মেহেফিল -এ- কিসসা গদ্যে এম উমর ফারুক

হলুদ খামে চেনা চিঠি

চি ঠি…
চিঠি এসেছে।
দরজা খুলে বের হয় কাদের আলী। দেখে বাইসাইকেলের সিটে বসে বাম পা নামিয়ে দিয়ে ডাকপিয়ন ডাকছে। আর ডান হাতে সাইকেলের বেল বাজাচ্ছেন। সামনে এগিয়ে যায় কাদের আলী। জানতে চায় কার চিঠি এসেছে। পিয়ন রাজা মিয়া ব্যাগের ভেতর থেকে হলুদ খামের চিঠিটা বের করে দিল। হাতে নিয়ে দেখে চামেলী নামে চিঠি এসেছে।
চামেলী, কাদের আলীর বড় মেয়ে। চিলমারী মহিলা ডিগ্রি কলেজ থেকে বিএ পাস করেছে। প্রথমে চিঠি পেয়ে চমকে যায় কাদের আলী। মেয়ের নামে কে চিঠি পাঠাবে। প্রেরকের ঠিকানা পড়ে দেখে সরকারি একটি অফিস থেকে চিঠি এসেছে। ঘরে এসে চামেলীর হাতে চিঠি দিয়ে জানতে চায় কিসের জন্য এসেছে। চিঠি পেয়ে আনন্দে উদ্বেলিত চামেলী।
বাবা আমি দু’মাস আগে একটা চাকরি জন্য আবেদন করেছি। সেই চাকরির পরীক্ষার কার্ড এসেছে। তাই নাকি। এত অনেক ভালো খবর। আমি তো ভাবতেই পারিনি, তুই চাকরির জন্য আবেদন করবি।
কেন বাবা? ভাবতে পার না। লেখাপড়া করেছি, ঘরে বসে থাকার জন্য নয়। শুধু বিয়ে করে স্বামীর বাড়ির রান্না আর সংসার করার জন্য নয়। চাকরি করে প্রথমে বাবার সংসার ও পরে স্বামীর সংসারের সহায়ক হিসেবে থাকব।
মেয়ের মুখে এমন কথা শুনে থমকে যায় কাদের আলী। এ প্রজন্মের মেয়েরা নিজেকে নিয়ে কত ভাবে। তারা পরনির্ভর হতে চায়। গর্বে বুকটা ভরে গেল তার। আস্তে করে জানতে চাইল তোমার চাকরি পরীক্ষা কবে, কোথায়। চামেলী কার্ডটা বের করে উল্টে দেখে। কোনো কথা নেই চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকল। চোখ ছলছল। চোখে মুখে ক্ষোভের ছাপ। মুহূর্তে বদলে গেলে চেহারা।
কি রে চামেলী?
কি হলো?
কথা বলিস না কেন?
কি বলব বাবা। পরীক্ষার দিন শেষ হয়েছে। আরও তিনদিন আগে পরীক্ষা ছিল। এই হলো দেশের অবস্থা। দেশের ডাক বিভাগের অবস্থা। ফালতু হয়ে গেছে যোগাযোগ। কত স্বপ্ন নিয়ে বসে আছি। অথচ পরীক্ষা হাতে পেলাম ৩ দিন পর। আধুনিক যুগে এসব ডাক আর চলে না। এসব ডাক বিভাগ বন্ধ করে দেওয়া উচিত।
এবার মেয়ের ওপর ক্ষেপে যান কাদের আলী। অনেক আধুনিক হয়েছো তোমরা। তাই ডাক বিভাগ বন্ধ করে দেওয়া দাবি তোল। কিন্তু তোমরা তো জান না এই ডাক বিভাগের ইতিহাস। কেমনে জানবে, জানার চেষ্টাও কর না।
তুমি কী চিঠি লেখ?
এখন অবশ্য চিঠির প্রয়োজনীয়তা প্রায় নেই বললেই চলে। চিঠির স্থান এখন দখল করে নিচ্ছে ই-মেইল। তবুও কিন্তু চিঠির আবেদনই আলাদা। কলিং বেল শুনে দরজা খুলে যদি দেখো তোমার জন্য একটা চিঠি নিয়ে এসেছে ডাকপিয়ন- সে আনন্দই অন্যরকম।
অনেক যুগ আগে থেকে দূরের মানুষগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে চিঠি। ধরো, তুমি দেশের বাইরে থাকা তোমার কোনো বন্ধুকে একটা চিঠি লিখেছ। সেটা শুধু লিখলেই তো আর হলো না, তার কাছে পৌঁছাতে তো হবে। কীভাবে পৌঁছুবে?
