ভাষাই সাহিত্য নয়। চিন্তা আলাদা হলে ভাষা আপনি বদলে যায়। কিন্তু কবিদের ভিন্ন হওয়ার জন্য ভাষা বদলের যে সংগ্রাম তা শিল্পের মূল ফোকাস থেকে লেখককে সরিয়ে নেয়। শিল্পের কাজ শুধু নিজেরে এক্সপ্রেশন করা নয়, চিন্তার ভাঙন ও তার কর্তব্য। ভাষার কাজ হলো শিল্পের প্রকাশে সাহায্য করা মাত্র। বাকি কাজ আরো গভীরে।
২.
এই সময়ে ভালো কবিতার মাপে অনেক ভালো ভালো কবিতা লেখার দরকার নেই। অনেক ভালো ভালো কবিতা প্রান্তরে প্রান্তরে ছড়িয়ে আছে। পাঠকের যে রুচি তাতে এগুলো গুড এনাফ। তারা তাদের এক জীবনে এই সমস্ত শিল্পিত ভালো ভালো কবিতা পড়ে কাটাতে পারবে। যেমন ধরেন জীবনানন্দ বা উৎপলের মতো ভালো কবিতা পড়তে পড়তে যে শিল্পের চাহিদা পাঠক ও কবিতা চিন্তকদের তৈরি হয়েছে তা দিয়েই অন্তত আরো একশ বছর কাটানো যাবে নতুন কবিতা না লিখেই। নতুনের নামে পুরাতনের উৎপাদন অব্যাহত আছেই তো। এই সমস্ত ভালোর প্রেক্ষিতে বহু খারাপ কিছু ভালো হয়ে উঠতে পারছেনা এই চিরাচরিত পাঠকদের চিন্তার শিশুত্বের কারণে। এটা কোনো সমস্যা না। আমার হিসাবে জগতে অনেক ভালো কবিতা তৈরি হয়েছে। এবং এমন ভালো ভালো কবিতার তেমন আর দরকার নেই। এমন ভালোর মতো দেখতে-শুনতে-পড়তে কবিতার যুগ শেষ। বাঙালি কবি জাতি কবিতায় যত ভালো, চিন্তায় ততটাই খারাপ। কবিতায় চিন্তা অন্তর্হিত কতদিন! আগামী দিনে যা শিল্প ছাড়া কিছু দেয় না তা টেকার সম্ভাবনা কম। এই সময়ের নতুন মানুষ ফালতু ফালতু শিল্প আর পড়বে না। যার কোনো উপযোগ নেই তার পেছনে সময় ব্যয়ের মতো সম্পদও সময় মানুষের হাতে কমেছে এই আধুনিক সমাজ ব্যবস্থায়। সমাজে কবিতা দিয়ে চিন্তার নতুন ভ্যালু অ্যাডিশন লাগবে। ফলে সমকালের লতানো, পাতানো, টেকনিক নির্ভর কম অনুভূতিশীল কবিতাও কবির কোনো ভবিষ্যৎ দেখা যাচ্ছে না।
আমাদের সমাজের ভ্যালু সিস্টেমটা কেটে নিয়ে লম্বা করুন, ছিঁড়ুন কবিতায়। এই সমাজ আবেগী শিল্প ঘেঁষা। কিছু আঁচড় কবি হিসেবে রাখুন। বুড়া কবি যদি বলে আপনার কবিতা ভালো, তবে এখনই লেখা বন্ধ করে ভাবতে বসুন। এবং নিশ্চিত ধরে নিন ভবিষ্যতে আপনার কবিতা অপ্রয়োজনীয় লেখাপত্র হিসেবে গার্বেজ হতে চলেছে।
ভাষা আবিষ্কার থেকে নিজের চিন্তার অনুসন্ধান করুন।
৩.
সরল ভাষায় লিখতে পারার মধ্যে একটা সাহসের ব্যাপার আছে।মাছ বাজারের ভাষায় আমরা লিখি না কেন? মুখের ভাষার ফর্ম আর লেখার ভাষার ফর্ম আলাদা বলে?
লিখিত ভাষাকে আমরা জটিল ও আলাদা করে তুলতে চাই কেন?
ভাষাকে অলংকার দিয়ে সাজিয়ে তোলার ব্যাপকতর প্রচেষ্টা কেন? অতীতে গড়ে ওঠা ফ্রেজের বাইরে আমরা যাই না কেন?
