামীকে ব্যুষিতাশ্বের গল্প বললো । আর কানে কানে দুর্বাসা মুনির দেওয়া একটা বরের কথাও বললো।

    পর্ব ৮। 

    ব্যুষিতাশ্ব আর পাণ্ডু রাজা

    কুন্তী ছিলেন দারুণ সেক্স পটীয়সী। সূর্যের সাথে কন্যাকালে কুন্তীর সেক্স করার গল্প তো জগদ বিখ্যাত। আর তিনি সেক্স ব্যাপারে নানা খবরাখবর রাখতেন। কুন্তী বললেন শোনো রাজা ব্যুষিতাশ্ব যক্ষ্মা রোগে প্রাণ ত্যাগ করার পরেও তাঁর নিঃসন্তান মহিষী ভদ্রার গর্ভে তার ছেলে হয়েছিল।
    সরল প্রাণে পাণ্ডু বললেন, তা হলে তিনি নিশ্চয় মৃত্যুর আগেই রাণিকে গর্ভবতী করে গিয়েছিলেন।
    কুন্তী বললেন না গো রাজা। মৃত্যুর পরেই ওঁর রাণি ভদ্রা রাজার দ্বারা গর্ভবতী হন।
    পাণ্ডু বললেন সেকি? মৃত্যুর পরে যৌন সঙ্গম? মৃতের সাথে সেক্স? কি বলছো রাণি?
    কুন্তী বললেন, তাহলে আর বলছি কি? সেই রাজা অবশ্য অত্যন্ত বেশি বেশি ইন্দ্রিয়পরায়ণ ছিলেন। ওই কাজ বেশি করলে যক্ষ্মা হয় জানো তো?
    তো রাজা তো মারা পড়লেন টিবি হয়ে। তখন তো আর টিবির চিকিৎসা বের হয় নি। এবার ভদ্রা, ব্যুষিতাশ্ব রাজার ভারি সুন্দরী রাণি খুব কাঁদছেন। তিনি তো সতী সাধ্বী । কিন্তু নিঃসন্তান। এবার বিধবা হয়েছে। তাহলে সারাজীবনের অবলম্বন কি হবে?
    পাণ্ডু বললেন তা কি করে কি হল?
    জানো তো রূপবতী ভদ্রা ছিলেন রাজর্ষি কাক্ষীবানের কন্যা।
    কাক্ষীবানের নাম তো শুনেছ? ও শোনো নি বুঝি? তো বলি রাজার নাম তো জানো? বলি ছিলেন ঊর্ধরেতা। রাজা, ঊর্ধরেতা কাকে বলে জানো?
    পাণ্ডুর মনে পড়ে গেল ভীষ্মের কথা। মুখে বললেন জানি জানি। যার বীর্যপাত হওয়া বন্ধ ।
    কুন্তী বললেন বলি ঊর্ধরেতা ছিলেন। এদিকে পুত্র দরকার। বলি তার স্ত্রী সুদেষ্ণার জন্য দীর্ঘতমা মুনির সাথে যোগাযোগ করলেন ।
    রাজা, দীর্ঘতমা কে জানো?
    জানি রানী । উতথ্যের ঔরসজাত মমতার গর্ভস্থ যে ভ্রূণ তার কাকা বৃহস্পতিকে ধর্ষণ করতে বাধা দিয়েছিল। তুমি আসল গল্পে এস রানি।
    বলছি বলছি। সবটা খুলেই বলা দরকার। তো দীর্ঘতমা মুনির চেহারা ছবি দেখে সুদেষ্ণার মোটেও ভালো লাগে নি। একে কাঠ কাঠ বুড়ো। তায় চোখে দেখে না। দীর্ঘতমা মুনির যৌন সঙ্গ সুদেষ্ণার তো ভাল না লাগারই কথা। তো সে করলো কি দীর্ঘতমা মুনির কাছে পাঠিয়ে দিল এক দাসীকে।
    পাণ্ডুর মনে পড়ে গেল বিদুরের কথা। সেই ভাইটা তো ব্যাসের ঔরসে দাসী গর্ভজাত সন্তান। কিন্তু প্রকাশ্যে কিছু বললো না। জানতে চাইল তার পর?
    কুন্তী বললো, শেষে বলি রাজার চাপে সুদেষ্ণাকে ওই দীর্ঘতমা মুনির সাথেই …। দীর্ঘতমা মুনি সুদেষ্ণার অঙ্গ স্পর্শ করে অঙ্গ বঙ্গ কলিঙ্গ পুন্ড্র আর সুহ্ম নামে বলিরাজার পাঁচটি পুত্রের জন্ম দিলেন।
    আর কাক্ষীবান? পাণ্ডু জানতে চাইলেন।
    কাক্ষীবান? সে তো সুদেষ্ণার সেই দাসীর গর্ভে জন্মানো পুত্র। তিনি এক মহা ঋষি হয়েছিলেন। লোকে তাঁকে রাজর্ষি বলতো। ব্যুষিতাশ্ব রাজার রাণী ভদ্রা ছিল এই রাজর্ষি কাক্ষীবানের কন্যা।
    তো ভদ্রার সন্তানবতী হবার গল্প বলো রাণী?
    বলছি, বলছি। নিঃসন্তান মহিষী ভদ্রার করুণ কান্নায় বিগলিত হয়ে ব্যুষিতাশ্ব রাজা বললেন …
    কি যে বলো রাণি … এই বলছো মারা গিয়েছে বলে ভদ্রা কাঁদছিলেন। আবার বলছো ব্যুষিতাশ্ব রাজা বললেন …।
    না, ব্যুষিতাশ্ব রাজা দৈববাণী করলেন চতুর্দশী বা অষ্টমীতে ঋতুস্নান করে মৃত পতির সহিত ভদ্রা নিজ শয্যায় শয়ন করলে ব্যুষিতাশ্ব রাজা নিজের শবে আবির্ভূত হয়ে রাণির গর্ভে সন্তান উৎপাদন করবেন। সেই উপদেশ অনুসারে মৃত পতির সহিত শব-সংসর্গে ভদ্রার গর্ভে তিনজন শাম্ব ও চারজন মদ্রের জন্ম হয়।
    পাণ্ডু বললেন, শবের সাথে যৌনমিলনে তিন আর চার, সাত সাতটা বাচ্চা? কি গাঁজাখুরি গপ্পো ফাঁদলে রাণী ?
    তোমাদের ফ্যামিলি সিক্রেট রাজা। ব্যুষিতাশ্ব পুরুবংশীয় রাজা ছিলেন।
    পাণ্ডুর চোয়াল ঝুলে গেল।

