প্রীতম সাহার গপ্পসপ্প

0
36
Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

কফিহাউস

ফোনটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে একটা কণ্ঠস্বর ভেসে আসলো–

“হ্যালো, সেমিস্টার শেষ হল বুঝলি, রবিবার ট্রেনে উঠছি। পৌঁছাতে পৌঁছাতে সন্ধে হয়ে যাবে। একেবারে কালকে দেখা হচ্ছে।”এপাশ থেকে শুধু “হুঁ, ওকে ওকে” ধ্বনিত হল।

দীর্ঘ এক বছর পরে বাড়ি ফিরছে নীলাভ। কলকাতায় ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে এসে কতদিন বাড়িমুখো হয়নি সে। প্রথম সেমিস্টার শেষ হলেই একবার বাড়ি ফেরার কথা ছিল,কিণ্তু তা আর হল কোথায়? পরীহ্মা শেষ হতে না হতেই পরের সেমিস্টারের জন্য আবার কোচিং ক্লাস শুরু; লে হালুয়া!

তখনই বিতৃষ্ণার চরম পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল মনটা! ধুর বাল!

হাওড়া থেকে ট্রেন অনেকহ্মন হল ছেড়ে দিয়েছে, অনেকটা দেরী করে। পরিপার্শ্বের স্থবির অট্টালিকা, কলরবমুখর জমজমাটি পেরিয়ে ট্রেন এখন সবুজের বুকে। দুপাশ জুড়ে যতদূর দ্রষ্টব্য হয় ততদূর শুধু প্রখর রোদে ঝলসানো সবুজ, নির্বিকার হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক একটা খুঁটি আর কিছু গোরু, ছাগল। এসব দেখতে দেখতে নীলাভর আজ কত পিছনেই না চলে যেতে ইচ্ছে করছে। দুশো এগারো কিলোমিটার রাস্তা জুড়ে ওর মধ্যে একটা নস্টালজিক সুখ এখন ধীরে ধীরে বেড়ে উঠছে।

ওদের গ্রামের প্রান্তে সেই গোবর লেপা কতগুলো ঘর, সাইকেলের টায়ার নিয়ে ছেলেগুলোর ছুটে বেড়ানো, পুকুরপাড়ের বাবলা গাছটায় শোভাবর্ধনকারী বাবুইয়ের বাসা— এসবের থেকে টানা একবছর ও দূরে। পিছনে চলে যাওয়া গাছগুলোর দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো সে।কলকাতায় সেইসব কোথায়? নিত্যদিনকার এই তুচ্ছ মুহূর্ত!

মা বাবার সঙ্গে কতদিন দেখা হয়নি ওর; স্রেফ ওই ভিডিও কল ছাড়া। তাও আবার আবছা আবছা। কাল দেখা হবে দীর্ঘ একবছর পরে।গগনরা যে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিল ওদের পাড়ার ক্যারাম খেলার টিমটাকে, তারও জবাব দেওয়া হবে কাল। কালকে অনেকদিন বাদে বাবার সাথে বাজারে বেরোনো যাবে। রিক্সা স্ট্যান্ডের পাশে বসে থাকা পাগলী মাসিকে কিছু খাবার কিনে দিতে হবে। আর সবশেষে  তপুদার স্পেশাল কফির আস্বাদ নেওয়া দীর্ঘ একবছর বাদে। বলতে গেলে তপুদার ওই কফি হাউসটার জন্যই যেন সে তুলনামুলকভাবে বেশীই আকুল হয়ে পড়েছে।

পরেরদিন সন্ধেবেলা ক্লাবের মধ্যে একটা শোরগোল পড়ে গেল। না কী হয়েছে? নীলাভরা গগনদের সমস্ত ঔদ্ধত্য, অহংকারের বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে। শ্যাম আবার অতিরিক্ত পাকামির প্রদর্শন করতে গিয়ে পাপ্পুর নকল করে একপ্রকার ভেংচি কেটে বললো— “দে-ক-খে নেবো, দে-ক-খে নেবো, হাহাহা আরে হুসস।” তারপর নীলাভর কলারটা নাড়িয়ে বললো— “এবারে ইন্টার কলেজ ইনডোর গেমে সেকেন্ড রে,সাইজ দেখে কথা বলিস।” ব্যস এই কথা বলতেই লেগে গেছে আগুন। তারপর কোনোমতে দু-দলের মধ্যে আগুন নিভলে নীলাভরা সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়লো। গন্তব্য, তপুদার কফি হাউস।

