মেহফিল -এ- কিসসা কবিতা: ডিসেকশন ও আবৃত্তিযোগ্য নির্মাণ শাপলা সপর্যিতা

পেশা শিক্ষকতা। অরণী বিদ্যালয়ে বাংলা সাহিত্য ও সৃজনশীল লেখা বিষয়ের শিক্ষক হিসেবে কর্মরত। প্রকাশিত হয়েছে এই পৃথিবী এই দেশ ও নিভৃত পরবাস নামে দুটি কবিতার বই। টাইমমেশিন ও গুপ্তহত্যা অতঃপর নামে দুটি বড় গল্পের বই। মূলত উপন্যাস লিখছেন। বর্তমানে ‘সম্পর্কটি শুধুই জৈবিক’ নামে একটি ধারাবাহিক উপন্যাস লিখছেন। ঢাকায় বসবাস করেন।

কবিতা:ডিসেকশন ও আবৃত্তিযোগ্য নির্মাণ – ৯

কৃষ্ণা – সব্যসাচী দেব

কৃষ্ণা কবিতাটি যখন পড়ি তখন আসলে আমিই কৃষ্ণা।
আমার আবৃত্তির স্বর্ণযুগে কৃষ্ণা আবৃত্তি করবার সাহস হতোনা। সুযোগ তো নয়ই। আমার গুরু মাহিদুল ইসলাম স্টার বানাতেন। স্টার নামাতেন। একদিন একটি ট্যালেন্ট শো দেখছিলাম দর্শক সারিতে বসে। আমাদের গ্রুপের একজন আবৃত্তি করে নামবার সময় আমাকে দেখিয়ে বলছিলেন, ‘দেখো, আমি স্টার বানাই আমি স্টার নামাই।’ সে থেকে কথাটি মনের গভীরে গেঁথে রয়েছে। আজও আছে। তবু স্টার হবার কোনো বাসনা কোনোদিন কাজ করেনি আমার। তাই আমার বিচরণ মাটির কাছাকাছি। সুবিধেমতো কবিতা পাওয়াও ছিল আমার জন্য দুষ্কর। চিরকাল কবিতা ভালোবেসেছি। দলগত কোনো পদ কিংবা পদাধিকারের বল আমাকে কোনোদিন আকৃষ্ট করেনি। যে কারণে আমি সবসময় শিল্পের সাথে চলেছি পুরোপুরি নিবেদিত শিল্পপ্রাণরূপে। এখনো যখন লিখি তখনো সেই একই আমি। লেখার সাথে কোনো কিছুরই আপোষ নেই। কোনো উচ্চাশা নেই। ভালোলাগছে যতক্ষণ, প্রতিবেশ যতক্ষণ সহযোগী ততক্ষণ আমার কাজ। তারপর ছুটি। তখন দীর্ঘ যোগাযোগহীন থাকার পর খুব জোর চেষ্টায় সত্যি কথা বললে বাঁচার পথ খুঁজতে গিয়ে আবার নতুন করে আবৃত্তির সাথে যোগ হবো ভাবতে থাকি। ছোট ছোট বাচ্চা নিয়েই দলীয় চর্চায় যোগ হবার বাসনা। কারণ বাচ্চাদের কারো কাছে রেখে যাবার নেই। ততদিনে দল ভেঙেছে। স্রোত আবৃত্তি সংসদ আর নেই। তবু গুরু বদলাতে আমি রাজি নই। পুরাতন বন্ধু যত সকলে স্রোত নামে রয়ে গেল। আমি যোগ হলাম নতুনে পুরাতনের সাথে। তখন একটা ট্যালেন্ট শোর আয়োজন করা হলো। কবিতা পড়বো আমি আর আমার আবৃত্তি সহকর্মী শফিক। বেশ বড় বড় কবিতার যাচাই বাছাই আর চর্চার পর প্রায় আড়াই ঘন্টার প্রয়োজনা মঞ্চস্থ হতে যাচ্ছে। অনেক কবিতার