ক্যাফে গদ্য -তে অঙ্কিতা দাস

স্বপ্নবাড়ি

হাঁটতে হাঁটতে আচমকা হোচট খেয়ে রাস্তায় পড়ে গেলো মিলি। স্কুল ড্রেসের ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে সামনে তাকিয়ে দেখলো একটা মস্ত রাজপ্রাসাদের মত বাড়ি। ছোটো থেকেই এমন বাড়ি দেখলে মিলি হা করে তাকিয়ে থাকে। আর চলে যায় তার কল্পনা দেশের সুখী গৃহ কোনে, যেখানে তার বাবা মা অনাহারহীন জীবন কাটিয়ে সুখে দিন কাটাচ্ছে। হঠাৎ! রিকশার প্যাক প্যাক হর্নের আওয়াজে মিলির স্বপ্নবাড়ি বাতাসে মিলিয়ে গেলো। “এ লরকি! রাস্তে কে বিচ মে কিউ খারা হেই রে?” শুনেই চমকে ওঠে মিলি। এ তো বিহারি কাকার গলার আওয়াজ। মিলি বললো কিছু না কাকা স্কুল থেকে বাড়ি ফিরছিলাম গো, দেখোনা এই বাজে বাড়িটার জন্য পড়ে গেলাম। স্কুল ড্রেসে ময়লা লেগে গেলো। এই শুনে বিহারি কাকা হাসতে হাসতে রিকশা থেকে নেমে এসে মিলির জামার ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে বললো, ” বিটিয়া এত্ত সুন্দর ঘরটা তোর বাজে মনে হলো?”মিলি বললো বাজে বলবনা কেনো গো? এটা দেখতে গিয়েই তো আমার এমন দশা হলো। বাড়িতে গিয়ে মায়ের কাছে খুব বকুনি খেতে হবে আর তাছাড়া আমার তো একটাই জামা আজ ধুয়ে দিলে কাল যে শুকাবে না। আর আমার কাল স্কুল যাওয়া হবেনা । এই শুনে বিহারি কাকা বললো” চিন্তা করিসনা বিটিয়া, চল আমি তোকে তোর ঘরে পৌঁছিয়ে আসি। আমি তোর মাকে সব বুঝিয়ে বলে দেবো।”কিন্তু একটা কথা আমায় বল তো দেখি বিটি যে, “তুই এমন সুন্দর বাড়ির দিকে তাকিয়ে কি ভাবিস বলতো?” কথাটা শুনেই মিলি তার মনকে প্রশ্ন করলো যে সত্যিই সে এমন বাড়ি দেখলেই তাকিয়ে থাকে কেনো? সে একটা টিনের বাড়ির মেয়ে বলে? তার নিজের এমন বাড়ি নেই বলে সে কি হিংসে করে? টিনের বাড়ির মেয়ে বলে মিলির মনে অনেক কষ্ট। পাড়ায় মিলির নাম কেউ জানে না। সবাই তাকে চেনে “টিনের বাড়ির মেয়ে’ বলে। সেটা মিলির একদম পছন্দের নয়। স্কুল যাওয়ার পথে বা পড়তে যাওয়ার পথে পাড়ার কাকিমারা মিলিকে দেখিয়ে বলে, ‘ ওই দেখ টিনের বাড়ির মেয়েটা যাচ্ছে ।’ তাদের সব আলোচনাই মিলির কানে আসে, আর হয় তো তারা ইচ্ছে করেই মিলিকে শুনিয়ে বলে! মিলি কান্না চেপে ওখান থেকে দৌড়ে বেরিয়ে আসে আর মনে মনে চিৎকার করে বলে, ‘ আমি টিনের বাড়ির মেয়ে নই। নই আমি। আমি মিলি। আমার নাম মিলি।’ আর বলবেই না কেনো পাড়ার সব দোতলা – তিনতলা বাড়ির মাঝে তাদেরই একমাত্র টিনের চালার ঘর। টিনের বাড়ির মেয়ে বলেই মিলির ছোট থেকেই কোনো বন্ধু নেই আর পাড়ার কেউ তাদের বাড়িতে আসেনা। মিলির বাবা একটি ঝুটমিলে কাজ করতো সেটা ৪-৫ বছর হলো বন্ধ হয়ে গেছে, এখন তার বাবা মা মিলে একটি ছোট্ট দোকান খুলেছে তাও সেখানে একদিন সামান্য বিক্রি হলেও অন্যদিন হয়না। চার জনের ভরা সংসার খুব কষ্ট করে চলতে হয়। মিলি ছোটবেলা থেকেই মেধাবী ছাত্রী হওয়ার সুবাদে তার পড়াশুনায় কোনো অনীহা হয়না। মিলির আজ অবধি স্কুলের কোনো নতুন পোশাক পড়া হয়ে ওঠেনি। খুব ইচ্ছে থাকা সত্বেও সংসারের এমন অবস্থা দেখে আর চাওয়া হয়ে ওঠেনি। কিন্তু মিলির মা যেন তার মুখ পড়ে বুঝে যেত সে কী চায় আর কী চায় না! তাই তিনি এমন ভাবে পুরোনো জামা গুলো কাচতেন দেখে তা পুরোনো বলে কেউ বুঝত না। নয় স্কুলে গিয়েও তাকে ঠাট্টার পাত্রী হতে হতো। মিলি আজ এই দশম শ্রেণিতে সেটাও তার মায়ের কৃতিত্ব। কেননা, সংসারের এমন অবস্থার জন্য তার বাবা কখনোই চাইনি মিলি পড়াশুনা করুক। তার মাকেও অনেক কষ্ট করে বড় হতে হয়েছে। তাই তার মেয়েকে সে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করে সমাজে প্রতিষ্ঠার পণ নিয়েছে। মিলিদের বাড়ি টিনের হলেও সেই বাড়িটা তার কাছে মায়ের মত। কেননা, মিলি স্কুল যাওয়ার পথে অনেক পথশিশুকে দেখেছে ছাদহীন অবস্থায় রাস্তায় বাস করতে, মিলি তো তাদের থেকে অনেক ভালোভাবে আছে।
“বিটিয়া রে, ও বিটিয়া! তাড়াতাড়ি বাড়ি চল অন্ধেরা হয়ে আসছে।” বিহারি কাকার আওয়াজ শুনেই মিলি চমকে উঠলো। কালো মেঘ সারা আকাশ ছেয়ে ফেলেছে। মিলি ছোটো বেলা থেকেই বর্ষাকালকে ঘৃণা করে এসেছে। আর করবেই না কেনো? বৃষ্টি হলেই তার মায়ের অনেক জ্বালা। ঘরের সব জায়গা দিয়ে জল পড়ে। সেদিন আর তাদের কোনো ঘুম হয়না। সারারাত ঘরের এককোনে বসে মিলির রাত কাটায়। ভাবতে ভাবতে মিলির চোখে জল চলে আসে। বিহারি কাকা দেখে বলে, “ও বিটি আবার কান্দিস কেনে? চল চল তাড়াতাড়ি তোকে বাড়ি দিয়ে আমাকেও যে বাড়ি ফিরতে হবে। তুই ভাবছিস কেনো অত আমি তো বুঝিয়ে বলুম তোর মাকে । অত চিন্তা করতে হবেনা তোকে।” মিলি বিহারি কাকার রিকশায় উঠে আনমনা হয়ে বসে থাকে আর বিহারি কাকা তাকে তার দেশের বাড়ির কতো গল্পো শোনাতে থাকলো। কিন্তু বিহারি কাকার কোনো কথাই যেন, মিলির কান অবধি পৌঁছচ্ছিল না। মিলি একমনে সব অট্টালিকা গুলো দেখছে করছে আর কি যেন কল্পনাতলে ছবি এঁকে যাচ্ছে। সে দেখতে পাচ্ছে এরকমই একটা অট্টালিকা তে তার বাবা মা বৃদ্ধা ঠাকুমা আর সে কতো আনন্দে দিন কাটাচ্ছে। তাদের আর কোনো অনাহার নেই। শুধু আনন্দই আর আনন্দ। তারা কতদিন পর একসাথে হাসছে , একসাথে কতো মজা করছে।হঠাৎ কালো মেঘ গর্জন করে খুব বৃষ্টি শুরু হল। কিন্তু এই প্রথমবার তারা বৃষ্টি দেখে ভয় পাচ্ছেনা। বৃষ্টির জন্যে মিলির দেখা প্রথম হাসি তার মায়ের মুখে। মা যেন আর বৃষ্টিকে কোনো তোয়াক্কা করছে না। এই প্রথমবার মিলি যেন বৃষ্টিকে ভালোবেসে ফেলেছে। মিলির এক নতুন অনুভূতি হচ্ছে যেটা তার আগে কোনোদিনও হয় নি। তার প্রথমবার বৃষ্টিতে ভিজতে মন চাইছে। আর সে চিৎকার করে সবাইকে জানাতে চাইছে, ‘ দেখো আমি মিলি। আমি আর কালো টিনের বাড়ির মেয়ে নই। ‘
মিলি বিটিয়া, মিলি বিটিয়া! বিহারি কাকার ডাকে মিলির ঘুম ভাঙলো। ঘুম চোখে চারিদিকে তাকিয়ে সে তার স্বপ্ন বাড়ি খুঁজতে লাগলো। এগুলো কি তার কল্পনা ছিল? আবার সে তার এই কঠিনতম বাস্তবের মুখোমুখি হলো? মনকে অনেক প্রশ্ন করতে করতে তার চোখে জল এলো আর খেয়াল হলো এই প্রথমবার তার বাড়ির লোক ছাড়া অন্য কেউ তাকে কেউ মিলি বলে ডাকলো। মিলি তখনই বিহারি কাকা কে কাঁদতে কাঁদতে জড়িয়ে ধরে বললো -‘ আমি মিলি। আমার পরিচয় আমি কালো টিনের বাড়ির মেয়ে নই। আমার পরিচয় আমি নিজে গড়ে তুলবো আর আমিও একদিন এমন সুন্দর বাড়িতে থাকব দেখো তুমি কাকা!
বিহারি কাকা মিলির মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বললেন,” হা বিটিয়া জরুর হবে। তুই পারবি বিটি ।
(বি: দ্র- এটি একটি বাস্তব আর কল্পনা মিশ্রিত রূপ। আমার সমাজের কাছে একটাই অনুরোধ দয়া করে মিলির মতন ছেলে মেয়েদের নিয়ে উপহাস করবেন না। তাদের পাশে দাড়াতে না পারলে তাদের নিয়ে ঠাট্টা তামাশা করবেন না। তারাও আমার আপনাদের মত এই সমাজের একজন অংশীদার।)
Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!