আমার প্রতিটি অক্ষরের পেছনে যেমন রাজমিস্ত্রিদের হাত আছে তেমনি গদ্যজীবনের সূচনায় রয়েছে ইমারতিদ্রব্য। এর থেকেই বোঝা যায় কথাসাহিত্য আসলে একটা নির্মাণ। ইঁট গাঁথার মতই অক্ষর গেঁথে গেঁথে গদ্য লিখতে হয়।
ঐক্য বাক্য মাণিক্য পেরিয়ে নিজে নিজে শব্দ ভাঙতে শুরু করি।পুতুল খেলার মতোই পেয়ে বসে শব্দখেলা। একদিনের কথা স্পষ্ট মনে আছে।বাড়ির সামনে বিকেলে, হয়তো মাঠে খেলতে যাবার প্রাক মুহূর্তে নিজের মনে মনে বলছিলাম- চয়, পরি, চয়, পরি, চয়। পরিচয় শব্দটা এভাবে ভাঙতে ভাঙতে দেখছিলাম সেগুলোর কী মানে দাঁড়ায়। ভাঙ্গার যে কী অসীম শক্তি তা তো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ দেখিয়েছে। অণু, পরমাণু, ইলেক্ট্রন, প্রোটন, নিউট্রন-ফিশনের কত শক্তি। শব্দ তো ব্রহ্ম। এখনও লিখতে বসলে মাথায় ঘোরে চয়, পরি চয়, পরি, চয়।
তখনো দোতলা ওঠেনি, শীতকালের বেলা। একতলার বারান্দায় গ্রিলের ফাঁক দিয়ে রোদ এসে পড়েছে। মায়ের নিজের হাতে মোছা লাল তকতকে মেঝেতে আলোয় ছায়ায় কী মায়া! একবার আলো, একবার ছায়াতে লাফাতে লাফাতে মুখে মুখে বানিয়ে ফেললাম
‘আলো ছায়ার সঙ্গে মোদের
খেলা রে ভাই খেলা
আলোছায়ায় পা ফেলে ভাই
কাটিয়ে দিই রে বেলা’
এই আমার মা নিষাদ। বছর ছয়েক বয়স তখন। এরপর দোতলা ওঠে। দোতলার জানলাহীন, ফাঁকা ঘরগুলোয় খেলার দারুন মজা। একদিন আবিষ্কার করি, একটা ঘুলঘুলিতে চড়াইপাখি বাসা করেছে। পাড়ার কয়েকজন ছিল সঙ্গে। সবাই মিলে প্ররোচনা চলে চড়াইয়ের ডিম কেমন হয় দেখব। ঝুলঝাড়ু দিয়ে খোঁচা দেওয়া হয় সদলে। তরল জেলির মত প্রাণ, একটা চটচটে অস্বস্তির মত লেগে রইল আজীবন। এটা বুঝতে পারি, একা মানুষ অনেকসময়ই হিংসা সংঘটিত করতে পারে না, কিন্তু যখন সে জনতার একজন, তখন তার চরিত্র বদলে যায়। সে তখন হিংস্র, মারমুখী, হিতাহিতজ্ঞানহীন। এই বোধ আমাকে আজীবন একা করে রেখে দিল, কোন দলে ভিড়তে দিল না।
দোতলা উঠতে থাকে। এর মধ্যে একদিন আমি কখন যে বাবার লম্বা কবিতার খাতায় বাবার কবিতার ওপর এক অপূর্ব কবিতা লিখে ফেলি লাল পেন্সিল দিয়ে, তাতে কোন এক শিষ্ট বাঁদরের বাদামি চাদর গায়ে দেবার বর্ণনা ছিল। সেটা দেখে বাবা কেন জানি একটুও খুশি হল না। আমার জন্য ধার্য হল এক অভিনব শাস্তি। একটা বড়সড় লাল টুকটুকে বাঁধানো খাতা আমায় দিয়ে বলা হল ‘যাও, রাসমাঠে গিয়ে কিছু লিখে নিয়ে এসো’ বাবা কিন্তু বলল না – পাশের ঘর বা বারান্দায় গিয়ে বসে লেখো। বরং আমাকে বাইরে পাঠিয়ে দিল। নিজেকে খুঁজে নিতে বলল নিজের জায়গা, এই বিরাট বিশ্বচরাচরের মধ্যে থেকে।
