সে এক আশ্চর্য সময়। যখন আমি মায়া মফস্বলের প্রায় পোয়েট লরিয়েট। আর তাই যে কোন ইস্যুতে কবিতা লেখা আমার একটা পবিত্র কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। তারাপদ রায়ের প্রথম কবিতা নাকি তাঁদের সিলিং ফ্যান নিয়ে। আমি যে কত বিষয়ে প্রাণের মায়া না করে অকাতরে কবিতা লিখে গেছি! প্রথম মেট্রো রেল চড়া, স্কুলে নাটক করতে না দেওয়া, তো আছেই, তাছাড়া কেউ মারা গেলে অগ্রদানী বামুনের মতো আমার ডাক পড়ত কবিতা লেখার জন্যে! এ বিষয়ে আমার ভূমিকা অনেকটা হিকিস গেজেট বা গ্রামবার্তা প্রবেশিকার মতো। সেই পুরনো ডায়েরিগুলো পাওয়া গেলে মফস্বলের জন্ম মৃত্যু, কেচ্ছা কাহিনি অর্থাৎ একটা সময়ের হৃৎস্পন্দন ধরা যাবে। এমনকি আমার কবিখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে একবার শাসনের এক কবি সম্মেলনে ডাক এলে, আমি প্রায় রাজ্যপাল-প্রতিম অভিমানে যাই তো নি, উলটে একটা কবিতা লিখেছিলাম, তার একটু একটু মনে আছে।
‘আমাকে ডেকেছে ওরা শাসনের কবি সম্মেলনে
শুনেছি সেখানে চলে তাকে নিয়ে নগ্ন টানাটানি
কুৎসিত কোলাহল, ভ্রূণ খোঁটে সমালোচকেরা
আমি তাই জেনে বুঝে আগে থাকতেই সাবধানী
কীভাবে কেমন করে ওরা সব জানতে পেরে গেছে
আমার বুকে ফুটছে শব্দের সংখ্যাতীত খই
ওরা তা ছড়াতে চায় উত্তাপ যাবার আগেই
ইচ্ছে ছিল সংগোপন আরও কিছুক্ষণ ধরে বই
এই অভিমানী কবিতাটি শেষ হচ্ছে এই বলে-
‘……
আমি একাই যাব শাসনের কবি সম্মেলনে
ওদের তো একজন কবিকেই শুধু দরকার!’
সম্ভবত ক্লাস এইট তখন।শেষ পর্যন্ত সেই কবিসম্মেলনে আমিও যাইনি, আমার কবিতাও না। কিন্তু খামের ওপর নিজের নাম লেখা দেখে বড্ড ভালো লেগেছিল, এটা স্বীকার না করলে সত্যের অপলাপ করা হবে। তবে এই অতি তীব্র কবিতাটি কিন্তু বরাবর আমার দিকনির্দেশক হয়েই থাকল। একা একা সংগোপন আমি বহু বছর পর্যন্ত বয়েছি। এবং গভীর নির্জন সেই পথে হাঁটাই মেড অল দা ডিফারেন্স!
সুতরাং আমি যে যাত্রা নিয়ে কবিতা লিখব তাতে আর আশ্চর্যের কী?