    পর্ব ৯।

    দুর্বাসা আর পাণ্ডু রাজা

    কুন্তীকে পাণ্ডুরাজা মুখের উপর বলে দিলেন আমি এখন মরতে টরতে পারবো না।
    কুন্তী স্মার্ট মেয়ে। বলল, বালাই ষাট । কেন মরবে তুমি? আমরা তো বেশ আছি।
    না না, আমার বাচ্চা চাই। পাণ্ডু বললেন।
    কুন্তী বললেন কিন্তু কিমিন্দম মুনি যে …
    পাণ্ডু বললেন রাণি তুমি যে দুর্বাসা মুনির কথা বলছিলে। সে বদমাশটা সকলকে বিপদে ফেলে জানি। তুমি নির্ঘাত অঘটনঘটনপটিয়সী, ওই বদমাশটার কাছেও বর বাগাতে পেরেছ?
    কুন্তী বললেন সে তো কোনো লোককে আহ্বান করে তার সাথে যৌন সঙ্গম করতে হবে। হয় ব্রাহ্মণ, নয় দেবতা।
    ব্রাহ্মণের সাথে যৌন সঙ্গম কেমন সে তো পাণ্ডু ভালোই জানেন। ব্যাসদেবের ঔরসে অম্বালিকা গর্ভে তিনি জন্মেছেন। ব্যাসদেবের লিঙ্গ দর্শনে কাশীরাজের ছোটমেয়ে অম্বালিকা কেমন ভীষণ ভয়ে বাঁশ পাতার মতো কেঁপেছিলেন । আর মেজোমেয়ে অম্বিকা ভয়ে চোখ বুজে ফেলেছিলেন। তাইতে ধৃতরাষ্ট্র জন্মান্ধ আর তিনি পাণ্ডুবর্ণ। পাণ্ডুরাজা মুখে বললেন বামুন গোছের লোক ছাড়া কি ব্যবস্থা আছে বলো রানি।
    কুন্তী বললেন একটা তৎকাল সিস্টেম আছে অবশ্য। পাণ্ডুর মনে পড়ে গেল তার অফিসিয়াল বাবা বিচিত্রবীর্য বিয়ের পর মোটে সাত বছর বেঁচেছিল। তৎকাল সিস্টেমের ব্যবস্থা আছে জেনে খুশি খুশি মুখে কুন্তীকে বললো তাহলে ওই ব্যবস্থাই করো রানি।
    কুন্তী বললেন ব্রাহ্মণ দের কাছে দেরি লাগে। আর দেবতা ম্যানেজ করতে পারলে তাড়াতাড়ি হয়। পাণ্ডু তখন ধর্মকে আহ্বান করার জন্য কুন্তীকে অনুরোধ করেন। পাণ্ডু জানতেন তার ছোট ভাই দাসীগর্ভজাত বিদুর সাক্ষাৎ ধর্ম । শুধু দাসীর গর্ভে জন্মেছে বলে কেউ তাকে পাত্তা দেয় না। এবার ধর্ম আসুন রাণির গর্ভে । স্বাগত ধর্মরাজ । আমায় পিতা ডাক শোনার জন্য আশীর্বাদ করুন।
    কুন্তীর বাম স্তন টনটন করে উঠলো একটা শিশুর জন্য। কন্যাকালে যাকে জলে ভাসিয়ে দিয়েছেন। ঠোঁট কেঁপে উঠলো বলি বলি করে। বলে উঠতে পারলেন না কিছুতেই। রাজাকে আড়াল করে চোখের জল মুছলেন কুন্তী। রাজা জানতে চাইলেন কি হয়েছে।
    ধরা ধরা গলায় মা বললো চোখে কি একটা পড়েছে।