মাঝে একটি হলো কৃষ্ণা। তখন দলে কৃষ্ণা পড়বার মতো আর কেউ নেই। আমি গ্রুপে খুব একটা যেতে পারিনা। নতুন যে সব মুখ দেখতে পাই তাদের সাথে মেলে না কিছুই। জেনারেশন বদলে গেছে অনেক। তারা কবিতাঅন্ত প্রাণ। তারা গুরুঅন্ত প্রাণ। তারা জীবন মরণ দলচর্চায় সঁপে দিয়ে কাজ করছে। আমার তবু মেলে না কিছুই। কদিন দলের সভায় যাতায়াত আর চর্চায় মেয়েদের খাওয়া পড়া ঘুম সবই উল্টে পাল্টে গেছে। তবু আমি পড়বো কৃষ্ণা। তখন আমারও ভেতরে আগুন। নীরবে পোড়ায় ধিকিধিকি। বলতে পারি না কিছু। জানাতে পারি না কাউকে। সমাজ সংসার স্বামী সন্তান সব যেন তখন অনন্ত আগুন। তার মাঝেও কবিতার প্রতি ভালোবাসা কমে না। কবিতার নেশা ছাড়েনা। নিজেকে প্রস্তত করি কৃষ্ণা পড়ার জন্য।
কৃষ্ণা-যজ্ঞের আগুন থেকে জন্ম যার। যজ্ঞসেন দ্রোণকে হত্যা করার জন্য পুত্র লাভের আশায় যে যজ্ঞ করছিলেন সেই আগুন থেকে পুত্রের সাথে সাথে আবির্ভুত হয়েছিলেন আর এক নারী। যার নাম কৃষ্ণা। নারীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ তিনি। যিনি খুব লম্বা নন যিনি খুব খর্বও নন মাঝারি গড়নের এক অতি অসাধারণ নারী। কৃষ্ণবর্ণা তিনি। আয়ত চোখের জন্মগত সুগন্ধা তিনি। কোকড়ানো দীর্ঘ চুলের কৃষ্ণার দেবলোক ছাড়া মানব কুলে দেখা পাওয়া দুর্লভ। এই অপরূপ সুন্দরী জন্মেছিলেন দেবতাদের অভিলাষে ক্ষত্রিয় ধ্বংসের জন্য। অসাধারণ রূপবতী সুন্দরী উচ্চ মেধা আর জ্ঞান সম্পন্ন কৃষ্ণা বাধ্য হয়েছিলেন পঞ্চপাণ্ডব অর্থাৎ যুধিষ্ঠির ভীম অর্জুন নকুল আর সহদেবকে স্বামী হিসেবে মেনে নিতে। অর্থাৎ পাঁচ ভাইয়ের একজন স্ত্রী কৃষ্ণা। যে কারণে তাকে পাঞ্চালিও ডাকা হয়। কিন্তু ধনুর্ধ্বর অর্জুনই ছিল তার কাঙ্খিত। কৌরব পাণ্ডবের চিরকালীন শত্রুতার যুদ্ধের স্বার্থের স্বার্থ হননের প্রতারণা প্রবঞ্চনা রক্তক্ষয় আর খুন জখম হত্যার নারকীয় আর অমানবীয় অপরূপ অসাধারণ এক অমর সাহিত্য মহাভারতের অনন্য চরিত্র পাঞ্চালি। যিনি কর্ণেরও কাম্য ছিলেন। যজ্ঞসেন কৃষ্ণার জন্য পাত্র বেছে নিতে সয়ম্বরসভার আয়োজন করেছিলেন। সেখানে কর্ণও ধনুকে বাণ সংযোগ করেছিলেন। কিন্তু কৃষ্ণা সূতপুত্র রাধার সন্তান কর্ণকে মেনে নেননি। অর্জুন লক্ষ্যভেদ করে জিতে নেন কৃষ্ণাকে। বাড়িতে ফিরলে মাতা কুন্তীকে যখন ডেকে অর্জুন বলেন, ‘দেখুন কি নিয়ে এসেছি।’ মা না দেখে বলে দেন, ‘যা এনেছ পাঁচ ভাই ভাগ করে নাও।’ মাতৃ আদেশ পালনে পাঁচভাই দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির কে দিয়েই শুরু হলো ধর্মের অবমাননা। অর্জুনাকাঙ্খায় আসক্ত কৃষ্ণার শরীর প্রথম স্পর্শ করলেন যুধিষ্ঠির। এই করে প্রতিরাতে এক একজন স্বামীর সাথে বসবাস আর সহবাসে কৃষ্ণার অবর্ণনীয় অমানবিক বৈবাহিক জীবনের শুরু। প্রকৃত কাহিনিতে এ নিয়ে কৃষ্ণার খুব যে অনুযোগ তা দেখা যায়নি তেমন করে। বরং তিনি ছিলেন ধর্মপালনে সংহিতা। কিন্তু তিনি ছিলেন অর্জুনাকাঙ্খী, এ স্পষ্ট্। পরবর্তীতে কৌরবের অন্ধরাজা ধৃতরাষ্ট্রের পুত্র দুর্যোধনের বিস্তৃত মায়াজালে পাশা খেলায় হেরে যান যুধিষ্ঠির। একে একে দ্যূতপণে সব হারান। অবেশেষে পণ রাখেন নিজের এবং বাকি চার ভাইয়ের স্ত্রী কৃষ্ণাকে। অপমানিতা কৃষ্ণাকে দ্যূতসভায় সকলের সামনে আনার এক নোংরা নীচ হীন কুৎসিত খেলায় মেতে ওঠে কৌরব রাজগৃহের বৃদ্ধ জওয়ান সকলে। পঞ্চপাণ্ডবের প্রতি বিদ্বেষ ঘৃণা হিংসা আর স্বার্থপরতার সকল গিয়ে পড়ে নারী শরীরের ওপর। অসাধারণ সুন্দরী বিদুষী কৃষ্ণার রূপ লাবণ্য যেন চর্বচোষ্যলেহ্যপেয় হয়ে দাঁড়ায় দূতসভায়। একবস্ত্রে কৃষ্ণাকে এনে দাঁড় করানো হয় দূতসভায় সহাস্য লোলুপ কৌরব আর নতমস্তিষ্ক পঞ্চপাণ্ডবের সামনে। কৃষ্ণার বস্ত্র হরণে উদ্যত যখন পুরো কৌরব দ্যুতসভা কোনোভাবেই নিবৃত্ত করা যায়নি কর্ণ থেকে শুরু করে শকুনি কাউকে তখনই কৃষ্ণার প্রিয় সখা কৃষ্ণ আড়াল থেকে কৃষ্ণার আবক্ষ আবরণ দিয়ে বরাবর রক্ষা করে চলেন। কিন্তু অদ্ভুত যে এই জনসমাবেশে তীব্র অপমানের পরও কৃষ্ণাকে বর দিতে চাইলে তিনি যুধিষ্ঠির সহ বাকি পাঁচজন স্বামীর দাসত্ব মুক্তিই চেয়েছিলেন রাজা ধৃতরাষ্ট্রের কাছে। কৃ্ষ্ণা নানা অনুযোগ আর অভিযোগে তিরস্কার করেছেন ঠিক কিন্তু ধর্ম আর পঞ্চপাণ্ডবকে রক্ষার জন্য যাবতীয় চেষ্টাও করে গেছেন।