কাঁচা হাতের ছড়া বলে একে বিদ্রূপ করবেন না, হে পাঠক। এর মধ্যে যে শুধু আঞ্চলিক ইতিহাস ধরা আছে তাই নয়, আলোর নিচে ধরলে যেমন অদৃশ্য কালির লেখা ফুটে ওঠে, তেমনি এর মধ্যে লুকোন রয়েছে চার-চারটি আলোড়ন সৃষ্টিকারী যাত্রাপালার নাম- যথাক্রমে ঝাঁসির রানি, মৌচাক, নিশিপুরের বউ এবং ধর্মসিংহাসন। প্রথম দুটো কোন দলের মনে নেই, শেষ দুটো তর্কাতীত ভাবে নট্ট কোম্পানির।এটা আশির দশকের মাঝামাঝি হবে। উত্তমকুমার মারা যাবার পরে সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি ধুঁকছে, পেটের টানে সিনে স্টাররা যাত্রায় আসতে শুরু করেছেন( আর কিছুদিন বেঁচে থাকলে উত্তমকুমারও যাত্রায় নামতেন নাকি!)। নট্ট কোম্পানির এই দুটি পালায় সেই ট্রেন্ড সেটার ছিলেন বসন্ত চৌধুরী। তাঁর নামে বিজ্ঞাপন প্রচুর হয়েছিল, আর রিকশা করে সারা শহর জুড়ে সেই কাঁপানো গলায় ঘোষণা- আসিতেছে আসিতেছে আসিতেছে। নট্ট কোম্পানির অশ্রুসজল সামাজিক পালা নিশিপুরের বউ এবং ধর্মমূলক পালা ধর্ম সিংহাসন! প্রধান আকর্ষণ চলচ্চিত্রের প্রখ্যাত সুদর্শন নায়ক বসন্ত চৌধুরী। যারা সেই টানে যাত্রা দেখতে ছুটেছিল, তারা বেশ হতাশ হয়ে ফিরেছিল। ‘দূর মাকাল ফল একটা। কী বলে পেছন থেকে শোনাই যায় না। ওরকম মিনমিনে গলায় যাত্রা হয়!’
‘আরে এরা এসেছে টাকা কামাতে। যাত্রা করা অত সোজা নয় হুহু বাবা’
যাত্রা করা যে অত সোজা নয়, সে অবিশ্যি আগে থেকেই জানতাম। আমার ঠাকুরদা, বরদাপ্রসাদ ভট্টাচার্য, গান্ধীর ডাকে সাড়া দিয়ে যিনি মার্টিন বার্নের চিফ অ্যাকাউন্টেন্টের চাকরি খুইয়ে ছিলেন, ছিলেন একজন অসাধারণ নট। যাকে বলে গায়ক-নায়ক। যাত্রায় এবং আদি যুগের সিনেমায় গান জানাটা একটা আবশ্যিক গুণ ছিল। মাঝে মাঝে তাঁর সঙ্গে আমার সেজকাকু, চিকেন পক্সে যার ডান হাত, ডান পা আবং ডান চোখ চলে যায়, সেও মঞ্চে অন্ধ বালকের রোলে নামত। পিতাপুত্রের গান শুনে আর অভিনয় দেখে চোখের জল সামলানো যেত না। তবে এসবই যাকে বলে অ্যামেচার পালা, দাদু আমার জন্মের বছর আটেক আগে মারা যান, সুতরাং তাঁর ব্যাপারে সবটাই আমার বাবা-কাকার মুখে শোনা। কিন্তু একজন পুরোপুরি পেশাদার এবং বড়মাপের যাত্রাশিল্পীকে খুব কাছ থেকে দেখেছি। তিনি আমার মায়ের ছোটকাকা, অমর ভট্টাচার্য। তাঁকে সম্ভবত প্রথম দেখি মামারবাড়ির উঠোনে একটি তক্তপোশে বসে দিদার হাতে বানানো চা জলখাবার খেতে। মিশকালো রঙ, লম্বা ছ ফুটের ওপর, চওড়াও সেই অনুপাতে, তবে স্থূল নন। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য তাঁর গলা। যাকে বলে বাজখাঁই। সেই গলায় তিনি হঠাত আমাকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলেন ‘তোমার দিদার মতো মহিয়সী মহিলা আমি আর একটাও দেখিনি’। এই বাক্যটি আজীবন আমার সঙ্গে রয়ে যাবে মনে হয়। দিদার সম্পর্কে এর থেকে উপযুক্ত কথা আর তো খুঁজে পাইনি।