    রাজা কিছু একটা আন্দাজ করেও কিছু বললেন না।

    পর্ব ১০।

    গায়ের রং সবুজ। কিন্তু জামার রং লাল।

    যম নিয়ে গপ্পো গাছা।

    কুন্তী তো সন্তান উৎপাদন করার জন্য তৎকাল সিস্টেমে দেবতাদের সাথে সঙ্গম করবেন বলে পাণ্ডু রাজার অনুমতি পেয়ে গেলেন। এবার আর কুন্তীকে পায় কে। দুর্বাসা কুন্তীকে বর দিয়েছিলেন কুন্তী যাঁকেই ডাকবেন, তাঁকেই পাবেন। একেবারে ভিভি আই পি ব্যবস্থা। পাণ্ডু রাজা ধর্মকে চেয়েছিলেন। ধর্ম সে যুগে বেশ একজন গুরুত্বপূর্ণ দেবতা ছিলেন। আসলে তিনি যম। যমকে নিয়ে শতশৃঙ্গ পর্বতে গেলেন কুন্তী। তিনি জন্ম দেবেন যুধিষ্ঠিরের। কোল আলো করা খোকা দেখে পাণ্ডুর খুশি আর ধরে না। যমের গায়ের রং সবুজ। কিন্তু জামার রং লাল। যম হচ্ছেন পাপ পুণ্যের বিচারপতি কিন্তু সেই বিচারপতি মহাশয়ের বিচার করে দিয়েছিলেন মাণ্ডব্য নামে এক ঋষি। এই মাণ্ডব্য মহাশয়ের শাপেই যমকে মর্ত্যে বিদুর রূপে জন্মাতে হয়। সেই তিনিই আবার কুন্তীর প্রার্থনায় তাঁকে অঙ্কশায়িনী করলেন। বিদুর রূপে যদি যম জন্মেই থাকেন, তাহলে কি করে সেই একই যম কুন্তীর গর্ভে সন্তান উৎপাদন করছেন, আপনারা মনে মনে ভেবে নিন। তবে যম ছিলেন নরকের অধীশ্বর। যমের প্রসাদে উৎপন্ন যুধিষ্ঠিরও পায়ে হেঁটে স্বর্গে যাবার আগে নরকে একটু টুকি দেবেন। নরকের অধীশ্বর এই যম কিন্তু স্বর্গের দেবতা ছিলেন। আর দেবতাদের মধ্যে এই যমই ছিলেন সর্বাধিক পুণ্যবান। পুণ্যের চেহারাটা একটু দেখে রাখুন। ঋগ বেদ বলছেন, বিবস্বান ও সরন্যুর সন্তান যম এবং যমী। ওঁরা যমজ ভ্রাতা ও ভগিনী। যমজ শব্দটা কানে বাজল কি? ওর ভিতর যমকে খুঁজে পান? তো এই যম মহাশয়, যাকে লোকে ধর্মরাজ বলত, তিনি তাঁর সহোদরা বোন যমীর সহবাস আকাঙ্ক্ষা করেন। খুব ধর্মসম্মত আবদার তো বটেই। কিন্তু যমী ভাইয়ের সেই যৌন আবেদন প্রত্যাখ্যান করেন। যমের ঔরসে গর্ভধারণ করে কুন্তীর খুশি আর ধরছিল না। কেন বলুন তো? যম ছিলেন সূর্যের সন্তান। সূর্যের সাথে যৌন সঙ্গম কুন্তী করেছিলেন সেই কন্যাকালে। এবার সূর্য পুত্র যমের সাথেও যৌন সঙ্গম সমাধা হল। তাই কুন্তী এত খুশি।