এইখানে আমার, নচিকেতার গল্পটা মনে পড়ে। এত চমৎকার বলত বাবা।
সেই যে নচিকেতার বাবা ঋষি বাজশ্রবা দুর্বল, মরোমরো গরুগুলি ব্রাহ্মণদের দান করছিলেন। দেখে এত খারাপ লাগছিল নচিকেতার। নেহাতই বালক সে, গিয়ে বাবাকে বলল ‘বাবা আমাকে আপনি কাকে দান করলেন?’ প্রথমে তার বাবা তাকে উপেক্ষা করলেন।নচিকেতা কিন্তু একই প্রশ্ন করে যাচ্ছিল।তাতে বাজশ্রবা ক্ষেপে গিয়ে বললেন ‘যাও, আমি তোমাকে যমকে দান করলাম’
এই অব্দি বলে বাবা এর সঙ্গে একটা খুব মজার বাক্য জুড়ে দিত- অমনি নচিকেতা গুট গুট করে পিলখানা থেকে বেরিয়ে গেল!
পিলখানা? বাবা খুব ভালো করেই জানত, পিলখানা হাতির খোঁয়াড়। নচিকেতার বাবা তো হাতি দান করছিলেন না, দান করছিলেন গরু। কিন্তু পিলখানা বলায় এখানে একটা চমৎকার গল্পের আমেজ এল। আমিও দুটো জিনিস শিখলাম’
১/ অচলায়তন শিক্ষাব্যবস্থা আসলে পশুর খোঁয়াড় ছাড়া কিছু নয়।
২/ গল্প লিখতে গেলে বাস্তবের কিছু বেশি দিতে হবে। যাকে বলতে পারি হেডস্পেস।বাস্তব আসলে সাহিত্যের টেক-অফ পয়েন্ট। তারপর পুরোটাই কল্পনার উড়ান। যার যেমন ক্ষমতা, সে ততটা ওড়াবে।
আমিও বুকে খাতা জাপটে গুটগুট করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলাম নচিকেতার মত। বড় হয়ে জেনেছি নচিকেতা মানে, যে জানে না, কিন্তু জানার অসীম কৌতূহল। আমিও তো নচিকেতা আজীবন। দেখতে পাচ্ছি খাতা নিয়ে বসে আছি, ওই যে রথের ওপর পা ঝুলিয়ে। তিনশ বছরের পুরনো রথ, দেড়তলা উঁচু। প্রতিবছর রথের সময় রঙ হয়, মেরামত হয়। মোটা মোটা লোহার শেকল, সারাবছর রথের নিচে গোটানো থাকে, যেন ময়াল সাপ। এই রথের উল্টোদিকে একটা ভাঙ্গাচোরা বাড়ির বারান্দায় বিকেলে দুই প্রৌঢ় নরনারী এসে বসে। সাদা ধপধপে ধুতি, শাড়ি, গায়ের রঙও তাই।ভাবতাম এরা স্বামী স্ত্রী। কিন্তু কেউ একজন, হয়তো সেই থ্যাবাই হবে, জ্ঞানচক্ষু উন্মীলন করে বলে, এরা নাকি ভাই বোন। বলেই একটা ফিচেল হাসি দেয়। এদের সবাই বলে নেড়া নেড়ি। বাবার মুখে পরে শুনেছিলাম এই নেড়ানেড়ি একটা নিন্দাসূচক শব্দ, এর নেপথ্যে নাকি বৌদ্ধ মঠে মেয়েদের নেওয়া শুরু হওয়া ও তার ফলশ্রুতিতে সঙ্ঘে ভাঙনের ইতিহাস আছে।