সাহিত্যের নিজস্ব একটা একাডেমিক ভাষা আছে।এই স্বীকৃত ভাষা,
পদ্ধতি ও রূপকেই দুনিয়ার বেশির ভাগ সাহিত্য লেখা হয়,
লক্ষ করে দেখবেন।সাহিত্যের ভাষা বলতে আমরা যা বুঝি তা তৈরী কৃত একটা ব্যাপার।আলো-আঁধারি ধোঁয়াশাপূর্ণ ভাষা দিয়ে কবিতা এগোতে চায়।অধিকাংশ কবিতা শব্দের নন্দন তৈরির জন্য লেখা হয়।সাহিত্যের প্রধানতম উদ্দেশ্য শিল্প সৃষ্টি।ফলে যে কোনো লেখাপড়ার পর পাঠক লেখাটি কতটা শিল্পিত হয়েছে তার মাপ নেন।এমন বহু শুনেছি, লেখাটা ভালো; কিন্তু আর একটু শিল্পিত হলে ভালো হতো।এমন আর্ট বায়াসডদের মতামত এড়িয়ে চলা দরকার।সাহিত্য তাদের কাছে খুবই লিনিয়ার একটা বিষয়। সাহিত্য তাদের কাছে শিল্পমাত্র। আপনি এও শুনে থাকবেন যে, কবিতার নিচ থেকে নাম বাদ দিলে সবার কবিতাই এক হয়ে যাবে। কথাটা বহুলাংশে সত্য। শিল্প বোধতো একটা সম্মিলিত ধারণা।ফলে সকলে মিলে যখন শিল্প তৈরি করতে চায়,
তখন সবাই মিলে একই ভাষাটা লিখতে চায়। চিন্তাই যেহেতু ভাষা। ফলে সকলের ভাষা ও চিন্তা একই লাগে। একই চিন্তায়, একই ভাষায় লিখিত ভিন্ন ভিন্ন কবির কবিতাকে আলাদা করা যাবে না আর।
শুধু নিজের ভাষার কাঠামো দিয়ে পৃথক হয়ে যাওয়া কবি-সাহিত্যিকের সংখ্যা অপ্রতুল সাহিত্য সমাজে।সে জন্য শুধু ভাষার দ্বারা সাহিত্যে আলাদা হয়ে যাওয়া কোনো উদাহরণ না, ব্যতিক্রম। সেই কারণে জীবনানন্দ, উৎপল হলেন ব্যতিক্রম; রবীন্দ্রনাথ সহ আরো অনেকেই হলেন উদাহরণ বাংলা সাহিত্যে। সে হিসেবে ভাষাকে সাহিত্যের পৃথকত্বের একমাত্র কারণ বলা যাবে না।আপনি ভাষায় আলাদা হতে চাইতেই পারেন,
তবে তা কবিতা লেখার জন্য অবধারিত না। ভাষা দিয়ে কবিতার বিচার হয় না। কবিতা একটা টোটাল ব্যাপার।জীবনানন্দ ও উৎপল বাদে বাংলা ভাষার অপরাপর বড় কবিদের ভাষা প্রবল ভাবে ভিন্ন কিছু না।
লিখিত বা মৌখিক কোথাও আপনি জীবনানন্দের বা উৎপলের ভাষাটাকে পাবেন না। এটাই এই ভাষার প্রধানতম দুর্বলতা।অনেকে হয় তো বলবেন লেখার ভাষা ও ব্যাবহারিক ভাষা আলাদা।কিন্তু সাহিত্যের ভাষা সময়ে ব্যবহারের ব্যবহারে দৈনন্দিন ভাষা হয়ে উঠতে পারে। মুখের ভাষা ও শিল্পের ভাষা হয়ে ওঠে।লালন বা শাহ আব্দুল করিমের গান মুখের ভাষাই।যেমন রবীন্দ্রনাথের বাংলায় সুমন বা অর্ণবরা এখনো গান গান। মানে সেই ভাষার একটা ব্যবহার রয়েই গেছে।দিন দিন শিল্প সহজতর ভাষা দিকে যাবে।ভাষা সহজ,
সরল হয়ে যাচ্ছে। এই ভাষার ট্রেন্ড আমি লক্ষ করি। অতি সরল ভাষায় কবিতা লেখা দরকার যে ভাষায় আদালত সমন দেবে।কিন্তু লোপা মুদ্রা যে কবিতা গুলো গান হিসেবে গেয়েছেন সেই সমস্ত সিডির ওপর জীবনানন্দের ছবি না থাকলে কেউ এমন বোরিং জিনিস শুনত বলে মনে হয় না।বাংলা কবিতার ভাষা কে সহজ করে আনার জন্য এবং এই সহজতাকে কবিতার উদাহরণ তৈরি করার জন্য সত্তর-পরবর্তী বহু কবির কবিতার উদাহরণ আছে। ভাষা কখনো কবিতা না, শিল্প না, সাহিত্য না।ভাষা হলো একটা মাধ্যম, একটা টুলস।
শিল্প বা সাহিত্য কে সরল হতে হয়। বিমূর্ততাও সরল হয়ে ভেঙে পড়ে। কিন্তু বহু অসরল কবিতা ও আছে। সেটাও থাকা দরকার ও। সরলের সম্ভাবনা কে যেন বাদ দিয়ে না দিই। আমরা শিল্পে সরল হতে চাই না কেন?