    পর্ব ১১।

    কুন্তীর দারুণ সাফল্য

    কুন্তী যে সত্যি সত্যি ধর্মের মতো এলিট দেবতাকে ম্যানেজ করে ফেলতে পারবেন, সেটা সরল হৃদয় পাণ্ডু হিসেব করে উঠতে পারেন নি। কুন্তীর সাফল্য দেখে তো পাণ্ডু চমৎকৃত হয়ে গেলেন। তিনি কুন্তীর কাছে আবদার ধরলেন আবার সন্তান চাই। হ্যাঁ, পুত্র সন্তান। এবার কোন দেবতাকে ডেকে আনা যায়, ভাবতে বসলেন দুজনে। ঠিক হল বায়ুকে ডাকা হবে। বায়ুর শক্তি অসীম। বায়ুর ঔরসে কেশরীর ক্ষেত্রে অঞ্জনার গর্ভে হনুমান জন্মেছিলেন। পবনদেবতাকে স্মরণ করতেই তিনি এসে কুন্তীকে গর্ভবতী করলেন। জন্মালেন ভীমসেন। আসল খেলা জমল তার পর। ইচ্ছে করলেই দেবতা এসে যাচ্ছে। বলশালী পুত্র জন্মাচ্ছে দেখে পাণ্ডু ও কুন্তী দুজনেরই আত্মবিশ্বাস তুঙ্গে। ডাকো দেখি ইন্দ্রকে। ইন্দ্র ভারি ইন্দ্রিয়পরায়ণ দেবতা। নিপাট কামুক আর ভয়াবহ রকম পরশ্রীকাতরতা ছিল এই ইন্দ্রের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। সুন্দর মেয়ে শরীর দেখলে ইন্দ্র নিজেকে আর ধরে রাখতে পারত না। পাঠকের মনে থাকবে এই ইন্দ্র ঋক্ষরজা নামে বানর সুন্দরীকে দেখে তার চুলে রেত পাত করেছিলেন। চুল থেকে জন্মালো বালী। এই ইন্দ্র অহল্যা নামে নিষ্পাপ নারীর স্বামী সেজে তাকে ভুল বুঝিয়ে সঙ্গম করে। কুন্তীর আবেদনে ইন্দ্র জন্ম দিলেন অর্জুনকে। যে কেউ তপস্যা করলে ইন্দ্র নিজের সিংহাসনটি নিয়ে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হয়ে পড়তেন। ইন্দ্রের ছিল এক সাংঘাতিক অপ্সরা বাহিনী। তপস্যারত কত যে ঋষিমুনিকে এই অপ্সরারা বিপদে ফেলেছে, তার আর ইয়ত্তা নেই।

    পর্ব ১২।

    “ঘোড়া কর ভগবান”