দুটো সাইকেল সদ্যনির্মিত পিচের রাস্তার উপর দিয়ে চলে যাচ্ছে। দুই সাইকেলে দুজন দুজন করে চারজন।নীলাভ, রাকেশ, শ্যাম, খেপলু। যেতে যেতে গ্রামের অনেককিছু যে বদলে গেছে এই নিয়ে ওদের মধ্যে কথা হচ্ছিল।

খেপলুই বললো— “বুঝলি নীলাভ তপুদার দোকান এই কদিনকা বন্ধ ছেলো। তপুদার শরীর খারাপ ছেলো নাকি। হেইজন্যই তো কতকাল আমরা ইইদিকে আড্ডা দিতে আসতে পারিনি।”

শ্যাম বললো— “এইতো গেলো রবিবার খুলেছে। ভাবলাম সেদিনই যাবো, কিন্তু তারপর ভাবলাম— না তুই আয়, তারপর একসঙ্গেই যাওয়া যাবে।”

নীলাভ কোনো কথা বললো না। ওর অবাক দৃষ্টি শুধু গ্রামের চারিদিকে। কতটা বদলে গেছে ওর গ্রাম এই এক বছরে। শহরে যাওয়ার আগে রায়পাড়ার ওই পরিত্যক্ত জমিটাতে কাজ শুরু হতে দেখেছিল সে। আজ সেখানে সুসজ্জিত বহুতল ফ্ল্যাট দাঁড়িয়ে।

গলিরাস্তা ছেড়ে দিয়ে ওরা এবার বড় রাস্তায় এসে পৌঁছালো। এতহ্মন চারিপাশ কিছুটা নিস্তব্ধ ছিল, এখন একটু জমজমাট। আর পাঁচ মিনিট গেলেই তপুদার দোকান।

বড় রাস্তার একপাশে বাজার।ডুমের আলোয় বিক্রেতারা পশরা সাজিয়ে বসে। সমগ্রটা মিলে একটা ছবি যেন।নীলাভর বোধ হল, সন্ধ্যে বাজারের ছবিটা আগে এরকমভাবে কখনো দেখেনি সে।

একটানা কানে ঝিম ধরে আসা বেলের শব্দ করে ওরা চারজন তপুদার দোকানের সামনে এসে দাঁড়ালো।

দোকান থেকে কাঁচাপাকা চুলে ভরাট একটা পাংশুটে মুখ উঁকি দিল। মুখে তার কিঞ্চিৎ হাসির ছোঁয়া। নীলাভদের দিকে তাকিয়ে বললো— “বদ অভ্যাস আর গেল না দেখি।”

নীলাভ সাইকেল থেকে নেমেই আহ্লাদের সাথে দোকানের ভিতর ঢুকে গেল। ” মন আছো তপুদা?” বলেই তপুদার রোগজর্জরিত হ্মীন শরীরটাকে জড়িয়ে ধরলো। তপুদা কোনোমতে উচ্চহাসি সম্বরণ করে নীলাভকে আপাদমস্তক দেখে নিয়ে বললো— “বাপরে এ তো পুরো ভোল পাল্টে গেইছে দেখি।”

পাপ্পু চিরকালের মতো ওর স্বয়ংসিদ্ধ ফোড়ন কাটার ভঙ্গিতে বলে উঠলো— “হবে না, শহরের ছোঁয়া গায়ে লেগেছে যে।”

তপুদার গলায় মোটা লালপেড়ে গামছা ঝোলানো ছিল। সেটা দিয়ে দোকানের সরঞ্জাম রাখা টেবিলটা মুছে নিয়ে বললো— “তাই তো, ভাবলাম এ আবার কে, আমাদের নীলাভ তো এরকম চটপটে ছিল না। “কথাটা বলেই খেপলু পাপ্পুর দিকে চোখ টিপে হাসতে লাগলো।