এইযে আপাত কৃষ্ণা নামের মহাভারতের নারী চরিত্রটি তাকেই এই নতুন আদলে গড়েছেন কবি সব্যসাচী দেব। এ কৃষ্ণা যজ্ঞের আগুন সম্ভুত হলেও বড় বেশি মানবীয়। সব্যসাচী দেবের সৃষ্ট নতুন আর এক কৃষ্ণা। যে একজন প্রেমিকেই কামনা করে। যে দেবতার সৎবাক্য কিংবা ভবিতব্যকে মেনে নিয়ে হাসিমুখে পাঁচ ভাইকে একই সাথে স্বামীরূপে বরণ করতে একেবারেই স্বীকৃত নয়। তবু তাকে ধর্মাধর্মের ক্ষুরধার পথে ঠেলে দেওয়ার দুর্দান্ত প্রতিবাদ রয়েছে কবিতাটির শব্দে শব্দে বাক্যে আর ভাষায়। একজন প্রেমজ নারীর প্রিয় ও কাম্য যে পুরুষ সে ব্যতীত তার বড়ভাই যখন নারীর শরীর স্পর্শ করে সে বেদনার ভারে সব্যসাচী দেবের কৃষ্ণা আমূল ভারাক্রান্ত। তার বাক্যে তাই ঝরে পড়ে তীব্র শ্লেষ;
-আপনার কোনো বিচরণ নেই। আপনার ধর্ম আপনাকে
রক্ষা করেছে বিকার থেকে-কৃতজ্ঞতা জানান সেই ধর্মকে।
পাঁচভাই যখন মাতার আদেশে এক নারীকে স্ত্রীরূপে গ্রহণ করতে সম্মত এমনকি ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠিরও যখন সুন্দরী বিদুষী অনাঘ্রাতা নারীর লোভ সংবরণ করতে পারলেন না তখন এক মারাত্মক জটিলতা উপস্থিত হলো। তখন ব্যাসদেব এসে পূর্বজন্মে দ্রৌপদীর পঞ্চস্বামীর বরপ্রাপ্তির কথা জানিয়ে আশ্বস্ত করলে কৃষ্ণা খুশি মনে স্বামী সংসার করতে চলেন। কিন্তু সব্যসাচী দেবের কৃষ্ণা এমন নয়। এ কৃষ্ণা বেশি পরিমানে মানুষ। এ কৃষ্ণা বেশি পরিমাণে নারী। যে ধর্মের এইসব কূটচালকে অস্বীকার করে;

-আামি সর্বজ্ঞা নই। যজ্ঞভূমের অগ্নি থেকে
আমার জন্ম, ধর্মাধর্মের ক্ষুরধার পথ আমার আজানিত,
আর্যপুত্র, আপনার বিচার তাই আমার পক্ষে ধৃষ্টতা
এমনকি দ্রুপদ রাজার সয়ম্বর সভাতে অর্জুন ধনুর্বাণ নিক্ষেপ করে যখন সয়ম্বর সভায় দ্রৌপদীকে জিতে নিলেন তখন তিনি ভেবেছিলেন তিনি অর্জুনেরও কাঙ্খিতা। কিন্তু পরে তিনি দেখতে পান তিনি আসলে যুদ্ধে প্রতিপক্ষের হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে বলবীর্য প্রকাশের এক অনন্য মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছেন। নিচের কথাগুলোতে সে যাতনা চুড়ান্ত প্রকাশ
কৈশোর থেকে তুমি জেনে এসেছ, বীরভোগ্যা পৃথিবী আর রূপমুগ্ধা নারী
জেনেছ একদিন ধৃতরাষ্ট্রের হাত থেকে ছিনিয়ে নিতে হবে
কৌরব-উত্তরাধিকার; জেনে এসেছ যেখানে যা কিছু সর্বোত্তম
সেখানেই পৌঁছুতে হবে তোমাকে। এই কুমারী লক্ষ্যের
দিকেই তোমার দৃষ্টি ধনঞ্জয়।
১২ বৎসর ব্রহ্মচর্য পালন করে যখন অর্জুন সুভদ্রাকে নিয়ে ইন্দ্রপস্থে এসে উপস্থিত হলেন তখন কৃষ্ণা কেবল একটি বাক্যে তার প্রতিবাদ করেছেন;