সরল আপনি হতে পারেন না অথরিটির কারণে। সরল লেখা অথরিটির কাছে থেকে কোনো স্বীকৃতি পাবে না।বিরাট একটা এনকাউন্টারে পড়ে যায় লেখাগুলো। স্বীকৃত সাহিত্যের ভাষার রূপটি হলো জটিলতা।একাডেমিক জটিলতাকে গ্রহণ করতে প্রস্তুত। মেটা ফিজিক্স সাধারণের জন জীবনের কোনো ব্যাপার না।ভাষাকে সরল করার সাথে সাথে ভাষার যে অথরিটি থাকে তা ভেঙে পড়ে। সরল ভাষার পক্ষে দাঁড়ানো মানে একাডেমির ভাষার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো।
ত্রিশের কবিরা রবীন্দ্রভাষার বিরোধিতা করে যে ভাষা তৈরি করেছেন বাংলা কবিতার তা আজ জরাক্রান্ত,
জটিলতার অরাধনা ময়। এই সমস্ত কমপ্লেক্স সিটির প্রতি হেলে থাকার যে অথরিটি তা ভাঙে দেওয়া যায় সরলতা দিয়ে।
লেখক কোন ভাষায় লিখছেন তাতার একটা রাজনীতি।
অথরিটি ভাঙার উদ্দেশ্যে আপনি সাহিত্যের শব্দ পরিবর্তন করলেন কিন্তু ভাষাকে গুরুগম্ভীর করে রাখলেন তবে যা তাই হলো। মান ভাষার বিপরীতে অপ্রমিতের সংগ্রামঠিক এমনই একটা বিষয়।অপ্রমিত করণের উদ্দেশ্য যদি ভাষাকে সরল করা না হয় তবে এগুলোর কোনো দাম নেই। যারা করতেছি, খাইতেছি, যাইতেছি মূলক ক্রিয়ার পরিবর্তনকে সাহিত্য ভাষার পরিবর্তন বলে তারা ভাষার খোলস চেনে,
ভেতরটা জানে না। প্রমিত ভাষার প্রতি আঘাত হলো তার অর্থ উৎপাদনের অসরলতাকে ভেঙে দেওয়া।অপ্রমিতের আন্দোলনও হওয়া উচিত ভাষার সরলতা কেন্দ্রিক।এখন পর্যন্ত অপ্রমিতবাদী সাহিত্যিক ও শিল্পীদের চর্চা তেমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজনেই। উদাহরণ নেই। অপ্রমিতের সরলতা কই? ওই হচ্ছে তোত্রিশের ক্লিশে সাহিত্যে ররি প্রোডাকশন অপ্রমিতের নামে।
প্রমিত ও অপ্রমিত,
সাধু ও চলিত সবই একটা শ্রেণির জন্য তৈরি হয়েছে। প্রমিতই শুধু না, অপ্রমিত ও একাডেমির ভাষা হয়ে উঠতে পারে যদি ভাষার ঐতিহ্যটা কেনা বদলায়।
যতদিন যাবে ভাষা ততই সরল অর্থপূর্ণ হবে, আরো বেশি রাজনৈতিক ব্যাপার হবে।
৪.
জীবনানন্দ ও উৎপলের কবিতার বড় সমস্যা তাদের ভাষা।তাদের অপরাপর বিষয় থেকে আপনার চোখে শুধু তাদের ভাষার দ্যুতি পড়বে। ভাষার মাস্টারি ছাড়া তাদের কবিতা আর কী কী! বলে নেেতা!
‘আর কী কী’ যা আছে তা ভাষার নিচে শহিদ। ভাষা বাদে আর কী কী কারণে জীবনানন্দ বড়? তাদের কবিতার নামের নিচে কবির নাম না থাকলেও আপনি বুঝতে পারবেন কোনটা জীবনানন্দের আর কোনটা উৎপলের।কবিতা শুধু নাম বেচা না এখন আর জানবেন। কবিতার ব্যাবহারিক উদ্দেশ্য অনেক।কবিতায় ভাষা অর্জনের মাধ্যমে নিজের নাম কেনা ছাড়া আর কী হয়?
কবিতায় আমাদের চিন্তা লিখতে হবে যে কোনো ভাষায়। কবিতাকে ব্যাবহারিক হয়ে উঠতে হবে।প্রকাশে সক্ষম যে কোনো ভাষাই কবিতার ভাষা। মান, চলিত, প্রমিত, অপ্রমিত ভাষা সংগ্রামীরা কবিতার এ সময়ের অপ্রয়োজনীয় একটা টুলস নিয়ে নিজেদের ভাষা বিপ্লবী হিসেবে জারি রেখেছে। এটা তাদের না ধরতে পারার অবুঝতা, আকুলতা।
সাহিত্যে ‘ভাষা কোনো প্রধানতম কিছু না। এর ভালো উদাহরণ লালন, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল।