ছোটোগল্পে প্রভাত মণ্ডল
ঘূণ ধরা স্বপ্ন
চারদিক তখনও সুনসান , গ্ৰীষ্মের প্রখর তেজ সবকিছুকে পুড়িয়ে ছাই করে দিতে চায় , তারই মাঝে একটু প্রশান্তি নামে চোখে ভোরের বেলা । দাবদাহের প্রখর তেজ স্তিমিত হয়ে আসে সে সময় । তবু উঠে পড়তে হয় ঘুম ছেড়ে । বয়স চৌদ্দ- পনেরোর কোঠায় , না তার থেকে কম , না বেশি । ও মৃন্ময় । এ বয়সে ওর অন্য বন্ধু-বান্ধবের কেন নিজের দাদারই ঘুম ভাঙে না বেলা আটটার আগে ।
ভোরবেলা উঠে প্রাতকার্য সেরে বেরিয়ে পড়ে বাবার সাথে মাঠের উদ্দেশ্যে , পিতার হাতের কাজে সামাল দেবার জন্য । কি করবে ! ওর বাবার কষ্টটা যে ওর বুকে বড়ো বাজে !
ওর বাবা সুধা বাবু , শরীরটাও ভালো যায় না প্রায়ই , সংসারে অভাব , তার উপর এক মেয়ে আর স্ত্রী সহ পরিবারের পাঁচ সদস্যের খাওয়া পরার সাথে তিন ছেলে-মেয়ের পড়াশুনার ভারে সুধাবাবুর মেজাজটা সব সময়ই খাট্টা হয়ে থাকে । হবেই বইকি , সংসারের ভার যার উপরে , সেই বোঝে কতটা কষ্ট তা চালানো ।
মাঠে ওর বাবার সাথে কাজে হাত লাগানোর সময় দেখেছে ও , এই কঠোর মানুষটার মধ্যে কত চিন্তা আর অভিভাবকত্ত্বের ভার , আবার কঠোর মানুষটার মধ্যে চোরা স্রোতে বয়ে চলা এক নিপুণ ভালোবাসার অফুরন্ত ভান্ডার । ওর বাবা বেসুরো ভাঙা গলায় হঠাৎ বলে উঠলো —
” বাইরি কাজে যাবি বাবা ! “
মৃন্ময় কিছু সময় চুপ করে থেকে বলে ওঠে —-
” কি কাজ বাবা ? “
উত্তর এলো
” শহরে ; ভালো কাজ , দোকানের কাজ । দোকানের কাজকর্ম দেখাশুনা করবি , মালিকির কথা শুনবি , ওরা থাকা দেবে , খাওয়া দেবে তিন বেলা , মাসে মাসে টাকা দেবে । যাবি নাকি বাবা ?”
মৃন্ময় তেমনি চুপ করে , কতো কি ভাবে আকাশ-পাতাল
” আমি আর স্কুলে যেতে পারবো না , পড়তে পারবো না দাদার মতো । মা-বাবার কাছে আর থাকতি পারবো না “—এমনি কত কথা ।
সুধাবাবু আবার বলে —–
” আমার শরীরীর অবস্থা এই , খাঁটতি পারি নে রে বাবা , নিজির চোখি সব দেকছিস , তোর বোনডাও বড়ো হচ্ছে , ওর বিয়ে দিতি হবে , অনেক খরচ । আর তোর দাদা , জানিস তো কোনো কতা শোনে না ।”
মুহূর্তে বছর চৌদ্দ-পনেরোর ছেলেটার মথায় চেপে ওঠে দায়িত্ববোধ । পিতার শারীরিক চিন্তা থেকে শুরু করে বোনের বিবাহের দায়ভার যেন মাথায় গেঁথে যায় । এমনিতেই বরাবরের জন্য ও বড়ো চুপচাপ শান্ত স্বভাবের । আজ সে শান্ত স্বভাবে যেন চিন্তার কোলাহল খেলা করে । শান্ত নদীটাতে বর্ষার পরিপুষ্টতায় প্রবল স্রোত এলেও তার শব্দ যেমন হয় না বললেই চলে , এখানেও তেমনি ।
মৃন্ময় মাঠের কাজ সেরে বাড়ি ফিরে এসে দেখে দাদা বই পড়ছে । হঠাৎ করে একটা বিষন্নতা ওর মনে ছেয়ে যায় , তবে কোনো হিংসাবোধ থেকে নয় , একটা চরম আক্ষেপ থেকে , মনে মনে বলে ওঠে —-
” কখন পড়ব ! ভোরে উঠে মাঠে যাবো নাকি বই পড়ব ! আমারও তো ইচ্ছে হয় বই পড়ি !”