এখন তুমি খুব সহজেই বলতে পার সেটা ডাকে পাঠিয়ে দেবে। কিন্তু অনেককাল আগে কিন্তু এই ডাকবিভাগ ছিল না। তখন চিঠিগুলো পাঠানো হতো দূতের মাধ্যমে। আগে পায়রার পায়ে বেঁধে চিঠি পাঠানোর প্রচলনও ছিল। আর পায়রা কিন্তু খুব ভালো ডাকপিয়ন। একটা জায়গা চিনে ফেললে ঠিকঠাক সেখানে নিয়ে চিঠি পৌঁছে দিতে পারত। তবে এই উপায়গুলো খুব সময়সাপেক্ষ আর ঝামেলাপূর্ণ ছিল। চিঠির আদান-প্রদান সহজ এবং দ্রুততর করার জন্যই ডাকবিভাগ চালু করা হয়।
‘রয়্যাল মেইল’ নামে প্রথম ডাক বা পোস্টাল সার্ভিস চালু হয় ১৫১৬ সালে। এটি চালু করেন হেনরি অষ্টম। এরপর ১৬৬০ সালে প্রথম সাধারণ ডাক বা জেনারেল পোস্ট অফিস চালু করেন চার্লস দ্বিতীয়। ১৮৩৫ সালে রোল্যান্ড হিল আধুনিক পোস্ট অফিসের ধারণা দিয়ে ‘ পোস্ট অফিস রিফর্ম’ প্রকাশ করেন। সেখানে আধুনিক ডাকবিভাগের বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে ধারণা ছিল। যার মধ্যে ছিল যেখানে দূরত্ব যাই হোক, যে কোনো চিঠি পাঠানোর জন্য প্রেরককে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ দেওয়ার ধারণা এবং ডাকটিকিটের ধারণা।
এর আগে দূরত্ব অনুযায়ী চিঠি পাঠানোর জন্য কম বা বেশি অর্থ দিতে হতো। রোল্যান্ড হিল ব্রিটিশ পার্লামেন্টে বোঝাতে সক্ষম হন যে এই পরিবর্তনগুলোর খুব দরকার ছিল। ১৮৪০ সালে ব্রিটেনে ‘ইউনিফর্ম পেনি পোস্ট’ চালু হয় যার মাধ্যমে চিঠি পাঠানো হয়ে ওঠে আরও সহজ, দ্রুততর এবং নিরাপদ। ব্রিটেনেই প্রথম ডাকটিকিট চালু হয় যার নাম ছিল ‘পেনি ব্ল্যাক’। ১৮৫০ সালে প্রথম চালু হয় ডাকবাক্স।
সেই সেদিনের ডাকবিভাগের চেয়ে আজকের ডাকবিভাগগুলো অনেক উন্নত। এখন আর একটা চিঠির জন্য অনেকগুলো দিন অপেক্ষা করতে হয় না। আধুনিক ডাকবিভাগের কল্যাণে দেশের বাইরেও চিঠি চলে যায় নিরাপদে অল্প কয়েকদিনেই। দেশের বাইরে চিঠি পাঠাতে হয় ‘এয়ার মেইল’-এ। অর্থাৎ তোমার পাঠানো চিঠিগুলো এ দেশের ডাকবিভাগ থেকে রীতিমতো প্লেনে চড়ে চলে যাবে কাক্সিক্ষত দেশটিতে। তারপর সেখানকার ডাকবিভাগ চিঠিটাকে পৌঁছে দেবে প্রাপকের ঠিকানায়। দেখেছ চিঠির আদান-প্রদান কত্ত মজার? তাহলে? তুমিও কাউকে চিঠি লিখে সেটাকে ডাকে পোস্ট করে অপেক্ষা করতে থাক তোমার চিঠিটির জন্য!