-হে কৌন্তেয়, তুমি সুভদ্রার নিকটেই যাও, দৃঢ়তর অপর বন্ধনের দ্বারা পূর্বের বন্ধন শিথিলতা প্রাপ্ত হয়
কিন্তু কবিতার কৃষ্ণা এক দারুণ মানুষ। যিনি এই বিষণ্ণ ব্যথা সহজে গ্রহন করার মতো দেবীত্বশক্তিতে শক্তিশালী নন। তাই অর্জুনের প্রতি চরম আক্ষেপ কবিতাটির কিছু পর পরই ধ্বনিত হয়েছে। সেখানে অর্জুনের নারীর প্রতি লোলুপ দৃষ্টিভঙ্গি ও নারীসঙ্গে আসক্তির প্রতি চরম ঘৃণা সাথে অর্জুনের প্রতি নিজের পরম ভালোবাসার কথাই প্রকাশিত হয়েছে;

ইন্দ্রপ্রস্থের সৌধ-শিখরে যখন আছড়ে পড়তো
নবর্ষার জলধারা, যখন আমার কামনা ছুঁতে চাইতো তোমাকে,
আমার অনুৎসুক দেহকে তখন আকর্ষণ করতো অন্য কেউ,
যে আমার স্বামী, বসন্ত রজনীতে কিংসুকের প্রমত্ত উল্লাস-যাপনের মুহূর্তে
তোমার ব্যাকুল বাহু টেনে নিতে আমাকে নয়, অন্য কোনো যুবতীকে
এই যে বহুভোগ্যা নারীর মনোবেদনার করুন রূপটি কবি সব্যসাচী দেব এঁকেছেন তা পৃথিবীব্যাপী যে কোনো নারীরই মনোবেদনার মূর্ত এক রূপ। যা মহাভারতের কৃষ্ণার আবরণ খুলে ধর্ম আর রাজনীতির জটিল কুটিল বেড়াজাল ভেঙে এসে মিলে গেছে খুব সাধারনে, জনমানুষের কাছাকাছি। তাই পঞ্চস্বামীর ঔরসে বীর সন্তানের জননী মানুষী কৃ্ষ্ণা কবিতায় অস্বীকার করছেন তার সন্তান ধারণের আনন্দকে যাপন করতে না পারার ঘৃণা আর ধিক্কারের সাথে;

বারে বারে আমাকে সন্তানবতী করেছে পুরুষ কিন্তু
তারা প্রত্যেকেই আমার আকাঙ্খিত নয়।
সমস্ত কবিতাটির পংক্তিতে পংক্তিতে তাই কৃষ্ণা এক অতিমানবীর চরিত্রের খোলশ ছেড়ে নেমে এসেছেন সাধারণে। যে কারণে নানা জায়গায় ধর্মের নামে নারীসম্ভোগের অবর্ণনীয় বেদনার চিত্র আঁকা হয়েছে কবিতাটিতে যা নারী মাত্রই সমব্যথায় ভারাক্রান্ত করেছে। দ্যুতসভায় দাঁড়িয়ে বস্ত্র ছিনিয়ে নেবার প্রতিবাদে মুখর সব্যসাচী দেবের কৃষ্ণা প্রতিপদে ঘৃণা আর ধিক্কার দিয়েছেন বল প্রদর্শনের তাস হিসেবে নারীকে ব্যবহারের এই অনৈতিক রাজনীতির কূটচালকে। অন্তসারশুন্য রাজনীতি, নৈতিকতা বিহীন শাসক, পেশীশক্তির উপাসক ক্ষত্রিয় পুরুষ এবং ব্রাহ্মণ কিংবা বয়োবৃদ্ধ পুরুষ সকলের প্রতি তীব্র অনাস্থা প্রকাশ করেছেন শেষের কটি লাইনে;

প্রতিকার চাইছি না।
যা শুধু বিলাসের, সে বস্ত্র ছিনিয়ে নেয় যদি
কোনো দুঃশাসন-নিক্, আমি কাঁদছি না।