রোজ বিকেলে আমরা রথের দোতলায়, যেখানে আষাঢ়ে রথের দিন দশাসই চেহারার তিন পুরোহিত উঠে জনসমুদ্রে ছোট ছোট বেলকুঁড়ির মালা ছুঁড়ে দেয়, সেখানে উঠে আমরা রথটাকে ঘিরে ঘুরি আর ছড়া কাটি-
‘চুল টানা বিবিয়ানা
সাহেবমেমের বৈঠকখানা’
ছড়া কাটি আর নেড়ানেড়ির দিকে তাকাই থেকে থেকে। কখনো রথের ভেতরে ঢুকে লুকোচুরি খেলি। ‘সাপখোপ আছে, যাস না’ বড়দের বারণ সত্বেও বারবার সেখানে ঢুকি আমরা আর গা শিরশির করে। সরসর করে কীসব যেন সরে যায়। হামাগুড়ি দিয়ে না চললে প্রতি মুহূর্তে মাথায় ঠোক্কর, ধুলো ঝুলের অন্ধকারে কোথা থেকে আসা এক চিলতে আলো, পায়ের নিচে রথের চাপে হলুদ হয়ে যাওয়া ঘাস, ছাগলের নাদি, আইসক্রিমের কাঠি, প্লাস্টিকযুগের এত রমরমা ছিল না বলে থাকত না চিপস চকোলেট বা কন্ডোমের প্যাকেট! কী অদ্ভুত একটা গন্ধ সবমিলিয়ে। একটা অন্য, রহস্যময় পৃথিবী।
সেই রহস্যময়তার রথে চড়ে খাতা বাগিয়ে আমি কী লিখলাম? এই মাঠ, কোশাঘাট, শিবমন্দির, চাঁদ, তারা, ফুল, কিচ্ছু না। লিখলাম ‘সিমেন্ট কিনে এবছর আমাদের খুব লস হয়েছে।’
বাড়িতে মাঝে মাঝে এসব আলোচনা কানে আসত। তখনো বাড়ি ব্যাপারটা প্রোমোটাররাজের হাতে চলে যায়নি। বাড়ি হচ্ছে মানে বাড়ির লোকেদের সঙ্গে রাজমিস্ত্রির থেকে থেকে সিটিং, চা, আড্ডা। পুরো ব্যাপারটার মধ্যে একটা গেরস্ত ছোঁয়া ছিল। কর্পোরেট হয়ে যায়নি।মাঝরাতে রাসমাঠে লরি এসে থামত, পাণ্ডুয়ার বালি নিয়ে। কখনো আবার রায়চৌধুরীদের আপত্তিতে রাসমাঠে ঢুকতে দেওয়া হত না লরি, সে নিয়ে কি উত্তেজনা।পরের দিন সকালে ঘুম ভাঙত চায়ের কেটলি আর রোদের ঠোকাঠুকির আওয়াজে, ভেসে আসত মধ্যরাতের লরি, পাণ্ডুয়ার বালির কথা।রোদ, স্টোনচিপস, সিমেন্ট, বালি। এইসব শব্দ ঢুকে যাচ্ছিল আমার অক্ষরশরীরে। এরাই হয়তো প্ররোচিত করল ওইরকম একটা বাক্য লিখতে। সেই সপাট ঋজু গদ্য বাক্যটি আমাকে এখনও বিস্মিত করে। অথচ তারপর দীর্ঘদিন প্রকাশ্যে গদ্য লিখি নি।
এরপর একটা মজার ব্যাপার হল। পাশের বাড়ির দিদি পাড়ার ছেলেমেয়েদের জুটিয়ে একবার নাটক করিয়েছিল। একটা রূপকথার গল্প, যেখানে সত্য বলে এক রাখাল বালকের সঙ্গে এক রাজকন্যার প্রেম হয়। প্রতিদিন বিকেলে গিয়ে খুব মন দিয়ে রিহার্সাল দেখতাম, বাগানের দিকের বারান্দায় সে নাটক অভিনীত হতেও দেখলাম।কিন্তু পছন্দ হল না একটুও। আমাকে কোন পার্ট দেওয়া হয়নি, সেটার জন্যে হতে পারে, কিন্তু সেটাই মুখ্য কারণ নয়। আমার মনে হয়েছিল, এর থেকে অনেক ভালো নাটক আমি লিখতে পারি।