এদিকে পড়াশুনায় স্কুলে পিছিয়ে বলে চিন্ময় প্রায়শই ভাইকে ছোটো-বড়ো কথা শোনায় । আর আজ মাঠ থেকে বাড়ি ফিরতেই চিন্ময় মা’এর সামনেই ভাইকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলো —-
” গবেট , মূর্খ কোথাকার , গেঁয়ো স্বভাব কি যায় ? চেহারার যেমন ছিরি , সাজ পোশাকও তেমনি , সাথে করে কোথাও নিয়ে যেতে যেমন লজ্জা হয় , তেমনি পরিচয় দিতেও ।” —কোনো প্রতিবাদ করে না মা ।
মুহূর্তে ছুটে চলে যায় মৃন্ময় , বাড়ির পাশের বাগানটাতে , চোখ দিয়ে অনবরত জল গড়িয়ে পড়ে ।
বড়ো ব্যথা ওর বুকে । পৃথিবীর সমস্ত প্রাণীকুলের অদৃশ্যে ওর চোখের জলের জোয়ার বয়ে যায় , মরা গাঙে বান আসলে ওর থেকে অনেক বেশি জল হয়তো গড়ায় কিন্ত কষ্টটা অমন করে বাজে না। কেউ দেখতেও পায় না ওর ব্যথা। ও কাকে যেন উদ্দেশ্য করে আপন মনে বলে ওঠে —-
” আমি কি কেউ না এ বাড়ির ! শুধু কি একটা কাজের লোক ! আমি সত্যি এ বাড়ির কেউ তো ! নাকি এরা আমাকে কুড়িয়ে পেয়েছিলো ! যদি সত্যিই এদের কেউ হতাম , মা তো কিছু প্রতিবাদ করতো ! “
মাথায় দায়িত্ববোধ আর বুকে কষ্টের বোঝা যেন ওকে দেশত্যাগি করতে চায় । সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে শহরে যাবে ।
সেই শহর যেখানে আলো ঝলমলে রাত , স্বপ্নের ফেরিওয়ালা । সেই শহর যেখানে শত মৃন্ময়ের ব্যথার প্রলেপ । কেউ কারো খোঁজ নেয় না , কেউ কাউকে ব্যথা দেয় না , আর দিলেও সে ব্যথা বড়ো বেশি বুকে বাজে না , কারণ ব্যথা তো তখনই বুকে বাজে যখন তার দাতা বড়ো কাছের আর আপন হয় ।
সংসারের মায়ার বাঁধন ছিন্ন করে , মা’এর ভালোবাসার বাঁধন ত্যাগ করে , পিতার কষ্ট লাঘব করতে , স্কুলের চেনা সেই ঘর চেনা সব মুখ আর পড়তে ইচ্ছা জাগা বইগুলোকে দূরে সরিয়ে দিয়ে এক বুক কষ্ট আর অভিমানে ঘর ছাড়ে মৃন্ময় ।
প্রকৃতির রাজ্যে ও একা , ওর ব্যথা বোঝবার মতো কেউ নেই । সংসারের অশান্তি , অভাব-অনটন আর পিতৃ প্রদত্ত দায়ভার কাঁধে নিতে গিয়ে এমন ভাবেই ঝরে পড়ে মৃন্ময়রূপী শত সন্তান । নিমেষে শেষ হয়ে যায় সব স্বপ্ন । ময়াবী নীল আকাশটা ছেয়ে যায় কালো মেঘে । পাকা বাঁশে ঘূণ ধরে । মৃন্ময় হারিয়ে যায় শহরের কোলাহলে , ইমারতের ভীড়ে , গঙ্গার চোরাস্রোতে । ওর চেনা জন্মলগ্নের প্রাণবন্ধু , ওর কাঁদবার সঙ্গী সেই অরণ্য প্রকৃতিও আজ শ্মশান , অট্টালিকার ভীড়ে ।