বিশ্বে প্রথম সমুদ্র ডাক চালু করা হয় ১৬৩৩ সালে। ঘোড়াগাড়ির ডাক চালু করা হয় ১৭৮৪ সালে। চিঠি আদান-প্রদানের জন্য মুদ্রিত খামের প্রচলন করা হয় ১৮৩০ সালে। পোস্ট অফিসের মাধ্যমে পোস্টাল মানি অর্ডার চালু করা হয় ১৮৩৮ সালে। প্রথম স্ট্যাম্প প্রকাশ করা হয় ১৮৪০ সালে। বিশ্বে প্রথম রেজিস্ট্রি ডাক সার্ভিস চালু হয় ১৮৪১ সালে। বুকপোস্ট সার্ভিস উন্মুক্ত হয় ১৮৪৮ সালে। পোস্ট কার্ডের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় ১৮৬৯ সালে এবং এয়ার মেল বা বিমান ডাক যাত্রা হয় ১৯১১ সাল থেকে।
উপমহাদেশে প্রথম ডাক সার্ভিস চালু করা হয় ১৭৭৪ সালে। ব্রিটিশ ভারতে প্রথম ডাক বিভাগের কার্যক্রম শুরু হয় ১৮৫৪ সালে। স্থায়ীভাবে প্রথম ডাক টিকিট চালু করা হয় সিন্দুতে ১৮৫২ সালে। সর্বভারতীয়ভাবে ডাক টিকিট চালু হয় ১৮৫৪ সালে। উপমহাদেশে রেলওয়ে ডাক চালু হয় ১৮৫৩ সালে। পোস্ট কার্ড ব্যবস্থার প্রবর্তন করা হয় ১৮৭৯ সালে। পোস্টাল অর্ডার সার্ভিস চালু হয় ১৮৮১ সালে।
পোস্টাল ব্যাংক সার্ভিস চালু হয় ১৮৮২ সালে এবং বিমান ডাক চালু হয় ১৯১১ সালে। বর্তমানে উন্নত দেশগুলোর মতো উপমহাদেশে এবং এদেশেও ডাক বিভাগে লেগেছে প্রযুক্তির ছোঁয়া। বাংলাদেশের ডাক বিভাগ প্রায় ১৫০ বছরের ঐতিহ্য ধারণ করে এগিয়ে চলছে। স্বাধীনতার পর থেকে নব্বই দশকের শেষ দিকেও ডাক বিভাগের ব্যবস্থার যেন কোনো কমতি ছিল না। ডাক পিওন, রানার, পোস্টমাস্টার ও অন্যান্য কর্মচারী কর্মকর্তা মিলিয়ে মোট লোকবল ছিল হাজার হাজার। প্রতি বছর ৯ অক্টোবর পালন করা হয় বিশ্ব ডাক দিবস। কথাগুলো বলে আর ডান হাতের তালু দিয়ে চোখের পানি মুছে কাদের আলী।
বাবার মুখে ডাক বিভাগের ইতিহাস শুনে চমকে যায় চামেলী। এতকিছু বাবা জানেন কেমন করে। আর এ কথাগুলো বলার সময় বাবা কেন ক্ষোভ দেখালেন। জানতেই হবে এর ভেতরের কারণ কী?
বাবা
হ্যাঁ,
বিশাল ইতিহাস তুমি কেমনে জান। এ ইতিহাসের নেপথ্যে কী কারণ আছে।
না তোমাকে বলা যাবে না।
আমি আজ শুনতে চাই। কেন তুমি রেগে গেলে।
সে অনেক কষ্টের।
যত কষ্টের হোক আমি শুনব।
চামেলী, তোর জন্মের প্রায় এক বছর আগে আমার বাবা মারা গেছেন। আমার বাবা মানে তোর দাদা ছিলেন একজন ডাকপিয়ন। সামান্য বেতন পেতেন। যদিও সংসারের তেমন চাহিদা ছিল না। তাই বাবার ওই আয় দিয়েই সংসার চলতো। সকালে ঘুম থেকে ওঠে বের হতে আর ফিরতেন রাতে। বাইসাইকেলে চড়ে চষে বেড়াতেন গ্রামের পর গ্রাম। সাইকেলের পেছনে রাখতেন চিঠির ব্যাগ।
চামেলী তুমি তো জানো না। তোমার দাদু ছিলেন অনেক জনপ্রিয় মানুষ। গ্রামের সর্বশ্রেণির মানুষ তাকে সম্মান করতেন। চাকরিজীবনে বাবা ছিলেন অনেক সৎ মানুষ। আমার বিয়ে করার আগে ডাক বিভাগে লোক নিয়োগের সার্কুলার দিল। আমিও আবেদন করলাম। যথাসময় কার্ড এলো। পরীক্ষাতেও অংশ নিলাম। বাবার অফিসের একজন কর্মকর্তা বললেন উপরে বড় স্যারকে অনুরোধ করলে চাকরিটা হয়ে যাবে। কিন্তু বাবা বড় স্যারকে অনুরোধ করেননি। তাই চাকরিটাও হয়নি। বাবা বলতেন দুনিয়াতে যদি ঘুষ মুক্ত কোনো চাকরি থাকে, তাহলে সেটা ডাকবিভাগের পিয়ন পদে।
কিন্তু বাস্তবতা বড় নির্মম। চাকরি থেকে অবসর নেয়ার দুই বছরের মধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়েন বাবা। একাধিক রোগ তার শরীরের বাসা বাঁধে। অর্থের অভাবে চিকিৎসা চালানো সম্ভব হয়নি। চিকিৎসার অভাবেই মারা যান তিনি।
সেই ডাক বিভাগকে অবহেলা করে যখন তুমি তোমার ক্ষোভ প্রকাশ করেছো। তখন কষ্ট পেয়েছি আমি। আর হলুদ খামটা যখন ছিঁড়ে ফেলেছ, তখন আমার হৃদয় ক্ষতবিক্ষত হয়েছে। কেননা, ডাক বিভাগের চাকরির টাকা দিয়ে আমার বড় করেছেন বাবা। আমার শরীরে যে রক্ত বইছে, তা ডাক বিভাগের টাকায়। ওই হলুদ খামের চিঠির গন্ধ আমার খুব চেনা। খুব আপন।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।