চারপাশে ভাঙানের ডিঙায় পশুদের উদ্দাম নাচের ভঙ্গি
আমি দেখছি না।
চারপাশে ক্লীবদের অক্ষম বিলাপ
আমি শুনছি না।
ধনুর্বান নেই।
আমি ফিরিয়ে আনছি আমার জন্মের স্মৃতি, যজ্ঞের আগুন
দ্রৌপদী নই, নই পাঞ্চালী, নই ভরতকুলবধূ,
আমি কৃষ্ণা, যজ্ঞাগ্নি – সম্ভূতা। শুধু নারী এক।

আমার জন্য এই কবিতাটি আবৃত্তিযোগ্য নির্মাণ আর অত সহজ রইলো না। একে তো বোধের ব্যাপ্তি তখন বয়সের সাথে সাথে গভীরে। ছাত্র জীবনে যেমন যখন খুশি তখন চর্চা করার সুযোগ হতো। হলের রূমমেটটা কেউ যখন রূমে থাকতো না যখন তখন দাঁড়িয়ে পড়তাম আয়নার সামনে এখন আর সে দিন নেই। পড়ালেখা কিংবা বইপত্র থেকে কত কত দূরে আমি। তাছাড়া তখন ছিল দলীয় চর্চা। এখন আমি একা। আবার নতুন করে পাঠ শুরু করি মহাভারতের দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ অংশ। বাচ্চা কেঁদে ওঠে। তাকে শান্ত করি। চুলোয় রান্না দেখি। স্বামী ফিরবেন তার খাবারের আয়োজন করি। মধ্যরাতে যখন পড়তে বসবো তখন আলো জ্বালাতে স্বামীর ঘুমের সমস্যা। বাচ্চা কেঁদে ওঠে ঘুমের মাঝে। রয়েছে সংসারের হাজার ব্যস্ততা। দশ হাতে সংসারের যাবতীয় কাজ। রয়েছে সংসারের নানা জটাজাল আর এ যাবত অনাড়ম্বর এক যাপিত জীবনের করাল ভয়ঙ্কর সময় যাপন। তবু কৃষ্ণা পড়তে শুরু করি। প্রথম প্রথম খুব ইনকনফিডেন্ট সব। তখন ওই প্রযোজনাতে পড়বার আর সব কবিতা তৈরী। কেবল কৃষ্ণা নিয়ে পড়ে আছি পেছনে। এই যজ্ঞাগ্নি সম্ভূতার সমূর্তির আবির্ভাবে লিখে যাওয়া শব্দ বাক্য পড়ি আর কেঁপে কেঁপে উঠি। নিজেরই ভেতর কোথায় যেন টের পাই কৃষ্ণার অভিমান কৃষ্ণার অবহেলা কৃষ্ণার যাতনা প্রতিবাদ কিংবা বিশেষ বেদনার চরমতম রূপ। তখন আমিও অস্বীকার করতে চাই এ সংসার মায়ামমতার বন্ধনের নামে জটিলতর একক গোপন গভীর নিষ্পেশন। নিজেকে কৃষ্ণায় রূপান্তরিত করতে আমার সত্যিই সেদিন কষ্ট হয়েছে অনেক বেশি। কিন্তু অবশেষে কবিতাটি দাঁড়িয়েছিল অসাধারণ এক আবৃত্তিযোগ্য নির্মাণে। সেদিন ঢাকা শহরে হরতাল। হেফাজতে ইসলাম নামে ফান্ডামেন্টলিস্টদের তাণ্ডব তুঙ্গে। লোক সমাগম হবে কি হবে না ঠিক নেই। দুপুর বারোটা অবধি শিল্পকলায় চর্চা শেষে এই অস্থির রাজনৈতিক পরিবেশে সেগুনবাগীচা থেকে একা মোহাম্মদপুরে আসা যাওয়া। গুড়িগুড়ি বৃষ্টিতে ভিজে যাওয়া পথ ঘাট