ব্যস, লিখতে শুরু করলাম। সে এক রোমহর্ষক ব্যাপার।একটি মেয়ে, সে আবার সমাজবিরোধী গুন্ডা, পুলিশের গুলি খেয়ে মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে বলে যাচ্ছে, তার এই পরিণতির জন্যে কারা দায়ী। আসল অপরাধী কারা? এরপর পুরো নাটকটাই ফ্ল্যাশব্যাকে। ভাবা যায়? আসলে পড়তে শেখারও আগে তো সিনেমা দেখার শুরু। আর এই ভালো গুন্ডা ও তার কৈফিয়ত সেই সিনেমাবাহিত হয়েই আমার মাথায় ঢুকেছিল নিশ্চয়। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার হচ্ছে, আমি তখনো অভিশপ্ত চম্বল পড়িনি, কিংবা মেয়েমস্তান কেন্দ্রিক কোন সিনেমাও দেখিনি। আজকাল অনেকে বলেন আমি নাকি লেখায় বহুত মাস্তানি করি, সে হয়তো আমার আদিযুগের সেই নাটকটির প্রভাব!
অনেক ভালো জিনিসের মত সেই নাটকটিও হারিয়ে গেছে। বেশ কিছু রিহার্সাল হয়েছিল।সেইসময় পোশাক, সংলাপ ইত্যাদি নিয়ে তর্কাতর্কি প্রায় মারামারির পর্যায়ে চলে যেত। নাট্যকারকে পরিচালক তার সুবিধেমত দু একটা চরিত্র আমদানি করতে বলেছিল, কিন্তু নাট্যকার নিজের জায়গায় অনড়। হয়তো এইসব কারনেই সে নাটক আর মঞ্চস্থ(বারান্দাস্থ) হয়নি। বহু পরে ক্লাস এইটে পড়াকালীন লক্ষ্মীর পরীক্ষা নাটকটিরও একই পরিণতি হয়েছিল। প্রচুর আলোচনা, তর্কবিতর্ক, ব্যস তারপর কিচ্ছু না। সেই স্ত্রীর পত্রের মৃণালের মত, মা হবার যন্ত্রণাটুকু পেলাম, কিন্তু মা হবার মুক্তিটুকু পেলাম না!
এরই মধ্যে কোন একসময়ে দাদারা স্কুলে যযাতি নাটকটা করে ফেলল। আক্ষরিক অর্থেই সে এক হইরই কাণ্ড। দাদা যযাতি, আর একটি ছেলে পুরু।যখন যযাতি পুরুকে জরা দান করবে, তখন লাইট নিবিয়ে দেবার কথা, সেই অন্ধকারে যযাতি নিজের মুখে আঠা দিয়ে লাগানো দাড়ি গোঁফ খুলে পুরুর গালে লাগিয়ে দেবে। কিন্তু বালকদের অভিনয়প্রতিভায় মুগ্ধ লাইটম্যান আলো নেভাতেই ভুলে গেল। ফলে দর্শকরা গোল্লা গোল্লা চোখ করে দেখল যযাতি তার দাড়ি খুলে পুরুর গালে লাগিয়ে দিচ্ছে! এই আবেগমথিত দৃশ্যে, যেখানে চোখে জল আসার কথা, সবাই হেসে গড়াগড়ি খেল। কিচ্ছু বলার নেই!