    তিন তিনটি প্রধান দেবতার অঙ্কশায়িনী হয়ে পুত্র সন্তান জন্ম দেবার পরে কুন্তীর যেন মাটিতে পা পড়তে চায় না। এখন যেমন ডিজাইনার বেবির কনসেপ্ট তৈরি হয়েছে, সেকালে কুন্তী ব্যাপারটা করে দেখিয়েছেন দুর্বাসা মুনির বরে। বাড়িতে যে আরো একটা মেয়ে আছে, তারও যে যৌন খিদে থাকা খুব স্বাভাবিক, সেই কথাটা কুন্তী যেন ভুলেই রইলেন। এদিকে সাধারণ মেয়েদের তো বুক ফেটে যাবে, তবু মুখ ফুটবে না, মাদ্রীর হল তাই। ও মেয়ে রাতে কেঁদে কেঁদে চোখের জলে বালিশ ভেজাবে তবু কুন্তীর হাতে পায়ে ধরে দেবতা পটানো কৃৎ কৌশল প্যাঁচ পয়জার শিখবে না। দুই সতীনে একটু রেষারেষিও ছিল। মাদ্রীর দশা দেখে নেহাৎ অনিচ্ছুক কুন্তীও তাকে দুর্বাসার দেওয়া বরের একটু ভাগ দিলেন, রাস্তার কুকুরকে বিস্কুট ছুঁড়ে দেবার মতোন।
    যৌনতার খিদেয় কাতর হয়েছিলেন মাদ্রী, আর তাই কুন্তীর দেওয়া সুযোগ যে বার বার রিনিউ করা যাবে না, সেটা তিনি হিসেবের মধ্যে রেখেছিলেন। এখন যেমন গৃহবধূরা একটা কিনলে আরেকটা ফ্রি মন্ত্রে লুব্ধ হন, তেমন আকুতিতে মাদ্রী অশ্বিনীকুমারদ্বয়ের শরণ নিলেন।
    অশ্বিনীকুমারদ্বয় ছিলেন পরম সৌন্দর্যের অধিকারী। একইসাথে আবার চিকিৎসা বিদ্যায় অদ্বিতীয় পারদর্শী। এই দুই মনীষীর জন্ম রহস্যই আকৃষ্ট করেছিল মাদ্রীকে।
    সূর্যের একটি নাম ছিল বিবস্বান। বিবস্বান এর সাথে বিশ্বকর্মার কন্যা সংজ্ঞার বিবাহ হয়েছিল। বিয়ে হওয়া এক, আর সুখে শান্তিতে ঘর করা আরেক। তো সূর্যের প্রখর তেজের সাথে মানিয়ে চলা অতো সোজা নয়। সংজ্ঞারও ছিল নিজস্ব ব্যক্তিত্ব। সেও তো বিশ্বকর্মার মেয়ে। রোজ খিটিমিটির জীবন এড়িয়ে অদ্বিতীয় কারুকৃৎ বাপের মেয়ে সংজ্ঞা নিজের শরীর থেকে একটা ডামি বানালেন। ডামি মানে ডামি। দেখতে শুনতে হাবে ভাবে আচারে অনুশাসনে সেই ডামির নকলত্ব ধরে সাধ্য কার! সেই ডামি মেয়ের নাম রাখলেন ছায়া। এবার সেই ছায়াকে সংসার দেখার দায় চাপিয়ে সংজ্ঞা গেলেন বাপের বাড়ি। বিশ্বকর্মার কাছে।
    আদরের দুলালী মেয়েকে এতদিন পরে দেখে বিশ্বকর্মা কোথায় খুশি হবেন না, তা নয়, বকাবকি শুরু করলেন। তোমাকে স্বামীর ঘর করতে পাঠানো হয়েছিল, কে চলে আসতে বলেছে? বাপের চোখ দিয়ে নয়, পুরুষতন্ত্রের চোখ দিয়ে সংজ্ঞার চোখে চোখ রাখলেন মহর্ষি বিশ্বামিত্র। ধমক দিয়ে বললেন, যাও এখনি চলে যাও স্বামীর ঘরে। স্বামিসেবাই মেয়েদের পরম ধৰ্ম।
