“রথযাত্রা Special” গল্পকথায় মৃদুল শ্রীমানী

উড়িয়ে ধ্বজা অভ্রভেদী রথে

আজ রথযাত্রা। রথযাত্রার আবহ বুকে নিয়ে, তাকে গভীরতর প্রেরণায় দেখতে চেয়ে মানব মুক্তির প্রেক্ষাপটে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর কবিতায় নাটকে কি অমূল্য সম্পদ দিয়ে গিয়েছেন, দিশা নির্দেশ করেছেন, আমি এখানে সেকথাই বলব।
পুনশ্চ কাব‍্যের প্রথম পূজা কবিতাটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অনেক প্রবীণ বয়সে লিখেছেন। তারিখটা ছিল ২৮ শ্রাবণ, ১৩৩৯ বঙ্গাব্দ। ইংরেজি ক‍্যালেণ্ডারে ১৯৩২ সাল। জগন্নাথের মূর্তিটি যিনি অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে লক্ষ্য করবেন, তিনিই উপলব্ধি করতে পারবেন যে, ওই মূর্তি কখনোই পঞ্চোপাসক হিন্দুদের পৌরাণিক ঐতিহ্যবাহী নয়। ওর মধ্যে অরণ‍্যচারী অষ্ট্রিক নিষাদ গোষ্ঠীর রূপকল্প অতি স্পষ্ট। বৃদ্ধ কিরাত দলপতি মাধব ত্রিলোকেশ্বরের মূর্তি গড়বেন এ কথা দৈবাদেশে রাজা জানতে পারেন। কিন্তু রাজ‌ অহমিকায় তিনি স্থির করেন কিরাতের পাপচক্ষে তিনি দেবমূর্তি দেখতে দেবেন না। বৃদ্ধ কিরাত নেতা মাধব অন্তরে প্রকৃত শিল্পী। সে ভাল করেই জানে চর্মচক্ষে শিল্পসৃষ্টি সীমিত নয়, তার গঠন মনোলোকে। চেতনার গভীরে। তাই শিল্পী মাধব চোখে আবরণ বেঁধে মূর্তি গড়তে রাজি হয়ে যায়। বুকে তার গভীর প্রত‍্যয়, তার শিল্পিসত্তা তাকে দিয়ে অসামান্য দেবমূর্তি গড়িয়ে নেবে। তারপর কি হল সহজেই অনুমেয়। চিরকাল সত‍্যদ্রষ্টারা মরতে ভয় পান নি। তাঁরা যে অমৃতের পুত্র। আত্মবিসর্জনের পথে তাঁরা আত্মাকে অক্ষয় বলে চিনিয়েছেন। মাধব দেবমূর্তি তৈরি করে ভয়শূন‍্য হৃদয়ে নিজের চোখের বাঁধন খুলে নিজের সৃষ্টি কে সসম্ভ্রমে সপ্রেমে দেখতে থাকে। রাজার রক্তলোলুপ তরবারি বিনা প্রশ্নে মাধবের মুণ্ডু খসিয়ে দেয়। ধর্ম জিনিসটা রাজশক্তি যে কুক্ষিগত করতে চেয়েছে আর প্রজার ধর্মবোধকে নিজের প্রয়োজনের ছাঁচে ঢেলে নিতে চেয়েছে এটা ইতিহাস জিজ্ঞাসুর অজানা নয়। পূজারিণী কবিতাতেও এ রকম বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আলোকপাত করেছেন। বস্তুতঃ, সারা জীবন ধরেই যেন তিনি দুর্বলের সম্মান অর্জনের লড়াইয়ে পাশে পাশে থাকেন। বলেন, যেথায় থাকে সবার অধম দীনের হতে দীন/ সেইখানে যে চরণ তোমার রাজে… তাঁর লেখায় রথের রশিতে দলিত ও বঞ্চিত মানুষ হাত ছুঁইয়ে পবিত্র না করে দিলে রথের চাকা নড়ে না। আজ রথযাত্রার দিনে শূদ্র জাগরণের প্রতি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আস্থা ও প্রত‍্যয়কে নিয়ে দু কথা বলার এই আয়োজন।
১৯১০ সালে  গীতাঞ্জলির কবিতাগুলি লিখতে লিখতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মনটা এক মহামরণ পারের অনুভূতিতে দ্রব হয়েছিল। এর আগে পরে লিখেছেন গীতালি ( প্রকাশ ১৯১৪), গীতিমাল‍্য ( প্রকাশ ১৯১৪), নৈবেদ্য, খেয়া (প্রকাশ ১৯০৬) , কতো কবিতা। নিজের লেখা কবিতার বাছাই করা কয়েকটির ইংরেজি অনুবাদ তিনি করেছিলেন নিজেই। এভাবেই রবীন্দ্রনাথ “Song Offerings” সৃষ্টি করেন । গীতাঞ্জলি, গীতিমাল‍্য, নৈবেদ্য, খেয়া, অচলায়তন, শিশু, স্মরণ, কল্পনা, চৈতালি, উৎসর্গ, এই দশটি কাব‍্য থেকে পছন্দ করে করে কবিতা খুঁজে নিয়ে । এই দশটি কাব‍্যগ্রন্থ থেকে পছন্দসই কবিতাগুলি বাছাই করে ইংরেজি ভাষায় অনুবাদ করে রবীন্দ্রনাথ খুব তৃপ্তি পেলেন। সে অনুবাদ কাব‍্যশ্রেণীতে উত্তীর্ণ হল। সে কথাটি নিজেই বেশ উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। তারপর সে জিনিস নিয়ে পুত্র রথীন্দ্রনাথ ও পুত্রবধূ প্রতিমা দেবীকে নিয়ে পাড়ি দিলেন লণ্ডনে। রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মনের ভুলে মেট্রো রেলওয়ের কামরায় হারিয়ে গেল সেই মণি মাণিক‍্য। মেট্রো কর্তৃপক্ষের অপার তৎপরতায় অচিরেই সে জিনিস ফিরে এসে ছিল কবির কাছে।
ইংরেজি ভাষার বিশিষ্ট  কবি উইলিয়াম বাটলার ইয়েটস এর উদ‍্যোগে লণ্ডনে সাহিত্যপ্রেমীদের এক সমাবেশে সেই ভাষান্তরিত কবিতাগুলি পাঠ করলেন। সে এই রকম জুন মাসের দিকেই।  ইংরেজি অনুবাদের সঙ্কলনের একটি মুখবন্ধ লিখে দেন  আইরিশ কবি ইয়েটস ( ১৮৬৫ – ১৯৩৯) । ইয়েটস এর জন্মদিন এই জুন মাসের ১৩ তারিখে, আর এই  রকম কোনো সময়েই লণ্ডনে রবীন্দ্রনাথ এই অনূদিত কবিতাগুলি পড়ে শুনিয়েছিলেন। সে কথা মনে করেই আজো পৃথিবীর কোণে কোণে রবীন্দ্রপিপাসুরা কবিতা পাঠ করেন।  গভীর আগ্রহে আন্তর্জাতিক রবীন্দ্রকাব‍্যপাঠ দিবস পালিত হয় প্রতি বৎসর ত্রিশে জুন তারিখে।
খেয়া কাব‍্যগ্রন্থে কৃপণ নামে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি বিখ্যাত কবিতায় আমরা দেখতে পাই এক ভিক্ষুক ভিক্ষা করতে বেরিয়ে রাজার রথ দেখে অসামান্য পার্থিব সম্পদ পাবে ভেবেছিল। কিন্তু  রথে আসীন রাজার কাছে গিয়ে ভিক্ষা চাইতে গেলে, তার আশায় জল ঢেলে স্বয়ং রাজা তার কাছে ভিক্ষা চেয়ে হাত বাড়ালেন। শেষমেশ ভিক্ষুকটির  কী প্রাপ্তি হল, তা বহু পঠিত, বহুশ্রুত।  আজ রথযাত্রার প্রাক্কালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিন্তা আমায় প্রবলভাবে নাড়া দিচ্ছে।
জনগণমনঅধিনায়ক গানটি স্বাধীন ভারতের জাতীয় গাথা। এই মহৎ উদ্দীপক গানটির পূর্ণাঙ্গ রূপটিতে  রথযাত্রার অনুষঙ্গ লক্ষ্যণীয়।
পতন-অভ্যুদয়-বন্ধুর পন্থা, যুগ যুগ ধাবিত যাত্রী।
হে চিরসারথি, তব রথচক্রে মুখরিত পথ দিনরাত্রি।
দারুণ বিপ্লব-মাঝে তব শঙ্খধ্বনি বাজে
সঙ্কটদুঃখত্রাতা।
জনগণপথপরিচায়ক জয় হে ভারতভাগ্যবিধাতা!
জয় হে, জয় হে, জয় হে, জয় জয় জয় জয় হে॥
ঘোরতিমিরঘন নিবিড় নিশীথে পীড়িত মূর্ছিত দেশে
জাগ্রত ছিল তব অবিচল মঙ্গল নতনয়নে অনিমেষে।
দুঃস্বপ্নে আতঙ্কে রক্ষা করিলে অঙ্কে
স্নেহময়ী তুমি মাতা।
জনগণদুঃখত্রায়ক জয় হে ভারতভাগ্যবিধাতা!
জয় হে, জয় হে, জয় হে, জয় জয় জয় জয় হে॥
রাত্রি প্রভাতিল, উদিল রবিচ্ছবি পূর্ব-উদয়গিরিভালে –
গাহে বিহঙ্গম, পুণ্য সমীরণ নবজীবনরস ঢালে।
তব করুণারুণরাগে নিদ্রিত ভারত জাগে
তব চরণে নত মাথা।
বাংলা ভাষার যে কোনো পরিশ্রমী পাঠক সামান্য চেষ্টা করলেই এই অনুপম শব্দঝঙ্কারে পাঁজরে দ্রিমি দ্রিমি শুনতে পাবেন।
১৯১১ সালের ২৭ ডিসেম্বর কলকাতায় আয়োজিত ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের ২৬তম অধিবেশনে  প্রথম গীত হয়। ১৯১২ সালের জানুয়ারি মাসের (মাঘ, ১৩১৮) তত্ত্ববোধিনী পত্রিকায় ব্রহ্মসংগীত আখ্যায় গানটি প্রকাশিত হয়। ১৯৪৩ সালের ৫ জুলাই গানটি আজাদ হিন্দ ফৌজের জাতীয় সংগীত রূপে গৃহীত হয়। ১৯৫০ সালের ২৪ জানুয়ারি গানটি সদ্যস্বাধীন ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের জাতীয় সংগীত রূপে গৃহীত হয়।
গানটি ইমন রাগে কাহারবা তালে নিবদ্ধ। স্বরলিপিকার দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর। স্বরলিপি মুদ্রিত রয়েছে স্বরবিতান ১৬-এ।
১৯৩৭ সালে কলকাতায় নিখিল ভারত কংগ্রেস কমিটির সভায় ভারতবর্ষের জাতীয় সঙ্গীত কি হতে পারে, তা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। সেই বিতর্কে বহু চিন্তাবিদ মত প্রকাশ করেন। এমনই এক বিশিষ্ট ভদ্রলোকের নাম জেমস কাজিনস। তিনি একজন আইরিশ নাট্যকার, শিক্ষাবিদ এবং সাংবাদিক। ১৯১৪ সালে অ্যানি বেসান্তের ‘নিউ ইন্ডিয়া’ পত্রিকার সাহিত্য বিভাগের সম্পাদনার কাজ নিয়ে ডাবলিন শহর থেকে ভারতবর্ষে চলে আসেন। এর আগে প্যারিসে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কণ্ঠে গীতাঞ্জলির কবিতা শুনে তাঁর অনুরাগী হয়ে যান। পরে ১৯১৬ সালের ১৫ জানুয়ারি জোড়াসাঁকোয় রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা করেন। পরবর্তী কালে কাজিনসের সঙ্গে কবির সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী হয় ‘নিউ ইণ্ডিয়া’ পত্রিকার সৌজন্যে। কবির অনুরাগী এই আইরিশ সাহিত্যসেবী ১৯৩৭ সালের ৩ নভেম্বর ‘ম্যাড্রাস মেল’ পত্রিকার পাতায়  লেখেন: ‘একটা সম্পূর্ণ জাতির আশা আকাঙ্ক্ষা ও উচ্চতম কল্যাণের প্রতীক এই গান সমস্ত দেশে সুপরিচিত। এর সুর ও ছন্দ এমনই, নিশ্চিত উৎসাহের সঙ্গে সমবেত কন্ঠে এই গান গাওয়া চলে।…ভারতবর্ষে মানবজীবনের যে বৈচিত্র্য, তা এই জনগণ গানে যেমন ফুটেছে, তেমনি তার অন্তঃশায়ী সত্য ঐক্যের সন্ধান দিয়েছে। বহিরঙ্গের অসম্ভব মিলনের কথা বলেনি, উচ্চারণ করেছে তার সত্যিকারের আত্মিক মিলনের বাণী, যা ফুটে উঠেছে বৈশ্বিক জীবনের সঙ্গে মিলনের প্রতি তাঁর সার্বিক আকাঙ্ক্ষার মধ্যে দিয়ে, যে জীবনে আমাদের সকলেরই অংশ আছে…এই গানে যে প্রার্থনা ধ্বনিত হয়েছে, তাতে যে কোনও ধর্মে বিশ্বাসী মানুষ নির্দ্বিধায় যোগ দিতে পারেন।…’
১৯১১ সাল, সেবার কবি কনিষ্ঠা কন্যা মীরা দেবীর অসুস্থতার জন্য শান্তিনিকেতনে ৭ পৌষের অনুষ্ঠানে অনুপস্থিত ছিলেন। কলকাতায় জাঁকিয়ে শীত পড়েছে। রবীন্দ্রনাথ শহরে। সেবারই ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহের ২৬ থেকে ২৮ তারিখে কংগ্রেসের ২৬ তম অধিবেশন বসেছিল এই কলকাতায়। অধিবেশনের দ্বিতীয় দিন, সেদিনটি ছিল বুধবার, দুপুর বারোটা, অধিবেশন শুরু হল সরলাদেবী চৌধুরী, অমলা দাশ, দিনেন্দ্রনাথ, অমল হোম প্রমুখের সমবেত কণ্ঠে ‘জন-গণ-মন-অধিনায়ক’ গানটি দিয়ে।
ঘটনাচক্রে, এই সময়েই সপ্তম এডওয়ার্ডের মৃত্যুর জন্য রাজার আসনটি শূন্য হয়। ১৯১১-র ২২ জুন ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবেতে গ্রেট ব্রিটেনের সিংহাসনে সম্রাট পঞ্চম জর্জের অভিষেক হল। তিনি অভিষিক্ত হয়েই ডিসেম্বরে সস্ত্রীক ভারত সফরে এলেন। ভারতের রাজধানী সেবারই দিল্লিতে স্থানান্তরিত হয়েছিল। দিল্লিতে সেই রাজকীয় আসরে পঞ্চম জর্জ ভারতের জনসাধারণের জন্য কিছু রাজকীয় সাহায্য ও সুবিধা দানের কথা ঘোষণা করেন। তাঁর ঘোষণাগুলির মধ্যে ১৯০৫ সালে আনা বঙ্গভঙ্গের আদেশটিকে সরকারি ভাবে রদ ঘোষণা করা হয়েছিল।
এ দিকে কংগ্রেস অধিবেশনের দ্বিতীয় দিন, অর্থাৎ ২৭ ডিসেম্বর  উদ্বোধনী সঙ্গীতটি পরিবেশনের পর কংগ্রেস নেতারা পঞ্চম জর্জ ও তাঁর স্ত্রীকে সৌজন্যবশত স্বাগত জানান, এবং বঙ্গভঙ্গ রদ ঘোষণার কারণে তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতাজ্ঞাপন করেন। এই সৌজন্য এবং কৃতজ্ঞতাজ্ঞাপনের পর দিন ‘দ্য ইংলিশম্যান’ এবং ‘দ্য স্টেটসম্যান’ পত্রিকায় এই সংবাদকে একটু ঘুরিয়ে ছেপে বিভ্রান্তির জন্ম দেওয়া হয়।। প্রতিবেদন পড়ে সাধারণ অগভীর ও পরিশ্রম বিমুখ পাঠকের মনে হয়েছিল, সম্রাটকে স্বাগত জানিয়ে রবীন্দ্রনাথ ওই গান রচনা করেছেন।  বিরোধীদের উদ্দেশে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন
“সে বৎসর ভারতসম্রাটের আগমনের আয়োজন চলছিল। রাজসরকারে প্রতিষ্ঠাবান আমার কোনও বন্ধু সম্রাটের জয়গান রচনার জন্যে আমাকে বিশেষ করে অনুরোধ জানিয়েছিলেন।”
লিখেছেন “শুনে বিস্মিত হয়েছিলুম, সেই বিস্ময়ের সঙ্গে মনে উত্তাপেরও  সঞ্চার হয়েছিল।”
সেই তাপের প্রতিক্রিয়ায় কবি আরো বলেছিলেন: ‘‘তারই প্রবল প্রতিক্রিয়ার ধাক্কায় আমি জনগণমন অধিনায়ক গানে সেই ভারতভাগ্যবিধাতার জয় ঘোষণা করেছি, পতন অভ্যুদয় বন্ধুর পন্থায় যুগ যুগ ধাবিত যাত্রীদের যিনি চিরসারথি, যিনি জনগণের অন্তর্যামী পথপরিচায়ক, সেই যুগযুগান্তরের মানবভাগ্যরথচালক যে পঞ্চম বা ষষ্ঠ কোনো জর্জই কোনক্রমেই হতে পারেন না সে কথা রাজভক্ত বন্ধুও অনুভব করেছিলেন।” এর পরেই সেই রাজভক্ত বন্ধুর প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘‘তাঁর ভক্তি প্রবল থাকলেও বুদ্ধির অভাব কিন্তু ছিল না।’’
১৮৮৫ সালে প্রতিষ্ঠা হয়েছিল কংগ্রেস। উদ‍্যোক্তা ছিলেন স্কট সিভিলিয়ান অ্যালান অক্টাভিয়ান হিউম। প্রথম সভাপতি ছিলেন উমেশচন্দ্র বনার্জি। কংগ্রেসকে গরিব মুক্তিকামী ভারতের প্রকৃত রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও  মুখপাত্র হয়ে উঠতে গেলে সমস‍্যা ও বাধা কোথায় কোথায় সে নিয়ে তেইশ চব্বিশ বৎসরের যুবক কবির একটা ধারণা ছিল। “আমায় বোলো না গাহিতে বোলো না” গানটির গভীরে যিনি মাথা গলাতে চাইবেন তিনি কবির সেই আর্তিটি ধরতে পারবেন।
১৯০০ সালে প্রকাশ হয়েছিল কথা  নামে কাব‍্যগ্রন্থটি। বলেছিলেন, হে অতীত তুমি ভুবনে ভুবনে কাজ করে যাও গোপনে গোপনে….. ইতিহাসকে বৈজ্ঞানিকসুলভ নিষ্ঠায় পড়ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। এই ১৯০০ সালেই কাহিনী, কল্পনা আর ক্ষণিকা। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ রদে আন্দোলন। সাধারণ মানুষের মধ‍্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কবি রাজপথে এবং বস্তিতে বস্তিতে ঘুরেছেন। এই টানাপোড়েন এর মধ‍্যেই  খেয়া কাব‍্যগ্রন্থের কবিতা লেখা চলছে। ইংরেজি ১৯০৫, বাংলা ১৩১২ সনের ২৭ ভাদ্র গিরিডিতে বসে কবিতা লিখলেন “ঘাটে” । বললেন, আমার সারাদিনের এই কি রে কাজ/ ও পার পানে কেঁদে চাওয়া/ কম কিছু মোর থাকে হেথা/ পুরিয়ে নেব প্রাণ দিয়ে তা,/ আমার সেই খানেতেই কল্পলতা/ যেখানে মোর দাবি-দাওয়া।  এখানে প্রাণ দেওয়া আর দাবি-দাওয়া শব্দদুটি আমায় সম সময়ের ঐতিহাসিক পরিস্থিতির দিকে লক্ষ্য করতে প্ররোচিত করে। ওই একই ১৯০৫ সালে ১৩ শ্রাবণ বোলপুরে বসে লেখা খেয়া কাব‍্য গ্রন্থের শুভক্ষণ আর ত‍্যাগ, এই দুটি কবিতার দিকে তাকাই রথযাত্রা অনুষঙ্গে। শুভক্ষণ এ বলেন, আজি এ প্রভাতে গৃহকাজ লয়ে / রহিব বলো কী মতে… আরো বলেন, তবু রাজার দুলাল যাবে আজি মোর / ঘরের সমুখ পথে/ শুধু সে নিমেষ লাগি না করিয়া বেশ/ রহিব বলো কী মতে। একই দিনে লেখা ত‍্যাগ কবিতায় রথের অনুষঙ্গে বলেছেন, মোর হার ছেঁড়া মণি নেয় নি কুড়ায়ে/ রথের চাকায় গেছে সে গুঁড়ায়ে/চাকার চিহ্ন ঘরের সমুখে / পড়ে আছে শুধু আঁকা…. তারপর যেন সুতীব্র হাহাকারের মতো করে বলেন, আমি কী দিলেম কারে জানে না সে কেউ -/ ধুলায় রহিল ঢাকা।
ওই ১৯০৫ সালের শ্রাবণের ২৮ তারিখে, কলকাতায় বসে লিখেছেন, আগমন কবিতাটি। ওই কবিতার এই অংশগুলিতে আমি পরিশ্রমী পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি, দু একজনে বলেছিল/ চাকার ঝনঝনি/ ঘুমের ঘোরে কহি মোরা, / মেঘের গরজনি। …
দু একজনে কহে কানে রাজার ধ্বজা হেরি।/ আমরা জেগে উঠে বলি/ আর তবে নয় দেরি।…
দু একজনে কহে কানে/ বৃথা এ ক্রন্দন/ রিক্ত করে শূন‍্য ঘরে করো অভ‍্যর্থন।
এই যে দু একজনের কথা বারে বারে তাৎপর্যমণ্ডিত করে বলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, এইখানেই আমি আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। সমাজের অগ্রগতি ঘটাতে চিরকাল ওইরকম দু একজন এগিয়ে এসেছেন। পরে যূথ তাঁদের অনুসরণ করেছে। দিনবদলের ইতিহাস এইপ্রকার।
এই ১৯০৫ সালেই রাশিয়ার একটি বিপ্লব প্রচেষ্টা ব‍্যর্থ হয়ে গেল। তা থেকে শিক্ষা নিয়ে আগামীতে আরো সুসংহত বিপ্লব হবে। এইসব কবিতা বুকে নিয়ে   ১৯০৬  সালে প্রকাশ পেল খেয়া কাব‍্যগ্রন্থ।
১৯১২ সালে প্রকাশিত হয়েছে সঙ অফারিংস।  আর ডাকঘর, অচলায়তন এবং চৈতালি।
ইংরেজি ১৯১৪ সাল, ১৩২১ বঙ্গাব্দের ১২ জ্যৈষ্ঠ একটি কবিতা লেখেন রবীন্দ্রনাথ। কবিতার নাম “শঙ্খ”। বলাকা কাব্যগ্রন্থে এটি সন্নিবিষ্ট। সঞ্চয়িতাতেও কবিতাটি স্থান পেয়েছে। বলাকা রচনার পূর্বেই গীতাঞ্জলি, গীতালি, গীতিমাল্য প্রভৃতি গীতাখ্য কাব্যগ্রন্থ আর খেয়া, নৈবেদ্য থেকে বাছাই করা কবিতার ইংরাজি অনুবাদ “সঙ অফারিংস” সারা বিশ্বের নজর কেড়েছে। এক বিরাট স্বীকৃতি মিলেছে। কিন্তু এর পরেই বলাকায় কবির একটা বাঁক। কোনো জিনিয়াসই এক পথে বার বার ঘুরে মরেন না। নতুন নতুন করে নিজেকে আবিষ্কার করার স্পষ্ট দায়িত্ব কাজ করে বড় মানুষের মনে। কবিতার প্রথমেই তিনি বলেন.. তোমার শঙ্খ ধূলায় পড়ে… আরো বলেন বাতাস আলো গেল মরে …. একটা দুর্দিন যেন স্পষ্ট ঘনিয়ে এল। তৃতীয় পংক্তিতেই সোজা সাপটা একটা লড়াইয়ের ডাক অনুভব করেন ভিতর থেকে- সে লড়াইয়ে গানও সঙ্গী। গানও আয়ুধ। ক্রমেই নিশ্চিত টের পাব যৌবনের পরশমণি কবিকে নতুন করে জাগিয়ে তুলেছে, রাঙিয়ে তুলেছে।
শঙ্খ কবিতার দ্বিতীয় স্তবকেই কিছু নিজস্ব গূঢ় যন্ত্রণার কথা বলছেন কবি। সারাদিন বিস্তর তাপ, গ্লানি মলিনতার মধ্যে কেটেছে যেন। আঘাতজনিত কিছু ক্ষত হয়েছে হৃদয়ে। গায়েও লেগেছে নানা মালিন্য আর কলঙ্ক। এসব থেকে রেহাই পাবেন আশা করে কবি নিজের মধ্যে নিজে ডুবে থাকতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ধূলায় পড়ে থাকা শঙ্খ তা হতে দিল না। বিরাম খোঁজা আর হলো না কবির। শান্তি খোঁজাও আর হল না। বাইরে নীরব হলেও চেতনার গভীরে শঙ্খ ভীষণ রকম করে ডাকল কবিকে। এখন আর তন্দ্রা নয়, এখন উদ্বোধনের সময়। দীপ্ত প্রাণে কবির জেগে ওঠা। আরাম আর নিভৃতিকে ছুঁড়ে ফেলে এক নতুন রণসজ্জা প্রার্থনা করেন কবি। আঘাত ব্যাঘাতের মধ্য দিয়ে এক অভয় জগতে চলার প্রত্যয় খুঁজে পান তিনি।
১৯১৭ সাল। দুনিয়া কাঁপালেন সোভিয়েত বিপ্লবীরা। ভ্লাদিমির ইলিচ উলিয়ানভ ও তাঁর সতীর্থদের পরিচালিত কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে রাশিয়ায় জার সাম্রাজ্যের অবসান হয়ে শ্রমিক কৃষক মেহনতি মানুষের সরকার নয়, তার চেয়ে গুণমানে ও পরিমাণে বহু বহু গুণ বড় রাষ্ট্র ব‍্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়।
শ্রমিক কৃষক মেহনতি মানুষের মৈত্রীতে গড়া এই দিনবদল সারা পৃথিবীর কোণে কোণে দুরন্ত অভিঘাত হানে। সাম্রাজ্যবাদী শক্তির কবল থেকে গরিব মানুষের মুক্তির দিশা কে দেখাবে, তা নিশ্চিত হয়ে যায়।
১৯২২ সাল। প্রকাশ হয়েছে লিপিকা। সেখানে লিখেছেন এক দুঃখীর কথা। রথযাত্রার উৎসব। সেখানে দুঃখী যায়না। রাজকর্মচারী, রাজমন্ত্রী স্বয়ং এলেন তাকে ডাক দিতে। দুঃখী বললে, আমার সময় হবে না। প্রশ্ন উঠল, কেন রে? দুঃখী বললে, তাঁর রথ যে আমার দুয়োরের সামনে দিয়ে যায়। এই তো তার চিহ্ন আঁকা। রাজভৃত‍্য অবাক হয়ে বলল, কই রে! দুঃখী দেখিয়ে দিল, এই তো। রাজকর্মচারী চেয়ে দেখল, ফুটে রয়েছে সূর্যমুখী।
দুঃখী মেহনতি মানুষের উপরেই যে দিনবদলের ভার, সে কথা কবির স্নায়ুতে শিরায় ছড়িয়ে গিয়েছে।
এর আগে ১৯১৮ সালে প্রকাশ পেয়েছে প‍্যারটস ট্রেনিং। তোতাকাহিনীর ইংরেজি পাঠ। তখন কবির সাতান্ন বৎসর। সর্বক্ষমতাময় রাষ্ট্রশক্তি জনগণকে শিক্ষিত করবার ছলে আসলে কী করেন আর প্রতিবাদীদের নিন্দুক আখ‍্যা দিয়ে কানমলা সর্দারের হাতে তার কী রকম আপ‍্যায়নের ব‍্যবস্থা রাখেন, তার ছবি আঁকলেন। ১৯২৩ এ বসন্ত নাটক প্রকাশ হল। তা উৎসর্গ করেছেন পুত্রতুল‍্য ব্রিটিশ সরকারের কারাগারে অন‍্যায়ের প্রতিবাদে অনশনরত কবি নজরুলের উদ্দেশে। ওই সময়ই যক্ষপুরী নাটকের খঞ্জনকে আঁকছেন। দশ দশটি খসড়া কাটছাঁট সংশোধন সংযোজন পুনর্লিখনের কঠোর শ্রমসাধ্য পথে যা ১৯২৬ সালে আত্মপ্রকাশ করবে রক্তকরবী হয়ে। দেখা দেবে নন্দিনী। গলিত অবক্ষয়িত মনুষ্যত্ব রহিত ফ‍্যাসিস্ট রাষ্ট্রবাদিতার বিরুদ্ধে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সর্বোৎকৃষ্ট প্রতিবাদ। তার আগেই ১৯২৫ সালে এই রক্তকরবী  ইংরেজি ভাষায় রেড ওলিয়াণ্ডার্স হয়ে ফুটে উঠেছে সর্বমানবের উদ্দেশে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঠিক কি চাইছেন, তা খোলাখুলিভাবে বলছেন। ১৯২৬ সালেই ম‍্যাঞ্চেস্টার গার্ডিয়ানে ফ‍্যাসিবাদের বিরুদ্ধে চিঠি দিলেন। ১৯২৭ সালে ভারতে ব্রিটিশ সরকারের কুৎসিত দমননীতির বিরুদ্ধে খোলাচিঠি দিলেন। এই পথে আলো জ্বেলে ১৯৩১ সালে প্রকাশ পেল রাশিয়ার চিঠি। ১৯৩২ সালে লিখিত পক্ষীমানব কবিতাটিতে যুদ্ধবাজ সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের হাতে বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, ও প্রযুক্তি কিভাবে ধর্ষিত হয়, তার ছবি প্রকটিত হয়েছে। প্রকৃতি ও পরিবেশকে এরাই যে বিপন্ন করছে, তাও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন এই কবিতায়। পরিশেষ কাব‍্যগ্রন্থটিতে প্রশ্ন কবিতায় বলেছিলেন, যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো, তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভাল?
এই সময় কবির বয়স একাত্তর বৎসর।
১৯৩৩ সালে সত‍্যেন্দ্রনাথ দত্তের লেখা বহু পঠিত মেথর কবিতাটি ইংরেজি ভাষায় অনুবাদ করলেন।  যাদেরকে চেনানো হয় অন্ত‍্যজ ছোটলোক হিসেবে, সেই মেথরেরা অপমান ভার বহন করেই মানুষের ঘরবসতকে বসবাস যোগ্য করে রাখে। মেথরেরা যূথবদ্ধভাবে প্রতিবাদ করলে পৌরসংস্থা, পৌর অস্মিতা টলে যায়।
অনেকদিন আগে থেকেই দলিত ও প্রান্তিক মানুষের প্রতি বঞ্চনা, উপেক্ষা ও অসম্মানের প্রতিবাদ ধ্বনিত করেছেন রবীন্দ্রনাথ। বলেছেন, পশ্চাতে রেখেছ যারে সে তোমারে পশ্চাতে টানিছে। …. তোমার মঙ্গল ঢাকি গড়িছে সে ঘোর ব‍্যবধান। প্রকৃত মঙ্গল ও কল‍্যাণের চরণ কোথায় রাজে, তাও স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন। আর তার মধ‍্যেই যে মেয়েরা আরো বিকট রকম বঞ্চিত ও লাঞ্ছিত, সে কথাও তিনি বলেছেন ১৯৩৭ সালে লেখা আফ্রিকা কবিতায়। বলেছেন, দাঁড়াও ওই মানহারা মানবীর দ্বারে।
শ্রমিক কৃষকের মুক্তির পথে খুব বড় বাধা তার অশিক্ষা, মদের নেশা, কুসংস্কার আর অসময়ে অধৈর্য হয়ে ফেটে পড়ার প্রবণতা। তার সাংগঠনিক দুর্বলতার প্রধান উপাদান হল তার জাতপাতের অনৈক্য, তার ভাষাবৈচিত্র‍্যের প্রতি অনাস্থা, তার সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধি।  এরও গভীরতলে রয়েছে নির্মোহ বৈজ্ঞানিক বুদ্ধির নিদারুণ অভাব। যুক্তিসঙ্গত চিন্তাসম্পদের প্রতি অনীহা।