সেইসময় শুনে থাকব ছোটদাদু যাত্রা করেন। প্রচুর সিনেমা দেখলেও যাত্রাজগতের খবরও আমি রাখতাম। কারণ দুপুরে অংক ও ব্যকরণ করার সময় খোলা থাকত রেডিও, তাতে ডিলিউজ মনের মতো গান, মনে রাখা কথা, শনিবারের বারবেলা জ্যাবরান্ডি ইত্যাদি বিজ্ঞাপনদাতাদের ছায়াছবির গান, নাটক ইত্যাদি শেষ হয়ে যেত, কিন্তু আমার অংক যে তখনো বাকি। তাই রেডিও খোলাই থাকত, তখন তাতে শুরু হত যাত্রাপালার অনুষ্ঠান। সেসব শুনতে শুনতে আমি শক্ত শক্ত আঁক কষে ফেলতাম। তাই ছোটদাদু যাত্রা করেন শুনে কৌতূহল হয়েছিল, তার নিরসন হল যখন ওঁদের পালা পড়ল আমাদের শহরে। আমাদের বাড়ির লাগয়া রাসমাঠে। তখনি জানতে পারলাম দাদু অভিনয় করেন শান্তিগোপালের অপেরায়। মেকআপে বসার আগে দাদু এবং আরও একজন মেজর অভিনেত্রী এলেন আমাদের বাড়িতে, গোধূলির আলো পড়া বারান্দায় তাঁদের সেই কথাগুলো মহাবিশ্বে আজো ঘুরে বেড়াচ্ছে মনে হয়। আজো অর্জিত হয়নি খেটে খাওয়া মানুষের অধিকার। তাঁরা তাঁদের ক্ষোভ, দুঃখ উগরে দিচ্ছিলেন প্রবাদপ্রতিম নট শান্তিগোপালের বিরুদ্ধে।সহশিল্পীকে অসম্মান, কম টাকা দেওয়া। তাঁরা চলে গেলেন। একটু পর আমি মার সঙ্গে গেলাম সেই পালা দুটো দেখতে। একটি আট ঘণ্টার লড়াই, আরেকটি স্ট্যালিন। পরপর দুরাত হয়েছিল। আটঘন্টার লড়াই দেখে সবাই বেরিয়ে বলাবলি করছিল, ‘আট ঘণ্টার লড়াই তিনঘণ্টায় শেষ করে দিল!কী হারামি বল দিনি’ স্ট্যালিন পালায় আমার দাদু ছিলেন রাশিয়ার জারের ভূমিকায়। কী অভিনয়, কী স্বরক্ষেপ! সেই পালায় শান্তিগোপাল যথারীতি অসাধারণ অভিনয় করেছিলেন নামভূমিকায়। যে লোকটি সাম্যবাদের পালা করছেন, তিনি তাঁর সহশিল্পীদের সঙ্গে কেন এত বৈষম্যমূলক আচরণ করছেন, বিশ্বাস করুন, তাঁর অভিনয় দেখতে দেখতে সেসব মনেই পড়েনি। একেই বলে প্রতিভা। কিন্তু আমার এবং অনেকের কাছেই, এই রাতের নায়ক ছিলেন খলনায়ক রাশিয়ান জার, অর্থাৎ আমার ছোটদাদু অমর ভট্টাচার্য। তাঁর অন্য অভিনয় দেখিনি, তাই বলতে পারব না এটাই তাঁর সেরা অভিনয় কিনা। কিন্তু সেদিন তাঁবু থেকে বেরিয়ে মায়ের হাত ধরে ভিড়ের মধ্যে ঘোরলাগা শরীরে হাঁটতে হাঁটতে একটা জিনিস উপলব্ধি করেছিলাম- তুমি যদি মঞ্চের মতো, জীবনেও হিরোর রোল না পাও, সাইড অ্যাক্টরের রোলই পাও, তাও নিজের একশ শতাংশ উজাড় করে দিও। শেষ পর্যন্ত পারফরমেন্সটাই ম্যাটার করে, অন্য কিছু নয়।