    সংজ্ঞাও তেমন মেয়ে। পুরুষতন্ত্রের কূটকচাল সে মেয়ের ভাল জানা ছিল। পিতা, পতি আর পুত্র, এই তিন শব্দ যে প আর ত দিয়ে মেয়েজন্মকে জব্দ করার কল, সেটা সংজ্ঞা ভালো ভাবেই বুঝেছিলেন। তো বাপের ঘরও ছাড়লেন তিনি। মেয়ে নামবে রাস্তায়।
    রাস্তায় নামব বলা সোজা। কিন্তু কাজে কঠিন। মেয়ে শরীর বড় বালাই। তার উচ্চাবচতা লুকানো কঠিন। এই সিদ্ধ সন্তের দেশে গুরু ঠাকুররা পর্যন্ত নারী ধর্ষণে সিদ্ধহস্ত। কোলের শিশু থেকে ঘাটে যাবার বয়সী বুড়ি পর্যন্ত সকল মেয়ে এদেশে লালসার শিকার। শিক্ষক ছাত্রীকে ধর্ষণ করেছে, গুরু শিষ্যাকে ধর্ষণ করেছে, পার্টিনেতা মহিলা সংগঠকের হাত ধরে টান দিচ্ছে, সিনে পরিচালক উঠতি নায়িকাকে কোলে না বসলে রোল নেই বলে দিচ্ছে। দেশে ধর্ষণের মহামারী।
    সংজ্ঞা এগুলো জানতেন। আরে, সংজ্ঞা মানেই তো তাই। জানা। আর শুকনো কেঠো জানা নয়। সংজ্ঞা মানে হল সচেতনতার সাথে জানা। সংজ্ঞা জানতেন মেয়ে শরীর এই পুণ্যাত্মাদের দেশে বড় বালাই।
    তাই বিশ্বকর্মা নামে অসাধারণ টেকনোক্র্যাট এর অসাধারণ ট্যালেন্টেড মেয়ে সংজ্ঞা এবার নিজের মানবী শরীরের ওপর একটা চমৎকার দেখাবেন। চমৎকার বলে চমৎকার? সিনিয়র পি সি সরকার থেকে হ্যারি হুডিনি পর্যন্ত কেউ নিজেকে নিয়ে এমনতর খেল মাথাতেই আনতে পারেন নি। সংজ্ঞা নিজেকে একটা ঘোড়া বানিয়ে নিলেন। ঘোটকী । একটা তাজা মেয়ে ঘোড়া। ওই দেখে এক কবি অনেক পরে লিখবেন “ঘোড়া কর ভগবান”।
    জন্তু জন্মের প্রধান সুখ হল ওদের মধ্যে ধর্ষণ জিনিসটা নেই। নেহাৎ মানুষের হাতে ধরা না পড়লে কেউ আটকে রাখতে পারে না। খেয়ে ফেলতে পারে, কিন্তু যৌনদাসী বানিয়ে ইনস্টলমেন্টে ভোগ করে যেতে থাকার কনসেপ্টটা জানোয়ার জগতে নেই।
    সংজ্ঞা ঘোড়া হয়ে এক একা ঘুরে বেড়াতে লাগলেন উত্তর কুরুবর্ষে।
    ওদিকে সূর্যের পরিবারে ছায়া গুবলেট করে বসেছেন। সূর্যের ছেলে যম ধরে ফেলেছে ছায়া ঠিক ঠিক মা নয়। মায়ের মতো। ব্যস খোঁজ খোঁজ। সূর্য লোক লাগালেন সংজ্ঞাকে খুঁজে বের করার জন্য।
    অমন ট্যালেন্টেড নারীকে খুঁজে বের করা কি যার তার কাজ? শেষে অশ্বরূপ ধরে তবে সূর্য তাঁর প্রিয়তমা সংজ্ঞা কে খুঁজে পেলেন। অশ্বিনীরূপা সংজ্ঞার সাথে অশ্বরূপী সূর্যের বহু প্রতীক্ষিত যৌন মিলন হল। আর জন্মালেন যমজ পুত্র। অশ্বিনীকুমারদ্বয়। প্রেমের টানে সূর্যকে ঘোড়া বানিয়ে ছাড়লেন সংজ্ঞা। সেই প্রেমের ফসল দুই যমজ পুত্র।
    মাদ্রী জোড়হাত করে এই দুই কুমারকে কামনা করলেন। তাঁর গর্ভে জন্মালেন নকুল আর সহদেব।

    Spread the love