পেরিয়ে আদৌ দর্শক শ্রোতার আগমন সম্ভব কি না এতসব দ্বিধা দ্বন্দ্বের মাঝ দিয়ে এসে যখন দাঁড়াই পাবলিক লাইব্রেরীর অন্ধকার মঞ্চে তখন হল ভর্তি শ্রোতাদর্শক, আমি বিস্মিত। আর সাথে সাথেই কোথা থেকে ফিরে আসে তুমুল আত্মবিশ্বাস। মঞ্চায়িত হয় এক অসাধারণ হৃদয়বিদারক কবিতা সফল আবৃত্তি। মঞ্চ ভরা দর্শক নীরব ব্যথায় হয়েছিলেন ভারাক্রান্ত আগেও বহুবার বহুজনের আবৃত্তি করা কৃষ্ণা কবিতার উপস্থাপনে।
আমার কোনো শোক নেই, অোমার কোনো বিষাদ নেই,
হে কুরু বৃদ্ধগণ, আপনাদের নীরবতায় আমার কোনো ক্ষোভ নেই।
পিতামহ ভীষ্ম, ক্ষমা করবেন
আপনাকে প্রণতি জানাবার স্থিরতা আজ নেই।
আর কর্ণ, তোমার জন্য ঘৃণাও বড় বেশি মনে হয়।
আর হে আমার পঞ্চস্বামী, আর্যাবর্ত বিজয়ী বীরশ্রেষ্ঠ অর্জুন,
শক্তিমান ভীম, নকুল, সহদেব আর আপনি ধর্মপুত্র
আপনারা সবাই আমার কৃতজ্ঞ অভিবাদন গ্রহণ করুন।
আমি সর্বজ্ঞা নই। যজ্ঞভূমের অগ্নি থেকে
আমার জন্ম, ধর্মাধর্মের ক্ষুরধার পথ আমার অজানিত,
আর্যপুত্র,; আপনার বিচার তাই আমার পক্ষে ধৃষ্টতা
আপনার কোনো বিচলন নেই। আপনার ধর্ম আপনাকে
রক্ষা করেছে নেই বিকার থেকে-কৃতজ্ঞতা জানান নেই ধর্মকে
ভীম সেন, তোমাকে আমি ভালোবাসা দিইনি কখনো
তাই তা ফিরেও চাইনি।
শুধু তোমাকে আামার জিজ্ঞাসা ছিল ফাল্গুনী,
উর্ধ্বচারী মৎসের ছায়ালীন চোখের থেকেও দুর্লক্ষ্য কি
দূর্যোধনের বুক-বল সত্য করে। প্রেম নয়
শুধু পৌরুষের আস্ফালনই কি ছিল পাঞ্চালী বিজয়ের পটভূমি।
কিন্তু মিথ্যা প্রশ্ন; আমি জানি তোমার কোনো উত্তর নেই
যেমন নেই কোনো ভালোবাসা

তোমার শুধু আশা আছে; কৈশোর থেকে তুমি
জেনে এসেছ, বীরভোগ্যা পৃথিবী আর রূপমুগ্ধা নারী
জেনেছ একদিন ধৃতরাষ্ট্রের হাত থেকে ছিনিয়ে নিতে হবে
কৌরব-উত্তরাধিকার; জেনে এসেছ যেখানে যা কিছু সর্বোত্তম
সেখানেই পৌঁছুতে হবে তোমাকে। এই কুমারী লক্ষ্যের
দিকেই তোমার দৃষ্টি ধনঞ্জয়। তাই অনায়াসে তুমি সরে যাও
এক নারী থেকে অন্য রমণীতে; তোমার পূর্ব পুরুষেরা যেমন একদা
এক তৃণ প্রান্তরকে নিঃশেষ করে চলে যেতেন বনান্তরে
এই দ্যূতসভায় দাঁড়িয়ে আমাকে জানতে হলো
নারী শুধু কয়েক প্রহরের বিলাস সঙ্গিনী।
মণিময় হার, শত সহস্র তরুণী দাসী, দান্ত মাতঙ্গ
গন্ধর্বপ্রেরিত অশ্বযুথ আর আমি পান্ডুপুত্রবধু