কোনো গণ আন্দোলনই লোক ক্ষেপিয়ে সফল হয় না। আবেগ যদি যুক্তিশাসিত না হয়, সে আবেগ শুধু বিস্ফোরণ ঘটায়, নব নির্মাণের যোগ্যতা তার থাকে না।
ব্রিটিশ পদানত ভারতে গরিব মানুষের মুক্তির সবচাইতে অগ্রণী, ও জনগণের আস্থাভাজন গণনায়ক ছিলেন মহাত্মা গান্ধী। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন বিদেশ প্রত‍্যাগত ব‍্যারিস্টার মোহনদাস কর্মচন্দকে মহাত্মা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন, তখনই সেই অভিধা আপামর ভারতবাসী গ্রহণ করেছেন। গান্ধী দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ফিরে নোবেলজয়ী বিশ্ববিখ্যাত কবির কাছেই প্রথম আতিথ‍্য পেয়েছিলেন।
দুজনের সম্পর্ক নানা রাজনৈতিক টানাপোড়েন এড়িয়ে গভীর ও আন্তরিক ছিল। তবু এই গণনায়কের চিন্তাপদ্ধতির মধ‍্যে অবৈজ্ঞানিক মনোভাব ও কুসংস্কারের দাপট লক্ষ্য করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রকাশ‍্যে তার বিরোধিতা করতে সঙ্কুচিত হন নি।
বিহারের মুঙ্গেরে ভয়াবহ ও  বিধ্বংসী ভূমিকম্প হয়েছিল। উচ্চশিক্ষিত মানুষ, এক সময়ের প্র‍্যাকটিশিং  ব‍্যারিস্টার হিসেবে ভূমিকম্প কেন হয়, তার ভূবিজ্ঞানসম্মত, পদার্থবিজ্ঞানচর্চিত ব‍্যাখ‍্যা গান্ধী জানতেন না, এ আমি মনে করতে পারি না। তবু, যেন জনমানস থেকে অস্পৃশ‍্যতার গাঢ় অবলেপ মোচন করার লক্ষ্যে গান্ধী বললেন, অস্পৃশ‍্যতার পাপেই এই বিধ্বংসী ভূমিকম্প। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁকে সযত্নে এই বক্তব্যের অন্তর্লীন অবৈজ্ঞানিক মনোভাব সম্পর্কে সচেতন করেন। বলেন, কোনো অজুহাতেই আমরা কুসংস্কার ও পশ্চাৎপদ চিন্তাকে প্রশ্রয় দিতে পারি না।
রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, কালের নিয়মে ভারতে একদিন স্বাধীনতা আসবে। ইংরেজ ভারত ছেড়ে চলে যেতে বাধ‍্য হবে। কিন্তু, কোন্ ভারতকে সে ছেড়ে যাবে?
কবির উদ্বেগ আশঙ্কাকে সত‍্য প্রমাণিত করে, আজ ভারতের সবচেয়ে বড় সংকট সম্পদের কুৎসিতরকম অসমবণ্টন। একদিকে ভারত পৃথিবীর অন‍্যতম অগ্রণী দেশ। কি সমরাস্ত্র সম্ভারে, কি মহাকাশ গবেষণায়, কি আন্তর্জাতিক প্রভাব প্রতিপত্তিতে ভারত আজ দুনিয়ার অন‍্যতম শ্রেষ্ঠ শক্তি। অথচ দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ নিরাপদ পানীয় জলটুকু পায় না, খাদ‍্যসুরক্ষা আজো নড়বড়ে। আধুনিক স্বাস্থ্যপরিষেবা গরিব মানুষের নাগালের বাইরে। দেশ উন্নত, অথচ দেশের মানুষের উন্নতি নেই। শিক্ষিত বেকারে দেশ ভরে উঠল। যারা উচ্চশিক্ষিত, প্রযুক্তি পারদর্শী, তারা বিদেশে চলে যায়। পড়ে থাকে অযোগ্য, অক্ষম, স্বপ্নহীন, মনোবলহীন কিছু দুপেয়ে, যারা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধিয়ে আনন্দ পায়। এইসব মর্বিড মানুষকে দেশের সম্পদ বলব কি করে?
রথযাত্রা হবে, কিন্তু কার নেতৃত্বে হবে, সেটা আমাদের বুঝে নেবার সময় এল।
Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!