এরকম রঙ্গ তামাশা কিছুহ্মন চলার পর নীলাভদের সামনে হাজির হল ধোঁয়া ওঠা গরম কফি— তপুদার স্পেশাল কফি! এ তল্লাটে কি, খোদ কলকাতায় গিয়েও এরকম কফি খায়নি নীলাভ। সেখানে গিয়েও তপুদার স্পেশাল কফিটাকে প্রবলভাবে স্মরণ করেছে ও। সত্যি কী যে এমন জাদু আছে তপুদার হাতে, তা ভেবেই মাঝে মাঝে ধন্ধে পড়ে যেতে হয়। কতবার ওরা চারজন পীড়াপীড়ি করেছে এরকম সুস্বাদু কফির নেপথ্যে লুকিয়ে থাকা রহস্যটা জানার জন্য। তপুদা বরাবরই পোকাধরা দাঁত বার করে বলেছে— “ওই আর কি।”

পাগল করে দেওয়া গরমের পর কয়েকদিন ধরে এখানে বৃষ্টি হওয়াতে, বাইরেটা বেশ ঠান্ডা ছিল। তাই গরম কফি সঙ্গে টমাটোর চপ সান্ধ্য আহার হিসেবে ভালোই জমেছে।

কফির পেয়ালায় ‘চুক’ করে চুমুক দিয়েই রাকেশ বললো— “এখন তোমার শরীর কেমন আছে তপুদা? মাঝখানে অসুস্থ ছিলে শুনছিলাম।”

তপুদা কাচের জারের ভিতর বিস্কুট রাখছিল। কাজ করতে করতেই বললো— “সে তো অনেকদিন হল। এখন বেইশ ভালোই আছি।”

খেপলু জিজ্ঞেস করলো— “তবে দুকান দেরী করা খুললা কেন?”

তপুদা কোনো প্রত্যুত্তর দিল না। কিছুহ্মন পর বললো— “ও এমনি।”

এমনি! নীলাভর কাছে কথাটা কীরকম অসঙ্গতিপূর্ণ বলে বোধ হতে লাগলো। এমনি এমনি কারণ দেখিয়ে তো তপুদা কোনোদিন দোকান বন্ধ রাখেনা। ঘোর দুর্যোগের দিনেও দোকান খুলেছে তপুদা। সেই তিন কিলোমিটার দূর ঘর থেকে আসতে কোনোরকম আলসেমি করতে দেখেনি যাকে, সে কিনা বলে দিল এমনি দোকান খুলিনি। পৃথিবীর কিছু আশ্চর্য্য জিনিসের মতো তপুদার কথাটাও নীলাভর আজ সেই আশ্চর্য্য তালিকার মধ্যে ফেলতে ইচ্ছে করছে।

আরো বেশ কিছুহ্মন কাটার পর তপুদার সাধের ছোট কফি হাউসখানা ছেড়ে ওরা বেরিয়ে পড়লো। খাবারের বিল হয়েছিল আশি টাকা। তপুদা পাঁচটাকা বাদ দিয়ে পঁচাত্তর টাকা রাখলো। ব্যস্তসম্মত হয়ে পাপ্পু “কী করছো কী করছো” বলতেই তপুদা স্বতঃসিদ্ধ প্রশান্ত হাসি হেসে বললো— “ও থাক।”

বড়পুকুরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল ওরা। এটা শর্টকাট রাস্তা।সামনের গলিমুখে পাপ্পু নেমে যাবে, খেপলু কিছুটা এগিয়ে। কিছুদূর গিয়ে আমরা কজন ক্লাবের সামনে আসতেই গ্রামের পঞ্চায়েত প্রধানের ভাই সমীরদাকে দেখতেই ওরা দাঁড়িয়ে পড়লো। সমীরদা জিজ্ঞেস করলো— “কীরে দলবল মিলে হামলা করতে বেরিয়েছিলি নাকি?”

রাকেশ হাসতে হাসতে উত্তর দিল— “না না তপুদার দোকানে গেছিলাম।”

সমীরদা ঈষৎ ভ্রু কোঁচকালো, তারপর প্রশ্ন করলো— “তপু দোকান খুললো?”