এক পংক্তিতে দাঁড়িয়ে আমরা সবাই অপেক্ষায়।
পিতৃগৃহে যেমন দেখেছিলাম, আহরিনীরা দূর গ্রাম থেকে
নিয়ে আসে তাদের পসরা আর তার উপর ঝুঁকে পড়ে
লু্ব্ধ ক্রেতার দল – আামাকে ব্যবহার করার জন্য
তেমনি উন্মুখ হয়ে আছে, যাঁরা আমার পতির আত্মীয়।
আর আমাকে বিলিয়ে দিচ্ছেন যারা
তারা আমার পঞ্চস্বামী – বিবাহের মঙ্গলসূত্র হাতে বেঁধে যারা
একদিন আমার উপর নিয়মসিদ্ধ করেছিলেন তাঁদৈর অধিকার।
না, শুধু রত্নমন্ডিত সভাগৃহেই নয়-
আরও আগে আমাকে জানতে হয়েছিল,
আমার কোনো বাসনা নেই, নেই কোনো ইচ্ছা।
অর্জুন তোমাকে প্রথম দেখার মুহূর্তে আমার হৃদয় দিয়েছিলাম তোমাকে;
অথচ আমার শরীরকে প্রথম আলিঙ্গন করলেন
ঐ মহাভাগ, যাঁর খ্যাতি ধর্মপুত্র বলে।
ইন্দ্রপ্রস্থের সৌধ-শিখরে যখন আছড়ে পড়তো
নববর্ষার জলধারা, যখন আমার কামনা ছুঁতে চাইতো তোমাকে,
আমার অনুৎসুক দেহকে তখন আকর্ষণ করতো অন্য কেউ,
যে আমার স্বামী, বসন্ত রজনীতে কিংসুকের প্রমত্ত উল্লাস-যাপনের মুহূর্তে
তোমার ব্যাকুল বাহু টেনে নিতে আমাকে নয়, অন্য কোনো যুবতীকে।
বারে বারে আমাকে সন্তানবতী করেছে পুরুষ
কিন্তু তারা প্রত্যেকই আমার কাঙ্খিত নয়।
কোনো প্রার্থনা নেই আমার । কুরুবৃদ্ধরা বিলাপ করুন।
জৈষ্ঠ পাণ্ডব, প্রহর গুনুন কোনো পূণ্যলগ্নে
ধর্মরাজ্য নেমে আসবে মাটিতে; ভীম অনুগ্রহ করে স্তব্ধ হও
নকূল, সহদেব বিচ্যূত হয়োনা অগ্রজের প্রতি অটল বিশ্বাসে;
আর অর্জনু, অন্তঃপুরে যাও, সেখানে তোমার জন্য
স্নিগ্ধ শরীর বিছিয়ে রেখেছে কোনো প্রেয়সী।
শোক নয়, লজ্জা নয়; এই রাজগৃহে দাঁড়িয়ে
আমি জানলাম, প্রেম নয়, অধিকার নয়
নারী শুধু প্রয়োজনের। জানলাম, এখানে কোনো
ভেদ নেই ধর্মপ্রাণ যুধিষ্ঠির, শক্তিমান ভীম, প্রেমিক অর্জুন
আর লোলুপ ধৃতরাষ্ট্র নন্দনদের মধ্যে।
প্রতিকার চাইছিনা।
যা শুধু বিলাসের, সে বস্ত্র ছিনিয়ে নেয় যদি
কোনো দুঃশাসন-নিক্, আমি কাঁদছি না।
চারপাশে ভাঙানের ডিঙায় পশুদের উদ্দাম নাচের ভঙ্গি
আমি দেখছি না।
চারপাশে ক্লীবদের অক্ষম বিলাপ
আমি শুনছি না।
ধনুর্বান নেই।
আমি ফিরিয়ে আনছি আমার জন্মের স্মৃতি, যজ্ঞের আগুন
দ্রৌপদী নই, নই পাঞ্চালী, নই ভরতকুলবধূ,
আমি কৃষ্ণা, যজ্ঞাগ্নি – সম্ভূতা। শুধু নারী এক।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।