স্বাভাবিকভাবেই এরকম অপ্রত্যাশিত একটা প্রশ্ন নীলাভদের একটু হকচকিয়ে দিল। পাপ্পুই জিজ্ঞেস করলো— “কেন কী হয়েছে সমীরদা?”

সমীরদা খানিকটা বিমূঢ়ের মতো চেয়ে বললো— “আরে আমি তো জানি যে ও দোকানটা বেচে দেবে।কেন তোদের কিছু বলেনি”

“কই না তো!” পাপ্পু বললো।

সমীরদা এবারে খানিকটা উত্তেজিত হয়ে বললো— “আরে ওর ছেলের তো বিশাল অসুখ, একেবারে যায় যায় অবস্থা।”

নীলাভর সাইকেলের হ্যান্ডেল ধরে থাকা হাতটা এমনিতেই শীতল হয়ে গেল। খেপলু, রাকেশ, পাপ্পু বিহ্ব্লের মতো দাঁড়িয়ে, ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না এইসময়ে কী করণীয়।

সমীরদা বলতে লাগলো— “ওদের গাঁয়ের একজনের সাথে পরিচয় আছে। তার সাথে দেকা হতে সেই খবর দিল। এখানকার ডাক্তার নাকি ফিরিয়ে দিয়েছে। আর কলকাতায় গিয়ে যে ছেলেটারে দেখাবি তারও পয়সা নেই। ওই একটা দোকান চালিয়ে আর কত ওঠে।ওর পাড়া পড়শীরা তো নাকি শুনেছি ওকে দোকানটা বেচার জন্য জোরাজুরি করছে। তা দোকানটা কয়েকদিন বন্ধ দেখে ভাবলাম বোধয় বেচেই দেবে।কিণ্তু একন তো দেখি উল্টো কেস!শালা ছেলেটার থেকে নাকি দোকান বড়!ওই তো একটা নড়বড়ে… “বলে গটগট করতে করতে সমীরদা চলে গেল। আর এদিকে এক অমোঘ সত্যের সামনে নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো ওরা চারজন।

দুদিন বাদে নীলাভর কলকাতায় ফেরার পালা। এই দুদিন কিছু কাজে আকস্মিকভাবে ব্যস্ত হয়ে পড়ার দরুণ তপুদার দোকানে আর যাওয়া হয়ে ওঠেনি ওর। ট্রেনে বসে নীলাভ তপুদার এইপ্রকার ভাগ্য বিড়ম্বনার চিন্তায় ডুবে ছিল। স্টেশন থেকে খানিকটা দূরে রাস্তায় নতুন ব্রিজ নির্মাণের কাজ চলছে। সেইদিকে চেয়ে নীলাভর মনে হল, র সবকিছু কেমন ধীরে ধীরে অতি পরিকল্পিতভাবে বদলে যাচ্ছে। জন্ম থেকে ও যেই গ্রামকে দেখে আসছে ওর সেই চিরপরিচিত গ্রামের ছবি এখন ভিন্ন।কিণ্তু এই এত অপরিচিতের মাঝে কোথাও না কোথাও যেন অতিপরিচিত ঠেকে তপুদাকে। তপুদার ছেলের প্রাণ রহ্মা হবে কিনা সে জানেনা। সে স্রেফ জানে হাজার ব্যথা বুকে বেঁধেও, এত বদলের মধ্যে মরতে মরতে বেঁচেও তপুদা এই বদলে যাওয়া গ্রামে অনন্য হয়ে থাকবে। সেই একইভাবে জামগাছের পাতা ভেদ করে একটুকরো আলো জেগে থাকবে, তপুদার সাধের কফি হাউসের রংচটা, একপাশে হেলে যাওয়া সাইনবোর্ডের উপর। আর তপুদা তার সেই এক স্বভাবসিদ্ধ হাস্যোজ্জ্বল মুখে কাপপ্লেট ধুতে ধুতে খরিদ্দারদের দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করে নেবে— “চিনি কম হয়েছে কী?” কিংবা এক একজনের পছন্দমতো টিভির চ্যানেল ঘুরিয়ে বলবে— “এটা তো?” আর কাজের ফাঁকে থেকে থেকেই কর্মব্যস্ত পাংশুটে মুখটাতে হাসির রেখা ছড়িয়ে পড়বে।


Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •